এসএসসি-এইচএসসি

এক-দুই বিষয়ে ফেল, এক বছর নষ্ট—এই নিয়ম কি বদলাচ্ছে?

শনিবার রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় ফেল করা শিক্ষার্থীদের নিয়ে চ্যালেঞ্জড শিক্ষার্থী সম্মেলনের আয়োজন করে গণসাক্ষরতা অভিযান। সম্মেলনে বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা শিক্ষার্থীরা নিজেদের সমস্যা ও অনুভূতির কথা তুলে ধরে।

বরিশাল থেকে আসা ছাত্রী সিনথিয়া আক্তার মনি জানায়, পরীক্ষা চলাকালে টাইফয়েডে আক্রান্ত হয়ে তাকে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছিল। অসুস্থতার কারণে গণিত বিষয়ে ভালো প্রস্তুতি নিতে পারেনি সে। ফলে গণিতে অকৃতকার্য হয়েছে। অথচ বাকি সব বিষয়ে জিপিএ-৫ পেয়েছে। নিজের এ কথা বলতে গিয়ে একপর্যায়ে কান্নায় ভেঙে পড়ে ছাত্রীটি।

অন্যদিকে, পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে আসা এক ছাত্রী জানায়, পদার্থবিজ্ঞান ছাড়া অন্য সব বিষয়ে ভালো নম্বর পেয়েছে সে। বেশির ভাগ বিষয়ে পেয়েছে এ প্লাস, এ বা এ মাইনাস। পদার্থবিজ্ঞানে অকৃতকার্য হওয়ার কারণে বন্ধুদের চেয়ে এক বছর পিছিয়ে পড়তে হচ্ছে। অকৃতকার্য বিষয়ে তিন মাসের মধ্যে আবার পরীক্ষা দেওয়ার ব্যবস্থা করার দাবি তার। কারণ, পুনরায় পরীক্ষা হলে পাস করার বিষয়ে সে আশাবাদী।

সর্বশেষ এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় ৬ লাখ ৯০ হাজার শিক্ষার্থী এক বা একাধিক বিষয়ে অকৃতকার্য হয়েছে। বিদ্যমান নিয়মে এসএসসি ও এইচএসসির মতো পাবলিক পরীক্ষায় কোনো পরীক্ষার্থী এক বা একাধিক বিষয়ে অকৃতকার্য হলে পরের বছর আবার পরীক্ষায় বসতে হয়। সে ক্ষেত্রে শুধু অকৃতকার্য বিষয়গুলোতে অথবা চাইলে সব বিষয়ে পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ থাকে। কিন্তু একটি বা দুটি বিষয়ে অকৃতকার্য হওয়ার কারণে একজন শিক্ষার্থীকে দীর্ঘ এক বছর অপেক্ষা করতে হয়। এতে তার শিক্ষাজীবনে পিছিয়ে পড়ার পাশাপাশি তৈরি হয় বাড়তি মানসিক চাপ।

এ পরিস্থিতিতে পরীক্ষার্থী, অভিভাবক ও শিক্ষাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা ফল প্রকাশের তিন মাসের মধ্যে অকৃতকার্য বিষয়ে আবার পরীক্ষা নেওয়ার ব্যবস্থা চাইছেন। সরকারও বিষয়টি ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করছে।

শিক্ষাবিদ এবং শিক্ষা বোর্ডের বর্তমান ও সাবেক চেয়ারম্যানরা মনে করছেন, এ ব্যবস্থা চালু হলে শিক্ষার্থীদের উপকার হবে। সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্ত হলে শিক্ষা বোর্ডগুলোর পক্ষে এ ধরনের পরীক্ষা নেওয়া সম্ভব। সেই সক্ষমতা বোর্ডের আছে। এতে শিক্ষার্থীদের এক বছর অপেক্ষাও করতে হবে না। পাশাপাশি নিয়মিত ও অনিয়মিত পরীক্ষার্থীদের একসঙ্গে পরীক্ষা নেওয়া এবং তাঁদের জন্য প্রশ্নপত্র তৈরি ও বিতরণসংক্রান্ত জটিলতাও কমবে।

গত ১০ আগস্ট এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশ করা হয়। এবার শুধু ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে পাসের হার ৬৪ দশমিক শূন্য ৫ শতাংশে নেমে এসেছে, যা ১৯ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। আর ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ড, মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড ও কারিগরি শিক্ষা বোর্ড মিলিয়ে গড় পাসের হার ৬২ দশমিক ২৫ শতাংশ।

ফলাফল প্রকাশের পর পুনর্নিরীক্ষণ ও পুনর্মূল্যায়নে বিপুল শিক্ষার্থীর ফল পরিবর্তন হয়েছে। ১১টি শিক্ষা বোর্ডে নতুন করে জিপিএ-৫ পেয়েছে ৩ হাজার ৭৯ জন। প্রথমবার ফল প্রকাশের সময় অকৃতকার্য হওয়া পরীক্ষার্থীদের মধ্যে থেকে ৪ হাজার ৫৮৫ পরীক্ষার্থী পরে উত্তীর্ণ হয়েছে। গতবার এ সংখ্যা ছিল ২ হাজার ২০৭। অর্থাৎ এবার অকৃতকার্য থেকে উত্তীর্ণ হওয়ার সংখ্যা দ্বিগুণের বেশি।

