বাড়ির উঠানে বসে হাতপাখা তৈরিতে ব্যস্ত রংপুরের পীরগাছা উপজেলা হাড়িয়াপাড়া গ্রামের নারীরা। সম্প্রতি তোলা
বাড়ির উঠানে বসে হাতপাখা তৈরিতে ব্যস্ত রংপুরের পীরগাছা উপজেলা হাড়িয়াপাড়া গ্রামের নারীরা। সম্প্রতি তোলা

পীরগাছায় হাতপাখা তৈরি করে দারিদ্র্যকে জয়

‘তোমার হাতপাখার বাতাসে প্রাণ জুড়িয়ে আসে...’—মো. রফিকুজ্জামানের লেখা গানটি বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছিল রিকশাচালক আকবরের কণ্ঠে। প্রযুক্তির এই যুগে প্রাণ জুড়াতে এসেছে নানা ধরনের বৈদ্যুতিক পাখা। তবে এগুলো চাহিদা কমাতে পারেনি হাতপাখার। এই হাতপাখা তৈরি করে রংপুরের পীরগাছা উপজেলার পাঁচটি গ্রামের হতদরিদ্র নারীরা দারিদ্র্যকে জয় করেছেন।

ওই পাঁচটি গ্রামের অন্তত দেড় হাজার গৃহবধূ দাঁড়িয়েছেন নিজের পায়ে। সংসারে এনেছেন সুখ–স্বাচ্ছন্দ্য। হাতপাখা তৈরি করে বেশ কাটছে তাঁদের দিন। উপজেলা সদরের ইটাকুমারী ইউনিয়নের হাড়িয়াপাড়া, কামদেব, কালীগঞ্জ, আটানী ও কালিয়াপাড়া গ্রামের বেশির ভাগ বাড়িতে চকচক করছে টিনের চালা। খড়ের কুঁড়েঘর নেই বললেই চলে। গ্রামগুলোর নারীরা ঘরের কাজ সামলাতে সামলাতে, বিশ্রাম নিতে নিতে তৈরি করছেন হাতপাখা। উঠানে ও গাছতলায় জটলা করে চলছে পাখা তৈরির কাজ।

ওই সব গ্রামের অন্তত ২০ জনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গ্রাম পাঁচটির প্রায় ৮০০ পরিবারের সবাই জড়িয়ে আছেন পাখা তৈরির সঙ্গে। কেউ পাখা তৈরির কারিগর, কেউবা ব্যবসায়ী। চৈত্র মাস আসার আগে থেকেই এ গ্রামেগুলোর দৃশ্যপট বদলে যায়। সব বাড়িতে দেখা যায় এক দৃশ্য। ঘরে, উঠানে, বাড়ির সামনে বসে নানা বয়সী নারী ও মেয়েরা ব্যস্ত থাকেন পাখা বানানো নিয়ে।

কালীগঞ্জ গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, এক বাড়ির উঠানে বিভিন্ন বয়সী ২০-২৫ জন নারী ব্যস্ত পাখা তৈরিতে। সেখানে কথা হয় ময়না খাতুনের সঙ্গে। এটি তাঁর শ্বশুরবাড়ি। তিনি বলেন, তাঁর শাশুড়ি, ননদ ও ভাশুরের মেয়ে পাখা বানিয়ে বিক্রি করেন। গ্রামের কয়েকজন নারীও তাঁদের সঙ্গে কাজ করেন।

ময়না বলেন, ‘আমি পড়াশোনা করিনি; কিন্তু পাখা তৈরি করে যে টাকা পাই, তা দিয়ে তিন ছেলেমেয়েকে স্কুলে পড়াচ্ছি। কিছু টাকার সঞ্চয়ও করেছি।’

হাড়িয়াপাড়া গ্রামে গিয়ে দেখা গেল সুন্দর দৃশ্য। গ্রামের নারী-পুরুষদের অনেকেই রঙিন হাতপাখা তৈরি করছেন। ছোটরাও বসে নেই। সন্তান কোলে নিয়ে অনেক গৃহবধূই পাখা বানাচ্ছেন। পুরো গ্রামে পাখা তৈরি অনেকটাই শিল্পের রূপ পেয়েছে। এ সময় গ্রামের কয়েকজন বাসিন্দার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ৩০ বছর ধরে গ্রামগুলোর বাসিন্দার পাখা তৈরি করছেন। আমেনা বেগম ও দুলালী বেগম নামের দুজন গৃহবধূকে দেখে নারীরা পাখা তৈরি শুরু করেন। এখন পাখা তৈরি করে গ্রামের অনেক নারী সংসার চালান। অনেকেই সংসার সাজান। কিছু আছেন মূল কারিগর। কিছু আছেন ব্যবসায়ী। তাঁরা কারিগর দিয়ে পাখা বানিয়ে বিক্রি করেন। যাঁদের মূলধন নেই, তাঁরা কারিগর বা কারিগরের সহযোগী হিসেবে কাজ করেন। তাঁদের সংখ্যা প্রায় ২০০। তাঁরা সবাই নারী।

বাড়ির পাশে দাঁড়িয়ে ও বসে হাতপাখা তৈরি করছেন পীরগাছার হাড়িয়াপাড়া গ্রামের একদল নারী

হাড়িয়াপাড়া গ্রামের আয়েশা বেগম বলেন, ভিটেমাটি ছাড়া তাঁর কিছুই ছিল না। এখন টিনের বাড়ি, ৩২ শতক নিজের জমি আছে। গাছগাছালি ঘেরা বাড়িতে হাঁস–মুরগি, গাভি, ছাগল পালন ও পাখা তৈরি করে মাসে ১২ হাজার টাকা আয় করছেন।

