সংখ্যালঘুদের অধিকার নিশ্চিত করতে না পারলে সবার জন্য গণতন্ত্র নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। যেখানে গণতন্ত্র ও আইনের শাসন নেই, সেখানে সংখ্যালঘুদের অধিকার পূর্ণতা লাভ করতে পারে না। ধর্মীয় প্রান্তিকীকরণ একটি বিশাল সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা শুধু বাংলাদেশে নয়, প্রতিবেশী দেশগুলোতেও বড় ইস্যু হয়ে উঠেছে।
আজ রোববার রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে ‘সবার জন্য গণতন্ত্র: সংখ্যালঘু অধিকার, প্রতিনিধিত্ব ও জাতীয় নির্বাচন ২০২৬’ শীর্ষক একটি গোলটেবিল আলোচনার সংলাপে বক্তারা এ কথাগুলো বলেন। সংলাপের আয়োজন করে সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস)।
সংলাপে বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা অধ্যাপক সুকোমল বড়ুয়া বলেন, অধিকার কোনো ব্যক্তির পরিচয়ের ভিত্তিতে নির্ধারিত হওয়া উচিত নয়। একটি সমাজ গড়ে তুলতে হবে, যেখানে সব নাগরিক তাদের পটভূমি নির্বিশেষে সমানভাবে ক্ষমতাপ্রাপ্ত এবং সুরক্ষিত হয়। সংখ্যালঘুদের সমস্যা সমাধানে রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাদের কাছে বিষয়গুলো তুলে ধরার পরামর্শ দেন তিনি।
বেসরকারি সংস্থা ‘নিজেরা করি’র সমন্বয়কারী খুশী কবির বলেন, ‘আমাদের মানসিকতার পরিবর্তন আনতে হবে। গণতন্ত্র মানে সবাইকে সমান সুযোগ দেওয়া। সবার জন্য অবাধ বিচরণ নিশ্চিত করা।’
বাংলাদেশ একটি ধর্মভিত্তিক দেশের দিকে যাচ্ছে কি না, এমন আশঙ্কা কাজ করছে উল্লেখ করে খুশী কবির বলেন, ‘আমি এখন যখনই যেখানেই যাই, সবার মধ্যে একটা আতঙ্ক। যে কী হতে যাচ্ছে? আমরা একটা ধর্মভিত্তিক দেশে যাচ্ছি কি না? যেখানে আমি আমার ইচ্ছেমতো করে পোশাক পরতে পারব না, আমার নিজের পরিচয় আমি দিতে পারব না, আমি আমার কথা বলতে পারব না। এই ভয়টা, এই আতঙ্কটা আগে ছিল না।’
অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের অন্যতম সভাপতি নির্মল রোজারিও বলেন, কোনো দেশ যদি সংখ্যালঘুদের অধিকার পূর্ণভাবে নিশ্চিত করে, তবে সে দেশে মানবাধিকার নিয়ে কোনো প্রশ্ন ওঠে না। যত দিন মানসিকতার পরিবর্তন হবে না, তত দিন পর্যন্ত গণতন্ত্র এবং সংখ্যালঘুদের অধিকার নিশ্চিত ও বাস্তবায়ন করা খুব কঠিন হবে।
বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান কল্যাণ ফ্রন্টের চেয়ারম্যান বিজন কান্তি সরকার বলেন, ‘আমরা বিশ্বাস করি, আমরা সমান।’ তিনি বলেন, সংখ্যালঘুদের সমাধান করতে হলে যারা দেশ চালায়, তাদেরকে এই বিষয়গুলো জানানো প্রয়োজন। এই সমস্যা রাজনৈতিক দলগুলোর মাধ্যমে সমাধান করতে হবে।
বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের সাধারণ সম্পাদক সঞ্জীব দ্রং বলেন, ‘এটি প্রায়ই বলা হয় যে আমরা সবাই মানুষ। তবে সংখ্যালঘুদের জন্য এটি অন্যদের চেয়ে অনেক সহজ।...রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিগুলোর মধ্যে প্রায়ই সংখ্যালঘুদের অন্তর্ভুক্তি, আদিবাসী, হিন্দু বা খ্রিস্টানদের জন্য সুযোগ সৃষ্টি করার প্রতিশ্রুতি থাকে।’
মানবাধিকারকর্মী ইলিরা দেওয়ান বলেন, বিএনপি ও জামায়াত বলে বাংলাদেশে কোনো পার্থক্য নেই, সবাই মানুষ হিসেবে সমান। কিন্তু রাজনৈতিক দলের ইশতেহারে যদি সংখ্যালঘুদের অধিকার না থাকে, তাহলে তারা কীভাবে তাদের অধিকার নিশ্চিত করবে?
সাংবাদিক সোহরাব হাসান বলেন, আজকাল সংখ্যালঘুদের অধিকার নিয়ে আলোচনা করা হলে তাদের প্রায়ই দাগানো হয় দেশদ্রোহী হিসেবে। তাদের অধিকার রক্ষার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে, কিন্তু তা আজ পর্যন্ত পূর্ণ হয়নি। যারা তাদের জোরপূর্বক বিতাড়িত করছে এবং অবৈধভাবে তাদের জমি দখল করছে, তারা এখনো ক্ষমতায় আছে। যদি এসব ব্যক্তি ক্ষমতায় থাকে, তবে কার্যকর পরিবর্তনের আশা কম।
অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন সিজিএসের সভাপতি জিল্লুর রহমান। তিনি বলেন, গণতন্ত্র মানে একটি রাষ্ট্রে যেখানে সংখ্যালঘু কম থাকা সত্ত্বেও তাদের কণ্ঠস্বর যেন শোনা যায়। রাষ্ট্র যেন তাদেরকে সম্পদ হিসেবে দেখে, তাদের গুরুত্ব দেয়।
জিল্লুর রহমান বলেন, ২০২৬ সালের নির্বাচন সামনে রেখে গণতন্ত্রের সংজ্ঞা এখন নতুনভাবে দেখা যাচ্ছে। নির্বাচন কি সবার জন্য হবে? সংখ্যালঘুরা নিরাপদভাবে ভোট দিতে পারবেন কি না, সবার প্রতিনিধিত্ব থাকবে কি না, এই প্রশ্ন রয়ে গেছে।
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের কেন্দ্রীয় সদস্য পল্লব চাকমা, দলিত পরিষদের ঢাকা বিভাগীয় প্রধান চাঁদ মোহন রবি দাস, বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের কার্যনির্বাহী সদস্য রিপন চন্দ্র বানাই, ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস বাংলাদেশের (ইউল্যাব) খণ্ডকালীন প্রভাষক মুন্নী মেরিনা চিরণ, ব্রেভ ডাইমেনশন গ্লোবালের সভাপতি মীর আবু রিয়াদ প্রমুখ।