রামখণ্ডের শতবর্ষী হিজল

রামখণ্ড গ্রামের ‘শতবর্ষী হিজল’। ছবিটি সম্প্রতি তোলা। ছবি: প্রথম আলো
রামখণ্ড গ্রামের ‘শতবর্ষী হিজল’। ছবিটি সম্প্রতি তোলা। ছবি: প্রথম আলো

ফরিদপুর শহর থেকে ১৭ কিলোমিটার দূরে সদর উপজেলার কানাইপুর ইউনিয়নের রামখণ্ড গ্রাম। এখানেই রয়েছে একটি হিজলগাছ। এর বয়স ১০০ বছরের ওপরে। গাছটির প্রকৃত বয়স কত, তা নিশ্চিতভাবে জানা না গেলেও এলাকায় গাছটি ‘শতবর্ষী হিজল’ হিসেবে পরিচিত এবং সমাদৃত। প্রবীণ এই গাছ দেখতে প্রতিদিন দূরদূরান্ত থেকে অগণিত দর্শনার্থী ভিড় করেন।

ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কের কানাইপুরের জাহাঙ্গীর টাওয়ারের সামনে দিয়ে দক্ষিণ দিকে কানাইপুর-সালথা সড়কের পাঁচ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করলেই চোখে পড়বে রামখণ্ড সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। ওই বিদ্যালয়ের দক্ষিণ দিকে আনুমানিক ৪৮ শতাংশ জমির ওপর কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে এই হিজলগাছ।

গাছটি সংরক্ষণ করেছে ফরিদপুর বন বিভাগ। স্থানীয় ইউপির চেয়ারম্যানের সহযোগিতায় সামাজিক বন বিভাগের উদ্যোগে গাছের সামনে ‘শতবর্ষী হিজলগাছ’ নামে একটি সাইনবোর্ড টাঙানো হয়েছে। তাতে বলা হয়েছে, গাছটির বয়স ১০০ বছরের বেশি। গাছটির উচ্চতা ২৫ ফুট এবং কাণ্ডের প্রস্থ ১৪ ফুট। এ গাছটি Lecythidaceae পরিবারভুক্ত, বৈজ্ঞানিক নাম Barringtonia acutangula (L) Graerth.

ওই সাইনবোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, এ গাছ জলজ পাখির আশ্রয়স্থল ও বংশবিস্তারে ভূমিকা রাখে। ওষুধ হিসেবেও হিজলগাছের বীজ ও বাকল ব্যবহৃত হয়। এর বীজ মাথাব্যথা, অ্যান্টিবায়োটিক, ছত্রাকনাশক ও টিউমার চিকিৎসায় ব্যবহার হয়। এর ছাল ঠান্ডা, কাশি, ক্ষতস্থান ও বাত রোগের উপশম দেয়।

হিজলগাছটির সামনে বন বিভাগের সাইনবোর্ড। ছবি: প্রথম আলো

হিজল মাঝারি আকারের চিরহরিৎ গাছ। বাকল ঘন ছাই রঙের এবং পুরু। ডালপালা বিস্তার চারদিকে। এ গাছ জলাবদ্ধতা সহ্য করতে পারে এবং দীর্ঘদিন বাঁচে। বাংলাদেশের জলাবদ্ধ এলাকা খাল-বিল, নদী-নালা, হাওর-বাঁওড় ও ডোবার ধারে চোখে পড়ে এ গাছ। হিজলগাছ নরম উজ্জ্বল, মসৃণ ও টেকসই। পানিতে নষ্ট হয় না বলে নৌযান নির্মাণে ব্যবহার হয় এ গাছ। সস্তা আসবাবপত্র ও জ্বালানি হিসেবেও ব্যবহার করা হয় এ কাঠ।

রামখণ্ড সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সংলগ্ন অশীতিপর বৃদ্ধ হাতেম মোল্লা বলেন, ‘হিজলগাছটি আমাদের মালিকানাধীন জায়গায় অবস্থিত। আমাদের পূর্বপুরুষের কেউ এ গাছ রোপণ করেছিল, নাকি গাছটি প্রকৃতিগতভাবেই গাছটির জন্ম হয়েছিল, তা জানি না।’

হিজল ফুল ফোটে বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ মাসে। গোলাপি রঙের হিজল লম্বা পুতুলের মধ্যে অসংখ্য ফুল ঝুলন্ত অবস্থায় ফোটে। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ফুল ফোটা শুরু হয়, সকালের আলোয় ঝড়ে যায়। সকালবেলায় হিজলতলায় গেলে মনে হয় গোলাপি গালিচা পেতে রাখা হয়েছে। এই ফুলের মাদকতাপূর্ণ গন্ধ দূর থেকেই ভেসে আসে। ফুল শেষ হলে গাছে ফল ধরে। ফল তিতা ও বিষাক্ত, দেখতে অনেকটা হরীতকীর মতো।

ওই এলাকার বাসিন্দা মিঠুন কুমার দাস বলেন, ‘গাছটি দেখতে প্রতিদিন দূরদূরান্ত থেকে অনেক মানুষ আসেন। তাঁদের দেখে গর্বে আমার বুক ভরে যায় এ কথা ভেবে যে আমাদের গ্রামে একটি গাছ আছে, যার জন্য অনেক দর্শনার্থী আসেন।’

ওই গাছ দেখতে আসা দর্শনার্থী নগরকান্দা উপজেলার ফুলসুতী ইউনিয়নের বাউতিপাড়া গ্রমের জহিরুল হোসেন বলেন, এ জায়গাটি সরকারি উদ্যোগে একটি পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা যায়। পাশাপাশি যাতায়াতের সুবন্দোবস্ত করা উচিত। বর্তমানে বাসে কানাইপুর নেমে রিকশাভ্যান বা অটোতে করে আসা-যাওয়ার কাজ করতে হয়।

কানাইপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ফকির বেলায়েত হোসেন বলেন, ‘আমার প্রচেষ্টায় বন বিভাগের মাধ্যমে ওই সাইনবোর্ড স্থাপন করা হয়েছে। তবে আমি চাই বন বিভাগ এ গাছটির দেখভাল করুক, পরিচর্যা করুক, যাতে এ গাছটি আরও বহু বছর বেঁচে থাকতে পারে।’

ফরিদপুর নিসর্গ সংসদের সভাপতি মাকসুদুর রহমান বলেন, ‘শতবর্ষী গাছ আমাদের দেশে খুব বেশি নেই। যে গাছগুলো আছে, সেগুলো সরকারি উদ্যোগে রক্ষণাবেক্ষণ করা প্রয়োজন।’

এ হিজলগাছকে রক্ষা করা জরুরি বলে মনে করেন ফরিদপুর বন বিভাগের বিভাগীয় কর্মকর্তা মো. এনামুল হক। তিনি বলেন, ‘একটি প্রাচীন গাছ ওই এলাকার যেমন সম্পদ, তেমনই সেটি দেশেরও সম্পদ।’