আটানী গ্রামের স্বামীহারা রশিদা বেগমের অভাব-অনটনের সংসারে আয়ের পথ খুলে দিয়েছে হাতপাখা তৈরির কাজ। পাঁচ-ছয় বছর ধরে হাতপাখা তৈরির কাজ করছেন তিনি। এ আয়ের টাকায় ২১ শতক জমি, টিনের ঘর করেছেন। মাছ চাষের জন্য খনন করেছেন পুকুর। ছয়টি ছাগল, দুটি গাভিও পালন করছেন। সব মিলিয়ে এখন তাঁর মাসে আয় ২৫ হাজার টাকা।

রোজ ঘুম থেকে উঠেই এখন আর খাবারের চিন্তায় অস্থির হতে হয় না, কামদেব গ্রামের গৃহবধূ সোহাগী বেগমকে। তাঁর বাড়িতে এখন টিনের ঘর আছে, আছে নলকূপ ও স্বাস্থ্যসম্মত পায়খানা। ছেলেমেয়েরাও বিদ্যালয়ে পড়ছে। ৩টি গাভি, ৬টি ছাগল ও ১৭ শতক জমি কিনেছেন। পাখা তৈরিতে মাসে ১২ হাজার টাকা আয় হচ্ছে তাঁর।

কালীগঞ্জ গ্রামের মঞ্জিলা খাতুনের বিয়ে হয় ১৫ বছর বয়সে। আগে ভূমিহীন স্বামীর আয়ে সংসার চলত না। দুই সন্তানকে নিয়ে প্রায়ই উপোস থাকতে হতো। এখন পাখা তৈরির আয়ের টাকায় সংসার চলছে, স্বামীর আয় জমা থাকছে। ১৯ শতক জমি কিনেছেন, খড়ের ঘরের জায়গায় তুলেছেন টিনের ঘর, আছে হাঁস-মুরগি, গাভি-ছাগল।

হাড়িয়াপাড়া গ্রামের গৃহিণী মেনকা খাতুন বলেন, হাতপাখা তৈরির কাজে বেশি শ্রম দিতে হয় না। সময় বেশি লাগে না। কাজের ফাঁকে ফাঁকে এটা করা যায়। পাখা বানানোর আগে সারা বছরই তাঁদের সংসারে অভাব-অনটন লেগে থাকত। এখন তিন বেলা খাবার জুটছে। একইভাবে গ্রামের রহিমা বেগম, নয়নতারা, রোমানা খাতুন, মেরিনা বেগমসহ অন্যরা তাঁদের অর্থনৈতিক মুক্তির বিবরণ তুলে ধরেন।

কালীগঞ্জ গ্রামের পাখা তৈরির কারিগর জোসনা বেগম বলেন, ‘পাখা হামার কপাল খুলি দিছে। একনা পাখা বানাতে খরচ হয় ১৫-২০ টাকা আর পাইকারি বিক্রি হয় ৪৫-৫০ টাকা। চৈত্র থেকে আশ্বিন মাস পর্যন্ত পাখার বেচাকেনা ভালো হয়।’ একজন দিনে ২০টি পর্যন্ত পাখা তৈরি করতে পারেন।

ওই গ্রামের পাখা তৈরির আরেক কারিগর সুমিতা বেগম বলেন, ফুল পাখা, করমোর পাখা, শাল গাঁথুনি, ধারই গাঁথুনি, বিস্কুট গাঁথুনি, পানাশী গাঁথুনিসহ নানা রঙের পাখা তৈরি করা হয়। পাখা তৈরির প্রধান কাঁচামাল হচ্ছে গার্মেন্টস ফ্যাক্টরির পরিত্যক্ত বিভিন্ন প্রকার রঙিন সুতা। ঢাকা, সান্তাহার, বগুড়াসহ বিভিন্ন জেলা থেকে ১৩০ টাকা কেজি দরে এ সুতা কিনে আনা হয়। এরপর সেগুলো বাড়িতে নিয়ে ভালোভাবে গুছিয়ে পাখা তৈরির জন্য প্রস্তুত করা হয়। বাঁশের চিকন (বাতার) গোলাকার একটি ফ্রেমে লোহার শলাকার সাহায্যে সুতা দিয়ে ফ্রেমের এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্ত পর্যন্ত সুতা বুননের মাধ্যমে তৈরি করা হয় এই নজরকাড়া রঙিন পাখা। প্রতি কেজি সুতা দিয়ে ৩০টি পাখা তৈরি করা যায়। একটি পাখা ৪৫-৫০ টাকা বিক্রি হয়। এতে খরচ বাদে প্রতিটি পাখায় ৩০ টাকা লাভ হয়। পাইকারেরা গ্রামে এসে এ পাখা কিনে নিয়ে যান। অনেকে বাস-ট্রেনে ফেরি করে খুচরা মূল্যে প্রতিটি পাখা ৬০-৬৫ টাকায় বিক্রি করেন।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে স্থানীয় ইটাকুমারী ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) সদস্য সুজন ইসলাম বলেন, ওই পাঁচটি গ্রামে পাখা তৈরির কাজ এখন একটি শিল্পে পরিণত হয়েছে। নারীরা পাখা তৈরি করে ভাগ্য পরিবর্তন করেছেন। তাঁরা তাঁদের জীবনমানের উন্নতি করতে পেরেছেন।

জানতে চাইলে উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা এনামুল হক বলেন, ‘ওই গ্রামগুলোর নারীদের কর্মকাণ্ড আমি স্বচক্ষে দেখেছি। তাঁরা হাতপাখা তৈরি করে এখন স্বাবলম্বী।’

জানতে চাইলে উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা আলতাফ হোসেন বলেন, ওই গ্রামগুলোর নারীরা হাতপাখা তৈরি করে দারিদ্র্যকে জয় করেছেন।