
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার একজন আসামিকে জামিন করিয়ে দেওয়ার জন্য এক কোটি টাকা চাওয়ার ঘটনা তদন্ত করা হবে। এ জন্য আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলামের নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের একটি ‘ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটি’ বা তথ্যানুসন্ধান দল গঠন করা হয়েছে। কমিটির সবাই প্রসিকিউটর।
‘জামিনের জন্য এক কোটি টাকা চান প্রসিকিউটর’ শিরোনামে গতকাল মঙ্গলবার প্রথম আলো ও নেত্র নিউজের যৌথ অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। এই প্রতিবেদন ব্যাপক আলোচনা তৈরি করে। আরও কয়েকটি সংবাদমাধ্যমে এ বিষয়ে খবর প্রকাশ করা হয়। এরপর গতকাল দুই দফা বৈঠক করে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন দল (রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী)।
চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম গতকাল সন্ধ্যায় মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, মঙ্গলবার বিকেলে পাঁচ সদস্যের একটি ফ্যাক্টস ফাউন্ডিং কমিটি গঠন করা হয়েছে। এর প্রধান তিনি (চিফ প্রসিকিউটর) নিজে। এই কমিটির কর্মপন্থা কী হবে, তা বুধবার (আজ) দুপুর সাড়ে ১২টায় আরেকটি বৈঠকে ঠিক করা হবে।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, আসামির জামিন করিয়ে দিতে টাকা চাওয়ার ঘটনায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের অধীন বিচারপ্রক্রিয়ার ওপর ‘মানুষের আস্থার সংকট দেখা দিতে পারে’। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে যাঁরা শহীদ হয়েছেন, তাঁদের পরিবারের ন্যায়বিচার পাওয়া নিশ্চিত করা জরুরি। সে জন্য সব অভিযোগের নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু তদন্ত করতে হবে এবং জুলাই হত্যাযজ্ঞের ঘটনায় ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হবে।
প্রসঙ্গত, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় চট্টগ্রাম শহরে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের একটি মামলার গ্রেপ্তার আসামি চট্টগ্রাম-৬ আসনে (রাউজান) আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য এ বি এম ফজলে করিম চৌধুরী। মামলায় তাঁকে জামিনে মুক্তি পাইয়ে দেওয়ার জন্য তাঁর পরিবারের কাছে এক কোটি টাকা চেয়েছিলেন সোমবার পদত্যাগ করা প্রসিকিউটর মো. সাইমুম রেজা তালুকদার। হোয়াটসঅ্যাপ কথোপকথনের একাধিক অডিও রেকর্ডিংয়ে এমন তথ্য পাওয়া গেছে। প্রথম আলো ও নেত্র নিউজ রেকর্ডিংগুলো যাচাই করে গতকাল একটি যৌথ অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করে। প্রতিবেদনটি লিখেছেন যুক্তরাজ্যের সাংবাদিক ডেভিড বার্গম্যান, যিনি বহু বছর ধরে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল নিয়ে কাজ করছেন।
সাইমুম রেজা তালুকদার জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর পুনর্গঠিত ট্রাইব্যুনালে ২০২৪ সালের ৭ অক্টোবর প্রসিকিউটর হিসেবে নিয়োগ পান। তিনি পেশায় একজন শিক্ষক ছিলেন এবং একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্যেষ্ঠ প্রভাষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ইন্টারনেট গভর্ন্যান্স ও সিকিউরিটি বিশেষজ্ঞ হলেও ট্রাইব্যুনালে নিয়োগ পাওয়ার আগে তাঁর মামলা পরিচালনার অভিজ্ঞতা খুব কম ছিল।
এদিকে জাতীয়তাবাদী আইসিটি ফোরামের দপ্তর সম্পাদক মো. জুয়েল স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে গতকাল বলা হয়েছে, সাইমুম রেজা তালুকদারের বিরুদ্ধে গুরুতর আর্থিক দুর্নীতি এবং অনৈতিক কার্যকলাণের অভিযোগ ওঠায় তাঁকে ফোরামের আইনবিষয়ক সম্পাদকের পদ থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে।
