
বিশ্ববিদ্যালয়ের জাদুঘরের সংগ্রহে রয়েছে ৪০০ বছরের পুরোনো হাতে লেখা কোরআন শরিফ, মধ্যযুগের দুর্লভ মুদ্রা, ৮ থেকে ১২ শতকের কষ্টিপাথরের মনসামূর্তি, বিষ্ণুমূর্তি ও ব্রোঞ্জের বিভিন্ন ভাস্কর্য, নকশিকাঁথা, তাঁতযন্ত্র, গ্রামোফোন, কাঠের নৌকা এবং তামা-পিতলের প্রাচীন তৈজসপত্রসহ অনেক নিদর্শন।
সময়টা তখন ১৬৫৬ সাল। ভারতবর্ষের শাসনভার তখন মোগল সম্রাট শাহজাহানের হাতে। ওই বছরই যুদ্ধের জন্য তৈরি হয়েছিল এক কামান। তখন এটিকে ডাকা হতো ‘সার জং’নামে। ফারসি শব্দ সার জংয়ের অর্থ প্রধান যুদ্ধাস্ত্র। প্রায় ৩৭০ বছর আগের এ সার জং এখন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগ্রহে।
বিশ্ববিদ্যালয় জাদুঘরের মূল প্রবেশপথের সামনেই এটি রাখা হয়েছে। পাশাপাশি এ কামান সম্পর্কে বিভিন্ন তথ্যও সেখানে দেওয়া রয়েছে। কামনটি তৈরি হয়েছে ব্রোঞ্জ দিয়ে। নথিতে দেওয়া তথ্যমতে, কামানটির দৈর্ঘ্য ১৯৭ সেন্টিমিটার ও প্রস্থ ৪৫ সেন্টিমিটার। কৌশিক রায়ের সম্পাদনায় রচিত ‘দক্ষিণ এশিয়ার যুদ্ধবিগ্রহ এবং রাজনীতি: প্রাচীনকাল থেকে আধুনিক যুগ’ বইয়ের পঞ্চম অধ্যায়েও এ কামান সম্পর্কে বিস্তারিত উল্লেখ রয়েছে।
অবশ্য কামানে থাকা শিলালিপিতেও এর সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। এতে ক্যালিগ্রাফি–শৈলীতে খোদাই করা পাঁচটি লিপি রয়েছে। এর মধ্যে তিনটির পাঠোদ্ধার হয়েছে, বাকি দুটির হয়নি। বিশ্ববিদ্যালয় জাদুঘরের প্রতিষ্ঠাতা সহকারী কিউরেটর ও প্রয়াত গবেষক শামসুল হোসাইন এই তিনটি লিপি বিশ্লেষণ করেছেন।
কামানটিতে থাকা প্রথম লিপিতে এর মালিকানা উল্লেখ করা হয়েছে। এ লেখাটির বাংলা উচ্চারণ ‘তোপে শাহ বুলন্দ ইকবাল আস্ত’—অর্থাৎ এটি ‘শাহ বুলন্দ ইকবালের কামান’। প্রয়াত গবেষক শামসুল হোসাইনের মতে, শাহ বুলন্দ ইকবাল ছিল মোগল সম্রাট শাহজাহানের অন্যতম উপাধি।
কামানের দ্বিতীয় লিপিতে নির্মাণ তত্ত্বাবধানের তথ্য দেওয়া হয়েছে। এটির বাংলা উচ্চারণ ‘তোপে বাদ দারোগা বারকান্দাজ খান তয়ার শুদ’— অর্থাৎ বারকান্দাজ খানের তত্ত্বাবধানে কামানটি নির্মিত হয়। ‘বারকান্দাজ খান’ উপাধিটি মোগল আর্টিলারির কর্মকর্তা বাহা-উদ্দিনকে দেওয়া হয়েছিল।
তৃতীয় লিপিতে কামানটির নাম, নির্মাতার পরিচয় এবং নির্মাণকাল উল্লেখ রয়েছে। এর বাংলা উচ্চারণ ‘তোপে ১০৬৬ সার জং আমল মুহাম্মদ হোসেন ইজ্জত’। অর্থাৎ ‘সার জং’ নামের এই কামানটি তৈরি করেন মুহাম্মদ হোসেন ইজ্জত। এর তারিখ হিজরি ১০৬৬ অর্থাৎ ১৬৫৬ সাল।
মোগলদের চট্টগ্রাম বিজয়
