মঙ্গল শোভাযাত্রা

পয়লা বৈশাখে পথে নামবে নীলগাই

শিক্ষার্থীরা শোভাযাত্রাকে বর্ণময় করে তোলার বহুমুখী সৃজনকর্মে ব্যস্ত সময় পার করছেন
ছবি: প্রথম আলো

নীলগাই নামবে এবার ঢাকার রাজপথে পয়লা বৈশাখে। বিশাল আকারের সেই নীলগাইয়ের সঙ্গে থাকবে পেখম মেলা এক নীল ময়ূর। বাঘ আর হাতিও থাকবে। এগুলোকে সাজিয়ে তোলার কাজে এখন তুমুল ব্যস্ত সময় পার করছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের শিক্ষার্থীরা। বরাবরের মতো এবারও পয়লা বৈশাখের সকালে ঐতিহ্যবাহী বর্ণাঢ্য মঙ্গল শোভাযাত্রা নামবে রাজপথে।

আজ মঙ্গলবার দুপুরে চারুকলা অনুষদে গিয়ে দেখা গেল, শিক্ষার্থীরা শোভাযাত্রাকে বর্ণময় করে তোলার বহুমুখী সৃজনকর্মে ব্যস্ত। তাঁদের মধ্যে ভাস্কর্য বিভাগের শিমুল কুম্ভকার এবং অঙ্কন ও চিত্রণ বিভাগের ফয়জুল্লাহ আনন ও সুমাইয়া তুষির সঙ্গে কথা হলো। বড় আকারের ভাস্কর্যগুলো তৈরির কাজ তদারক করছিলেন তাঁরা। এবার শোভাযাত্রায় দেশের বিলুপ্ত বা বিলুপ্তির ঝুঁকিতে থাকা প্রাণীগুলোকে প্রধান চরিত্র হিসেবে তুলে ধরা হবে। নীলগাই একসময় ছিল আমাদের দেশে, ময়ূরও ছিল। এই দুটিই বিলুপ্ত। বেদিসহ ১৬ ফুট উঁচু একটি নীলগাই তৈরি হচ্ছে শোভাযাত্রার জন্য। ময়ূরটি হবে আরও বড়, ১৭ ফুট। এ ছাড়া একটি বাঘ ও একটি হাতি থাকবে ১৫ ফুট আকারের। গবাদিপশু ভেড়াও বেশ দুর্লভ হয়ে পড়েছে ইদানীং। তাই ভেড়ার প্রতীকও থাকবে বছর শুরুর শোভাযাত্রায়। তাঁরা জানালেন, এ ছাড়া রাজা-রানি, প্যাঁচা, পাখি ও বাঘের ছোট-বড় মুখোশ এবং নানা রঙের ও আকৃতির কৃত্রিম ফুল থাকবে।

ই শিল্পসামগ্রী বিক্রির টাকাতেই শোভাযাত্রা ও উৎসবের খরচ মেটানো হবে

মঙ্গল শোভাযাত্রার প্রস্তুতি এবার শুরু হয়েছে গত ১৯ মার্চ। শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের আঁকা ছবি, চিত্রিত সরাসহ তাঁদের তৈরি করা ফুল, পাখি, মুখোশ বিক্রির জন্য পসরা সাজানো হয়েছে জয়নুল গ্যালারির সামনে। এই শিল্পসামগ্রী বিক্রির টাকাতেই শোভাযাত্রা ও উৎসবের খরচ মেটানো হবে। বরাবর তা–ই হয়। বিক্রির দায়িত্বে থাকা কারুশিল্প বিভাগের শিক্ষার্থী ফাহিজানা মিম জানালেন, যাঁরা এ আয়োজনে নিয়মিত সহায়তা করেন, তাঁরা কেনাকাটা করতে আসছেন। শিল্পসামগ্রী কেনার চেয়ে এ আয়োজনে আর্থিক সহায়তা দেওয়াটাই থাকে তাঁদের প্রধান উদ্দেশ্য। তা ছাড়া সাধারণ ক্রেতারাও আসেন। মঙ্গল শোভাযাত্রার তহবিল সংগ্রহের জন্য এখানে তুলনামূলক সুলভে শিল্পকর্ম বিক্রি হয়। তবে এবার পবিত্র রমজান মাস চলতে থাকায় ক্রেতার পরিমাণ কম।