২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময়কার মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার বিচার চলছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় এই ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয় মোহাম্মদ তাজুল ইসলামকে, যিনি আগে একই ট্রাইব্যুনালের আসামি জামায়াতে ইসলামীর নেতাদের আইনজীবী ছিলেন।
বিএনপি সরকার গত ১৭ ফেব্রুয়ারি দায়িত্ব নেওয়ার পর ২৩ ফেব্রুয়ারি সরিয়ে দেওয়া হয় তাজুল ইসলামকে। একই দিন চিফ প্রসিকিউটর পদে নিয়োগ পান আমিনুল ইসলাম। তিনি জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক কমিটির সহসভাপতি ছিলেন। এখন প্রসিকিউশন দলে সদস্য ১৭ জন।
প্রসিকিউটরদের নিয়ে গতকাল সকালে নিজের কার্যালয়ে রুদ্ধদ্বার বৈঠক করেন চিফ প্রসিকিউটর। বেলা আড়াইটায় আরও একটি বৈঠক বসে। সেটি চলে বিকেল ৪টা পর্যন্ত। এই বৈঠকেই মূলত ফ্যাক্টস ফাউন্ডিং কমিটি গঠন করা হয়।
বৈঠকে উপস্থিত সূত্র জানিয়েছে, শুরুতে চিফ প্রসিকিউটর টাকা চাওয়া নিয়ে প্রতিবেদনের প্রসঙ্গটি তোলেন। বিষয়টি নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা হয়। তখনকার চিফ প্রসিকিউটর বিষয়টি কেন সমাধান করেননি, অন্যান্য অভিযোগ কেন নিষ্পত্তি করেননি, তা নিয়ে কথা হয়। এ ছাড়া ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে তাড়াহুড়া করে কয়েকটি মামলার আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করা নিয়েও বৈঠকে কেউ কেউ প্রশ্ন তোলেন এবং তা পুনর্মূল্যায়নের কথা বলেন। সূত্র আরও জানিয়েছে, সাইমুম রেজা তালুকদারের টাকা চাওয়ার বিষয়টি প্রসিকিউটরদের কেউ কেউ জানতেন বলেও বৈঠকে দাবি করা হয়।
সূত্র আরও জানিয়েছে, এক কোটি টাকা চাওয়ার অভিযোগসহ যেসব দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে, সবকিছু তদন্তে ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত হয় বৈঠকে।
সকালে বৈঠকে পর দুপুরে ট্রাইব্যুনালে চিফ প্রসিকিউটর কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলন করেন আমিনুল ইসলাম। তিনি সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেন, সাইমুম রেজা তালুকদারের বিরুদ্ধে যে সংবাদ এসেছে, যে অডিও ক্লিপ এসেছে, তা যাচাই–বাছাই করতে কোনো কৃপণতা করা হবে না। তিনি বলেন, বিষয়টি নিয়ে তিনি ব্যক্তিগতভাবে সংক্ষুব্ধ। বিষয়টি তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।
প্রসিকিউশনের বিরুদ্ধে যখন এমন দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে, তখন জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের বিচার প্রশ্নবিদ্ধ হয় কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, ‘সেখানে শতভাগ প্রশ্নবিদ্ধ হয়। আমি আপনার সাথে একমত। যে এ রকম যদি কোনো বিষয় হয়, তাহলে তো অবশ্যই আমাদের ট্রাইব্যুনাল নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। আমাদের ইমেজ সংকট হয়।’
চিফ প্রসিকিউটর আরও বলেন, সাইমুম রেজা তালুকদারের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ উঠেছে, সে বিষয়ে সাবেক চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলামের কী নলেজ (জ্ঞান) আছে, তিনি কতটুকু জানেন, কী ব্যবস্থা নিয়েছেন—সংগত কারণেই তাঁর (তাজুল ইসলাম) সাহায্য চাইবেন তাঁরা। চিফ প্রসিকিউটর কার্যালয়ের প্রশাসনের দায়িত্বে থাকা প্রসিকিউটর গাজী মোনাওয়ার হুসাইন তামীমের কাছ থেকেও তথ্য নেওয়া হবে।