এ অবস্থায় অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের দ্রুত আবার পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগের বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। এসএসসির মতো পাবলিক পরীক্ষায় এক বা একাধিক বিষয়ে অকৃতকার্য শিক্ষার্থীরা যাতে এক বছর অপেক্ষা না করে তিন মাসের মধ্যে শুধু অকৃতকার্য বিষয়গুলোতে আবার পরীক্ষা দিতে পারে, সেই সুযোগ দেওয়ার বিষয়টি ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করা হবে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর প্রাথমিক ও গণশিক্ষা এবং শিক্ষাবিষয়ক উপদেষ্টা মাহদী আমিন। গতকাল শনিবার ঢাকায় এক অনুষ্ঠানে তিনি সরকারের এই ভাবনার কথা তুলে ধরেন।

সভা ডেকেছে শিক্ষা বোর্ড

সরকারের এ ভাবনার মধ্যে অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের জন্য স্বল্প সময়ের মধ্যে কীভাবে পরীক্ষা নেওয়া যায়, তা নিয়ে পরিকল্পনা করছে শিক্ষা বোর্ডগুলো। সব শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যানদের সংগঠন আন্তশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সভাপতি ও ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সৈয়দ আক্তারুজ্জামান আজ রোববার প্রথম আলোকে বলেন, যারা ফেল করবে, তাদের জন্য স্বল্প সময়ের মধ্যে কী করা যায়, এ বিষয়ে আগামীকাল সোমবার একটি সভা ডাকা হয়েছে। সভায় বিষয়টি নিয়ে পরিকল্পনা করা হবে।

তবে এ বছরই এ ব্যবস্থা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে কি না, তা এখনই বলতে পারছেন না অধ্যাপক সৈয়দ আক্তারুজ্জামান। তিনি বলেন, পরীক্ষা নিতে হলে তিন মাস আগেই প্রশ্নপত্র তৈরি করে রাখতে হয়। তবে পরিকল্পনাটি এখন চূড়ান্ত করে রাখলে দ্রুততম সময়ের মধ্যে বাস্তবায়ন করা যাবে। এ ক্ষেত্রে প্রথমবার ফেল করা শিক্ষার্থীরা অন্যদের সঙ্গে একই শিক্ষাবর্ষে ভর্তির সুযোগ পাবে। পাশাপাশি পাঠ্যসূচির (সিলেবাস) দ্বৈততাও এড়ানো সম্ভব হবে। তিনি বলেন, তাঁরাও এ পরিকল্পনাকে শতভাগ ইতিবাচকভাবে দেখছেন।

তবে এ ধরনের পরীক্ষা চালু করতে হলে নীতিগত সিদ্ধান্তের পাশাপাশি পরীক্ষার সময়সূচি, প্রশ্নপত্র তৈরি ও ব্যবস্থাপনার বিষয়গুলোও বিবেচনায় নিতে হবে বলে মনে করেন শিক্ষার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। এ ক্ষেত্রে শিক্ষা বোর্ডগুলোর সক্ষমতা কতটা আছে, তা–ও দেখার বিষয়।

নীতিমালা হলে পরীক্ষা নিতে সমস্যা নেই

এ বিষয়ে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান তপন কুমার সরকারের সঙ্গে কথা হয়। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, বর্তমানে পাবলিক পরীক্ষায় এ ধরনের নিয়ম নেই। তবে শিক্ষা মন্ত্রণালয় নীতিমালা করে দিলে এ ব্যবস্থা চালু করা সম্ভব। এতে পরীক্ষার্থীরা এক বছর অপেক্ষা না করে দ্রুত পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ পাবে। একটি বিষয়ের জন্যই শিক্ষার্থীদের জীবনের একটি বছর চলে যায়।

তিন মাসের মধ্যে পরীক্ষা নেওয়া গেলে শিক্ষার্থীদের ওপর থেকে চাপ কমবে বলে মনে করেন তপন কুমার সরকার। তিনি বলেন, এতে বোর্ডের কাজের চাপ বাড়লেও পরীক্ষা নেওয়ার সক্ষমতা তাদের রয়েছে। কারণ, এ ধরনের পরীক্ষার্থীর সংখ্যা তুলনামূলক কম। তা ছাড়া, অল্প কয়েক দিনের মধ্যেই এসব বিষয়ের পরীক্ষা শেষ করা সম্ভব। এটি মূলত নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্তের বিষয়। সিদ্ধান্ত হলে পরীক্ষা নিতে কোনো সমস্যা হবে না। প্রয়োজনীয় জনবল ও ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা বোর্ডের রয়েছে। এ ব্যবস্থা পরীক্ষার্থী ও অভিভাবক—উভয়ের জন্যই ভালো হবে।

শিক্ষাবিদ ও ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক মনজুর আহমদও মনে করেন, অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের দ্রুত আবার পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ তৈরি করা উচিত। শিক্ষার্থীদের যেভাবে মূল্যায়ন করা হয়, সেটিও কতটা নির্ভরযোগ্য, সেই প্রশ্নও রয়েছে। তাই পরীক্ষার্থীদের যতটা সম্ভব সুযোগ দেওয়া উচিত।

অধ্যাপক মনজুর আহমদ বলেন, একটি বিষয়ে ফেল করলে দ্রুত সেই বিষয়ের পরীক্ষা নেওয়া গেলে তা ভালো উদ্যোগ হবে। শিক্ষার্থীদের দিক বিবেচনা করে সরকার তা চালু করতে পারে।