১৬৬৬ সালের ২৬ জানুয়ারি এমন রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মধ্য দিয়ে চট্টগ্রাম মোগলদের অধীনে আসে। ভারতবর্ষের রাজনৈতিক ইতিহাসে চট্টগ্রাম দখলের লড়াই যেকোনো দিক থেকেই ছিল তাৎপর্যপূর্ণ মোড় ঘোরানো ঘটনা। এই কামটি সেই যুদ্ধে ব্যবহৃত হয়েছে বা সেই যুদ্ধের প্রয়োজনে চট্টগ্রামে আনা হয়েছে বলে মনে করেন ইতিহাসবিদেরা।
কামানটি যার আমলে তৈরি, সেই সম্রাট শাহজাহান ১৬৫৮ সালে নিজ পুত্র শাহজাদা আওরঙ্গজেবের হাতে বন্দী হন এবং সিংহাসন হারান। শাহজাহানের বাকি তিন পুত্র—দারা শিকোহ, শাহ সুজা ও মুরাদ বখশকেও পরাজিত করেন আওরঙ্গজেব। ক্ষমতা গ্রহণের পর চট্টগ্রাম বিজয়ে উদ্গ্রীব হয়ে ওঠেন তিনি। এ জন্য তিনি নিজের মামা শায়েস্তা খানকে বাংলার সুবেদার করে পাঠান। শায়েস্তা খানের ছেলে বুজুর্গ উমেদ খাঁ চট্টগ্রাম অভিযানে নেতৃত্ব দেন।
যেভাবে এল বিশ্ববিদ্যালয়ে
১৯৬৬ সালের ১৮ নভেম্বর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়। ওই দিনই কামানটি সংগ্রহ করে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্বোধনী দিনে ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তানের তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও তৎকালীন পাকিস্তান জাদুঘর সমিতির সভাপতি মমতাজ হাসান ২৪টি প্রত্ননিদর্শন দান করেন। এর মধ্যে কামানটি অন্যতম।
বিশ্ববিদ্যালয়ের নথি অনুযায়ী, মোগল কর্মকর্তা আদু খান হাজারীর স্ত্রী প্রয়াত কামরুন্নেসা বেগমের সংগ্রহে ‘সার জং’ কামানসহ মোট চারটি কামান ছিল। পরে ১৯৬৬ সালে আদু খান হাজারীর বংশধর করিমুন্নেসা বেগমের কাছ থেকে এ চার কামান কিনে নেয় ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তান। তবে কত টাকা দিয়ে কেনা হয়েছিল, তা নথিতে উল্লেখ নেই। একই বছরের বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্বোধনী দিনে কামানগুলো বিশ্ববিদ্যালয়কে দান করা হয়।
বিশ্ববিদ্যালয় জাদুঘরের পরিচালক অধ্যাপক মোহাম্মদ জাহিদুর রহমান বলেন, ১৯৭৩ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করা জাদুঘরে এখন রয়েছে ছয়টি গ্যালারি ও একটি হল। এ গ্যালারিগুলোতে সংগ্রহে রাখা হয়েছে ৪০০ বছরের পুরোনো হাতে লেখা কোরআন শরিফ, মধ্যযুগের দুর্লভ মুদ্রা, ৮ থেকে ১২ শতকের কষ্টিপাথরের মনসামূর্তি, বিষ্ণুমূর্তি ও ব্রোঞ্জের বিভিন্ন ভাস্কর্য, নকশিকাঁথা, তাঁতযন্ত্র, গ্রামোফোন, কাঠের নৌকা ও তামা-পিতলের প্রাচীন তৈজসপত্রসহ অনেক নিদর্শন। শিক্ষার্থীদের জন্য সব উন্মুক্ত রাখা হয়েছে।