মিম জানালেন, বিভিন্ন মাধ্যমের ছবি পাওয়া যাবে সর্বনিম্ন ২ হাজার থেকে সর্বোচ্চ ১০ হাজর টাকায়। এখানে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে শিক্ষকদের শিল্পকর্মও রয়েছে। চিত্রিত সরা বিক্রি হচ্ছে ছোটগুলো ২০০ এবং বড়গুলো ৫০০ টাকায়। এ ছাড়া আছে বিভিন্ন আকারের মুখোশ, ফুল, নানা রকমের পাখি, তালপাতার পাখাসহ হরেক রকমের সুদৃশ্য শিল্পসামগ্রী। এসবের দাম সর্বনিম্ন ২০০ টাকা থেকে সর্বোচ্চ ৫০০ টাকা।

এবারের মঙ্গল শোভাযাত্রার মূল প্রতিপাদ্য ‘বরিষ ধরা মাঝে শান্তির বারি’। বিশ্বজুড়ে যে হিংসা, হানাহানি, যুদ্ধ চলছে, তা থেকে পরিত্রাণ ও শান্তির প্রত্যাশা থাকবে মঙ্গল শোভাযাত্রায়। তাই কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গানের বাণীকে এবার মূল প্রতিপাদ্য করা হয়েছে বলে জানালেন আয়োজকেরা। পয়লা বৈশাখের এই বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা সকাল নয়টায় চারুকলা অনুষদের সামনে শুরু হবে। টিএসসি হয়ে উপাচার্যের বাসভবনের সামনের চত্বর ঘুরে আবার চারুকলা অনুষদের সামনে এসে শেষ হবে।

পয়লা বৈশাখে চারুকলার মঙ্গল শোভাযাত্রা

চারুকলা অনুষদের এই মঙ্গল শোভাযাত্রার উন্মেষ হয়েছিল রাজধানীর বাইরে। যশোরে চারুপিঠ নামে একটি প্রতিষ্ঠানের চারুশিল্পীরা পয়লা বৈশাখে বাঙালি লোকসংস্কৃতির বিভিন্ন উপকরণ নিয়ে সেখানে একটি শোভাযাত্রার আয়োজন করেছিলেন ১৯৮৬ সালে। তখন দেশে চলছিল স্বৈরাচারবিরোধী গণ-আন্দোলন। পয়লা বৈশাখের সেই শোভাযাত্রায় প্রচুর লোকসমাগম হয়েছিল। এরপর রাজধানীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের শিক্ষার্থী ও শিক্ষকেরা ১৯৮৯ সালে ‘আনন্দ শোভাযাত্রা’ নামে পয়লা বৈশাখে বেশ বড় একটি শোভাযাত্রার আয়োজন করেন। ক্রমেই এটি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। নববর্ষে বাংলার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের উদ্‌যাপনের পাশাপাশি তখন এই শোভাযাত্রা স্বৈরতন্ত্র ও মৌলবাদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের ভূমিকাও পালন করছে।

এবারের মঙ্গল শোভাযাত্রার মূল প্রতিপাদ্য ‘বরিষ ধরা মাঝে শান্তির বারি’। বিশ্বজুড়ে যে হিংসা, হানাহানি, যুদ্ধ চলছে, তা থেকে পরিত্রাণ ও শান্তির প্রত্যাশা থাকবে মঙ্গল শোভাযাত্রায়।

১৯৯৬ সাল থেকে পয়লা বৈশাখের এই শোভাযাত্রার নাম ‘আনন্দ শোভাযাত্রা’ পরিবর্তন করে ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ রাখা হয়। জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি সংস্থা ইউনেসকো ২০১৬ সালের ৩০ নভেম্বর বাংলাদেশের নববর্ষের এই মঙ্গল শোভাযাত্রা তাদের বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকাভুক্ত করার ঘোষণা দেয়।

মঙ্গল শোভাযাত্রাসহ তিন দিনের কর্মসূচি থাকবে চারুকলার এবারের বর্ষবরণের আয়োজনে। বৃহস্পতিবার বছরের শেষ দিনে হবে চৈত্রসংক্রান্তির অনুষ্ঠান। সন্ধ্যায় চারুকলা অনুষদের শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে বকুলতলায় থাকবে সংক্রান্তির সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। শুক্রবার পয়লা বৈশাখে মঙ্গল শোভাযাত্রা এবং শনিবার সন্ধ্যায় বকুলতলায় হবে শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে যাত্রাপালা ‘নাচমহল’।