অন্তর্বর্তী সরকার বিদায় নেওয়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে; যেখানে দাবি করা হচ্ছে উপদেষ্টার বাসায় বস্তা বস্তা টাকা পাওয়া গেছে। যাচাই করে দেখা গেছে যে এই টাকা উদ্ধারের ভিডিওটি পুরোনো এবং এর সঙ্গে কোনো উপদেষ্টার সংশ্লিষ্টতা নেই।
১৭ ফেব্রুয়ারি বিএনপির সরকার গঠনের মধ্যদিয়ে অন্তর্বর্তী সরকার বিদায় নেয়। তাতে উপদেষ্টাদের দায়িত্বের অবসান ঘটে। তার পাঁচ দিন পর ফেসবুকে একটি ব্যক্তিগত প্রোফাইল থেকে ভিডিওটি পোস্ট করা হয়। এর ক্যাপশানে লেখা, ‘উপদেষ্টার বাসায় মিলল বস্তা বস্তা টাকা’। ভিডিওতে দেখা যায়, যৌথ বাহিনী একটি বাসা থেকে টাকা, মোবাইল ফোন ও ঘড়ি উদ্ধার করছে। একই ভিডিও একাধিক পেজ ও প্রোফাইল থেকেও পরে ছড়ানো হয়।
ভিডিওর বিভিন্ন অংশ থেকে কিফ্রেম নিয়ে রিভার্স ইমেজ সার্চ করলে এসএ টিভির ইউটিউব চ্যানেলে ২০২৪ সালের ৪ নভেম্বর প্রকাশিত একটি ভিডিও পাওয়া যায়। তার শিরোনাম ছিল ‘সেনা অভিযানে সচিবের বাসা থেকে মিলল কোটি টাকা।’ তার সূত্র ধরে জানা যায়, আওয়ামী লীগ ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের সাবেক অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ আমজাদ হোসেন খানের বাসায় ২০২৪ সালের অভিযানের দৃশ্য ছিল এটি। ২০২৪ সালের ৫ নভেম্বর প্রথম আলোয় প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, রাজধানীর উত্তরায় মোহাম্মদ আমজাদ হোসেন খানের বাসা থেকে ১ কোটি ৯ লাখ ৫০ হাজার টাকা, বিদেশি মুদ্রা, ১১টি আইফোন ও মূল্যবান ঘড়ি উদ্ধার করা হয়। যৌথ বাহিনী তাঁকে গ্রেপ্তারও করে।
তখনকার ভিডিওর সঙ্গে এখন ছড়িয়ে পড়া ভিডিওটির তুলনা করলে গ্রেপ্তার ব্যক্তির চেহারা, জব্দ করা টাকা, মোবাইল ফোন ও ঘড়ির দৃশ্য—সবকিছুর হুবহু মিল পাওয়া যায়। অর্থাৎ এ ক্ষেত্রে ভিন্ন ঘটনার পুরোনো ভিডিও নতুন করে ছড়িয়ে বিভ্রান্তি তৈরি করা হচ্ছে।
সিএনজি অটোরিকশা ভাঙচুরের একটি ভিডিও ব্যাপকভাবে ছড়িয়েছে ফেসবুকে, তাতে দাবি করা হয়েছে, চাঁদা না দেওয়ায় এই ভাঙচুর চালানো হয়। তবে যাচাই করে দেখা গেছে, এর সঙ্গে চাঁদাবাজির কোনো সম্পর্ক নেই। চালকের প্রতি ক্ষুব্ধ হয়ে এক যাত্রী এই ভাঙচুর করেন।
‘বাংলার রাজনীতি’ নামে একটি পেজ থেকে ভিডিওটি ১৮ ফেব্রুয়ারি পোস্ট করা হয়। ভিডিওটি এ পর্যন্ত ১৬ লাখের বেশিবার দেখা হয়েছে। এই ভিডিও বিভিন্ন পেজ, প্রোফাইল থেকে পোস্ট করে দাবি করা হচ্ছে, চাঁদা না দেওয়ায় বিএনপি নেতা এই ঘটনা ঘটিয়েছেন। আলোচিত এই ভিডিওটি যাচাই করে জানা যায়, এটি নরসিংদীর ঘটনা। ১৬ ফেব্রুয়ারি ‘ডেইলি নরসিংদী নিউজ’ নামের একটি পেজে ভিডিওটি পাওয়া যাচ্ছে। সেখানে ক্যাপশনে লেখা, ‘ইটাখোলায় এক যাত্রীকে সিএনজি থেকে নামিয়ে দিলে, পরে ওই যাত্রী শিবপুর বাড়িগাঁও সিঅ্যান্ডবি বাসস্ট্যান্ডে এসে সিএনজি ভাঙচুর করে।’
প্রথম আলোর নরসিংদী প্রতিনিধি ঘটনাস্থলের দোকানকর্মী ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানান, একটি অটোরিকশাচালকের সঙ্গে এক যাত্রীর ভাড়া নিয়ে বচসা হয়েছিল। তখন ওই যাত্রীকে নামিয়ে দেন চালক। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে ওই যাত্রী সেই অটোরিকশা খুঁজতে খুঁজতে আরেকটি অটোরিকশার সামনের কাচ ভেঙে দেন। শিবপুর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কোহিনূর মিয়াও একই তথ্য জানান। তিনি বলেন, যিনি ভাঙচুর করেছিলেন, তিনি একজন প্রকৌশলী। তাঁর সঙ্গে বিএনপির কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। পরে অটোরিকশাচালককে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার শর্তে ঘটনাটির মীমাংসা হয়।
বিএনপির নতুন সরকার যে ফ্যামিলি কার্ড চালু করতে যাচ্ছে, তা নিয়ে ফেসবুকে প্রলুব্ধকর পোস্ট দিয়ে ব্যবহারকারীদের জুয়ার ওয়েবসাইটে নেওয়ার কয়েকটি নজির ধরা পড়েছে যাচাইয়ে। ‘ফ্যামিলি কার্ডের আবেদন’ শিরোনামে একাধিক পেজ খুলে তা থেকে পোস্ট দেওয়া হচ্ছে, ‘আজকের মধ্যে ফ্যামিলি কার্ডের আবেদন করলেই পাবেন ঈদ বোনাস ৫০০০।’ এমন সব ফটোকার্ডে লেখা থাকছে, ‘আবেদন লিংক কমেন্টে।’
যাচাই করে দেখা যায়, কমেন্টে দেওয়া লিংকগুলো সরকারি কোনো ওয়েবসাইটের লিংক নয়। বরং লিংকে ক্লিক করলেই অনলাইন বেটিং বা জুয়ার ওয়েবসাইট খুলছে। বাংলাদেশে আইন অনুযায়ী, জুয়া খেলা নিষিদ্ধ। তা সরাসরিই হোক কিংবা অনলাইনে।
সরকার দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে সরাসরি অর্থসহায়তা দিতে ফ্যামিলি কার্ড চালুর সিদ্ধান্ত নিলেও এখনো আবেদন নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেনি। সরকারের এই উদ্যোগ নিয়ে প্রথম আলোর আদলে ভুয়া ওয়েবসাইট তৈরি করেও প্রতারণা করা হচ্ছে। বিষয়টি নজরে আসার পর এ নিয়ে বিভ্রান্ত না হতে সবার প্রতি অনুরোধ রেখেছে প্রথম আলো কর্তৃপক্ষ।