
‘সমাজের সকল কার্যক্রম, ব্যবসা-বাণিজ্য, লেনদেনসহ চার পরিবারের সঙ্গে যেকোনো কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকার জন্য বিশেষভাবে অনুরোধ করা যাচ্ছে।’—মাইকে এমন ঘোষণা দিয়ে কুমিল্লার লাকসামে চার পরিবারকে সমাজচ্যুত করা হয়েছে। এ ঘটনায় পরিবারগুলো সামাজিকভাবে একঘরে হয়ে পড়ার আতঙ্কে রয়েছেন। এ ঘটনায় বুধবার দুই পক্ষকে থানায় ডাকার পর সমাজচ্যুত করার সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করা হলেও আতঙ্ক কাটেনি পরিবারগুলোর।
সম্পত্তি নিয়ে গ্রাম্য সালিসের সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে আদালতে মামলা করায় উপজেলার গোবিন্দপুর ইউনিয়নের ইছাপুরা পূর্বপাড়া ও পশ্চিমপাড়া সমাজ ওই চার পরিবারকে সমাজচ্যুত করার সিদ্ধান্ত নেয়। ঘটনাটি ঘটে গত সোমবার সন্ধ্যায়। এর পর থেকে পরিবার চারটির শিশু–কিশোরসহ কেউই স্বাভাবিকভাবে বাইরে বের হতে পারছে না।
সমাজের মানুষের সঙ্গে কথা বলতে পারছি না। ছোট বাচ্চারা দোকানে গেলেও তাদের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করা হচ্ছে। এখন বিভিন্ন ধরনের হুমকিও দেওয়া হচ্ছে। থানার ওসি ও ইউএনও ডাকার পর সমাজচ্যুত করার সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করা হয়েছে। তবে আমাদের আতঙ্ক এখনো কাটেনি।মমিন আলী, ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্য
পরিবার চারটিকে সমাজচ্যুত করার বিষয়ে মাইকিংয়ের একাধিক ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। বিষয়টি নিয়ে এলাকায় আলোচনা ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
ভুক্তভোগী চার পরিবারের একজন মমিন আলী। তিনি জানান, তাঁদের পরিবারের সদস্যদের সমাজচ্যুত করার ঘোষণা দেওয়ার পর তাঁরা চরম বিপাকে পড়েছেন। মমিন বলেন, ‘সমাজের মানুষের সঙ্গে কথা বলতে পারছি না। ছোট বাচ্চারা দোকানে গেলেও তাদের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করা হচ্ছে। এখন বিভিন্ন ধরনের হুমকিও দেওয়া হচ্ছে। থানার ওসি ও ইউএনও ডাকার পর সমাজচ্যুত করার সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করা হয়েছে। তবে আমাদের আতঙ্ক এখনো কাটেনি।’
জমিজমা নিয়ে বিরোধে যেই চার পরিবারকে সমাজচ্যুত করা হয়েছে তাঁদের প্রতিপক্ষের নেতৃত্বে আছেন ইছাপুরা গ্রামের বাসিন্দা আলমগীর হোসেন। তিনি স্থানীয় গোবিন্দপুর ইউনিয়ন বিএনপি সাধারণ সম্পাদকের পদে রয়েছেন। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, রাজনৈতিক পদকে ব্যবহার করে আলমগীর হোসেনই নেতৃত্ব দিয়ে তাদের সমাজচ্যুতের মাইকিং করিয়েছেন।
তবে জমি নিয়ে বিরোধের কথা স্বীকার করলেও মাইকিং করানোর বিষয়টি অস্বীকার করেছেন বিএনপি নেতা আলমগীর। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, মমিন আলীর সঙ্গে তাঁর জমি নিয়ে বিরোধ রয়েছে। এ কথা সত্য। তবে চার পরিবারকে সমাজচ্যুত করার জন্য তিনি মাইকিং করাননি।
মাইকিং করেছে ইছাপুরা পূর্ব ও পশ্চিমপাড়ার দুই সমাজের কমিটির লোকজন। আজ (বুধবার) দুই পক্ষকে ওসি সাহেব ও ইউএনও সাহেব ডেকেছিলেন। পরে বিষয়টি সমাধান হয়েছে। আজকে এলাকায় মাইকিং করে সমাজচ্যুত করার সিদ্ধান্তও প্রত্যাহার করা হয়েছে।আলমগীর হোসেন, সাধারণ সম্পাদক, গোবিন্দপুর ইউনিয়ন বিএনপি
স্থানীয় সূত্র ও ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, ইছাপুরা গ্রামের প্রয়াত আবদুর রহমানের ছেলে মমিন আলী ও একই গ্রামের প্রয়াত আবদুর রশিদের ছেলে আলমগীর হোসেনের মধ্যে প্রায় সাড়ে ৭ শতাংশ জমি নিয়ে বিরোধ চলছে। বিরোধ মেটাতে স্থানীয়ভাবে একাধিকবার সালিস হয়েছে। সর্বশেষ ১৯ জুন দুই পক্ষকে জমির কাগজপত্র সংগ্রহ করে চলতি মাসের ২০ আগস্ট আবার সালিসে বসার সিদ্ধান্ত হয়।