সাইমুম রেজা তালুকদারের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠার পর তাজুল ইসলাম তাঁকে সংশ্লিষ্ট মামলা থেকে সরিয়ে দেন। তবে ট্রাইব্যুনালের অন্যান্য দায়িত্ব থেকে সাইমুমকে সরানো হয়নি।
তাজুল ইসলাম সোমবার রাতে বলেন, ‘যে রেকর্ডিংটির কথা বলা হচ্ছে, তা যাচাই করার জন্য এবং ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য আমাকে দেওয়া হয়নি। যদি আমাকে দেওয়া হতো, তবে আমি পদক্ষেপ নিতাম।’
অবশ্য তাজুল ইসলাম প্রসিকিউটর সাইমুমকে সরিয়ে দিতে আইন মন্ত্রণালয়কে চিঠি দিতে পারতেন, যেটা তিনি আরেক প্রসিকিউটরের ক্ষেত্রে করেছেন। এ–বিষয়ক প্রশ্নের জবাবে তাজুল ইসলাম গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমার কাছে তথ্যপ্রমাণ না থাকলে কিংবা আনুষ্ঠানিক অভিযোগ না থাকলে আমি কীভাবে আইন মন্ত্রণালয়ে জানাব।’
অবশ্য আসামির পরিবারের সদস্যদের দাবি, ১০ ডিসেম্বরের কথোপকথনের রেকর্ডিংটি তাঁরা তাজুল ইসলামকে শুনিয়েছিলেন। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, একটি বড় অভিযোগের বিষয়ে কল রেকর্ড শোনানোর পরও একজন প্রসিকিউটরকে দলে রাখা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর পদ থেকে যেদিন (গত ২৩ ফেব্রুয়ারি) সরকার তাজুল ইসলামকে সরিয়ে দেয়, সেদিন সকালে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ তোলেন ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর বি এম সুলতান মাহমুদ। তিনি অভিযোগ করেছিলেন, ‘চিফ প্রসিকিউটরের চেয়ারকে টাকা কামানোর হাতিয়ার হিসেবে তৈরি করে রেখেছে এই তাজুল সিন্ডিকেট।’
সুলতান মাহমুদের অভিযোগের পর জানা যায়, তাঁকে বিশ্বাস, শৃঙ্খলা ও আচরণবিধি ভঙ্গ করা, নিরাপত্তা প্রহরীকে মারধর, স্ত্রীকে নির্যাতন করাসহ বিভিন্ন অভিযোগে দেড় মাস আগে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল থেকে অপসারণের অনুরোধ করেছিলেন তাজুল ইসলাম। তিনি আইন মন্ত্রণালয়কে গত ১১ জানুয়ারি চিঠিও দিয়েছিলেন। যদিও সুলতান মাহমুদ এ বিষয়ে তখন বলেন, ‘তাঁদের দুর্নীতির তথ্য প্রকাশ করে দিতে পারি, এই আশঙ্কা তাঁরা আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করেছিল।’
তখন বিশ্লেষকেরা বলেছিলেন, পুরো বিষয়টির তদন্ত হওয়া দরকার। কিন্তু তদন্তের উদ্যোগ দেখা যায়নি।
এদিকে চলতি বছরের ১২ জানুয়ারি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ সাবেক চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম এবং সাবেক সংসদ সদস্য ফজলে করিম চৌধুরীর সাবেক স্ত্রী ও তাঁর (ফজলে করিম) আইনজীবী রিজওয়ানা ইউসুফকে জড়িয়ে ‘সাইবার বুলিং’ বা কুৎসা রটানোর অভিযোগ আনা হয়েছিল। সেদিন অভিযোগ নিয়ে কথা বলেছিলেন প্রসিকিউটর গাজী মোনাওয়ার হুসাইন তামীম ও আইনজীবী রিজওয়ানা ইউসুফ।
জামিন করিয়ে দিতে টাকা চাওয়ার বিষয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, এর ফলে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের অধীন বিচারপ্রক্রিয়ার ওপর মানুষের আস্থার সংকট দেখা দিতে পারে। এমন দুর্নীতির চর্চা প্রকৃত অপরাধীদের যথাযথ জবাবদিহির সম্ভাবনাকেও ক্ষতিগ্রস্ত করবে বলেও উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি।
ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর কার্যালয় এ বিষয়ে যে অভ্যন্তরীণ তদন্তের উদ্যোগ নিয়েছে, সে বিষয়ে ইফতেখারুজ্জামান বলেন, অভ্যন্তরীণ তদন্তকে স্বাগত। তবে তা যথেষ্ট নয়। ন্যায়বিচারের দায়িত্বে নিয়োজিত এত বিশাল গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে যোগসাজশের দুর্নীতির অভিযোগের সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ ও কোনো প্রকার প্রভাবমুক্ত বিচারিক তদন্ত হওয়া উচিত।