এর মধ্যে ২ জুলাই মমিন আলী বাদী হয়ে আলমগীর হোসেন, অহিদুর রহমান ও নেছার আহমেদের বিরুদ্ধে কুমিল্লার আদালতে মামলা করেন। সালিসের সিদ্ধান্ত অমান্য করে আদালতে মামলা করার অভিযোগ তুলে গত সোমবার মাইকিং করে মমিন আলীসহ চার পরিবারের সদস্যদের সমাজচ্যুত করার ঘোষণা দেওয়া হয়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে মাইকে বলতে শোনা যাচ্ছে, ‘এতদ্বারা সকলের অবগতির জন্য জানানো যাচ্ছে যে ইছাপুরা উত্তর পাড়া নিবাসী হাজি আবদুর রহমানের পরিবারের সকল সদস্য যেমন মমিন আলী, আবদুর রশিদ, আবুল খায়ের আবু, কোরবান আলীসহ সকল সদস্য বর্তমান সমাজ কমিটির আইন বিচার, বিচার আচার মানে না এবং সমাজের আইনশৃঙ্খলা অবজ্ঞা এবং আইন অমান্য করার কারণে এদেরকে সমাজের সকল কার্যক্রম থেকে বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে এবং সমাজচ্যুত করা হয়েছে। সমাজের সর্বসাধারণকে এদের সাথে সমাজের সকল কার্যকলাপ, ব্যবসা-বাণিজ্য, লেনদেন সমাজের সকল কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকার জন্য বিশেষভাবে অনুরোধ করা যাচ্ছে। অনুরোধ ক্রমে ইছাপুরা পূর্বপাড়া ও পশ্চিমপাড়া সমাজের নেতৃবৃন্দ ও পরিচালনা কমিটি।’
বিষয়টি নিয়ে জানতে বুধবার রাতে ইছাপুরা সমাজের সভাপতি রফিক সর্দারের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি।
দুই পক্ষের সম্পত্তি নিয়ে বিরোধের সর্বশেষ সালিসে উপস্থিত ছিলেন পাশের কান্দিরপাড় ইউনিয়ন বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মনির হোসেন। স্থানীয়ভাবে সমাজের মাতব্বর হিসেবে পরিচিত মনির হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ‘মমিন আলী সমাজের লোকজনকে না জানিয়ে আদালতে মামলা করেছেন। তাঁরা কাউকে মানেন না এবং বর্তমান সরকারকে বিতর্কিত করার চেষ্টা করছেন। তবে চার পরিবারের সদস্যদের সমাজচ্যুত করতে মাইকে ঘোষণা দেওয়া খুবই দুঃখজনক ঘটনা। আমি সালিসে ছিলাম, কিন্তু ওই এলাকার বাসিন্দা নই।’
লাকসাম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা কাজী কামরুন নাহার লাইলী বুধবার রাত সাড়ে নয়টার দিকে প্রথম আলো জানান, এক পক্ষ আদালতে মামলা করায় চারটি পরিবারকে সমাজচ্যুত করা হয়েছে। এটা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। কোনো পক্ষ স্থানীয়ভাবে বিচার না পেলে আদালতে মামলা করা তার আইনগত অধিকার। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মাইকিংয়ের ভিডিও দেখে পুলিশ বিষয়টি জানতে পারে। এরপর গতকাল মঙ্গলবার সকালে ঘটনাস্থলে পুলিশ পাঠিয়ে ঘটনার সত্যতা যাচাই করা হয়। আজ (বুধবার) দুই পক্ষের লোকজনকে থানায় ডাকা হয়।
থানা সূত্রে জানা যায়, এ ঘটনায় কোরবান আলীর স্ত্রী থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। অভিযোগটি এফআইআর হিসেবে নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। এর মধ্যে দুই পক্ষের লোকজন বিষয়টি নিজেদের মধ্যে মীমাংসা করে নেওয়ার কথা বলে মামলা রেকর্ড না করার অনুরোধ করেন। মাইকিং করা পক্ষ ভুক্তভোগীদের কাছে ক্ষমা চেয়েছেন। তবে অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে বিএনপি নেতা আলমগীর থানায় উপস্থিত হননি।
ওসি বলেন, আপাতত দুই পক্ষ বিষয়টি নিজেদের মধ্যে মীমাংসা করবে বলে সিদ্ধান্ত হয়েছে। আদালতে করা মামলাটি চলমান থাকবে। এরপরও ভুক্তভোগী পক্ষ চাইলে তাদের অভিযোগ এফআইআর করে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাও দুই পক্ষকে ডেকেছিলেন বলে জানা গেছে।
ওই চার পরিবারকে সমাজচ্যুত করার সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করা হয়েছে জানিয়ে আলমগীর হোসেন বলেন, ‘মাইকিং করেছে ইছাপুরা পূর্ব ও পশ্চিমপাড়ার দুই সমাজের কমিটির লোকজন। আজ (বুধবার) দুই পক্ষকে ওসি সাহেব ও ইউএনও সাহেব ডেকেছিলেন। পরে বিষয়টি সমাধান হয়েছে। আজকে এলাকায় মাইকিং করে সমাজচ্যুত করার সিদ্ধান্তও প্রত্যাহার করা হয়েছে।’