কয়েক বছর আগে টাঙ্গুয়ার হাওরে হিজলবনের ধারে বিচিত্র লতাগুল্ম আর ঝোপঝাড়ের ভেতর দুধিয়া লতার সুদৃশ্য ঝাড় দেখে বিমুগ্ধ হয়েছিলাম। অন্য গাছের মাথায় জেঁকে বসে বেশ রাজত্ব করছিল। কিন্তু গাছে কোনো ফুল ছিল না। স্থানীয় লোকজনকে জিজ্ঞেস করলাম কখন ফুল ফোটে, বলতে পারলেন না। ফুলের দেখা পেলাম বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের বোটানিক্যাল গার্ডেনে। মনে পড়ল বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের আরণ্যক গ্রন্থের কথা। সেখানে দুধিয়া ফুলের প্রসঙ্গ আছে। তবে আমাদের দুধিয়া লতা আর আরণ্যক-এর দুধিয়া ফুল সম্ভবত ভিন্ন। আরণ্যক-এ উদ্ধৃত অংশটুকু পড়া যাক:
‘জয়ন্তী পাহাড়ের জঙ্গলে এক-প্রকার অদ্ভুত ধরনের বনপুষ্প হয়—ওদেশে তার নাম দুধিয়া ফুল। হলুদ গাছের মতো পাতা, অত বড়ই গাছ—খুব লম্বা একটা ডাঁটা ঠেলিয়া উঁচু দিকে তিন-চার হাত ওঠে। একটা গাছের চার-পাঁচটা ডাঁটা হয়, প্রত্যেক ডাঁটায় চারটি করিয়া হলুদ রঙের ফুল ধরে। দেখিতে খুব ভালো তো বটেই, ভারি সুন্দর তার সুবাস। রাত্রে অনেক দূর পর্যন্ত সুগন্ধ ছড়ায়। সে ফুলের একটা গাছ যেখানে একবার জন্মায় দেখিতে দেখিতে এত হু হু করিয়া বংশবৃদ্ধি হয় যে দু’তিন বছরে রীতিমতো জঙ্গল বাঁধিয়া যায় (পৃ. ৬৬)।’
সে যাত্রায় হাওরের কান্দায় হাঁটতে হাঁটতে চোখে পড়ল গোলাপি রঙের আঠালো বিষকাঁটালির ঝাড়। সুসজ্জিত ফুলগুলো জনমানবহীন হাওরে আলো ছড়াচ্ছে। সাধারণ বিষকাঁটালি যত্রতত্র চোখে পড়লেও গোলাপি বিষকাঁটালি ততটা সহজলভ্য নয়। নেপালের বিভিন্ন পাহাড়ে ঘোরাঘুরির সময়ও গাছটি দেখেছি। টাঙ্গুয়ার হাওরের বিপুল উদ্ভিদবৈচিত্র্যের মধ্যে অন্যতম একটি ফুল এই গোলাপি রঙের বিষকাঁটালি।
দুধিয়া লতা
জলাভূমি অঞ্চল ছাড়াও এ গাছ প্রায় সারা দেশেই সহজলভ্য ছিল। কিন্তু বর্তমানে অনেকটাই বিরল। টাঙ্গুয়ার হাওরে সাধারণত জলাভূমি বা কর্দমাক্ত এলাকায় পাওয়া যায়। কখনো কখনো এমন স্থানেও দেখা যায়, যেখানে কিছুদিন আগেও পানি ছিল কিন্তু ইদানীং এলাকাটি আধা শুষ্ক এমন। এ গাছের ইংরেজি নাম রোজি মিল্কউইড ভাইন। স্থানীয়ভাবে দুধলতা নামেও পরিচিত। বুনো ফুল বলেই অবহেলিত নয়, কারণ এ ফুলের আছে স্নিগ্ধশোভা।
দুধিয়া গাছ (Oxystelma secamone) লতানো, নরম, রোমশ, বহুবর্ষজীবী ও বৃক্ষারোহী। পত্রমোচী এই উদ্ভিদ বসন্তে পাতা ঝরায়। পাতার গড়ন লম্বাটে, বহু শিরাযুক্ত ও বোঁটা অবনত, সবৃন্তক, পত্রবৃন্ত প্রায় ১ সেমি লম্বা, পত্রফলক রৈখিক, শীর্ষ সূক্ষ্মাগ্র, ৬ থেকে ১০ সেমি, ঝিল্লিময়, অধিকাংশ ক্ষেত্রে মসৃণ। মঞ্জরিদণ্ড একাধিক। দলমণ্ডল প্রায় আড়াই সেমি প্রশস্ত এবং ১ সেমি দীর্ঘ, মসৃণ। ফুলের সাদা জমিনে বেগুনি ও গোলাপি রঙের শিরা আকর্ষণীয়। তাতেই বৈচিত্র্যময় দেখায়। বর্ষার শেষভাগে ফুল, ফল শীতের শুরুতে।
আঠালো বিষকাঁটালি
আঠালো বিষকাঁটালির (Persicaria viscosa) ইংরেজি নাম স্টিকি নটউইড। এটি বর্ষজীবী, কটু গন্ধযুক্ত ভেষজ উদ্ভিদ। কাণ্ড সোজা বা ঊর্ধ্বমুখী, ২ থেকে ৩ ফুট উঁচু, বহু শাখাবিশিষ্ট এবং ঘন রোম ও গ্রন্থিযুক্ত রোমে আবৃত। লাল রঙের পুষ্পমঞ্জরিগুলো শাখার অগ্রভাগে বা পাতার কক্ষে ২ থেকে ৪ সেমি লম্বা হয়ে ফোটে। সাধারণত কয়েকটি মঞ্জরি একত্রে গুচ্ছবদ্ধ হয়ে প্যানিকল বা ছড়ার মতো বিন্যাস তৈরি করে। মঞ্জরিদণ্ড ঘন রোম ও গ্রন্থিযুক্ত রোমে আবৃত থাকে; উপপত্রগুলো ফানেল আকৃতির, রোমশ এবং কিনারা বিক্ষিপ্ত দীর্ঘ রোমে ঝালরের মতো সজ্জিত। ফুলের বোঁটা উপপত্রের চেয়ে লম্বা। ফুল গোলাপি আভাযুক্ত ও পাঁচ অংশবিশিষ্ট; পুষ্পপত্র উপবৃত্তাকার, প্রায় ৩ মিমি লম্বা। এতে আছে ৮টি পুংকেশর, যা ফুলের ভেতরেই সীমাবদ্ধ থাকে। পাতার বোঁটা প্রায় অনুপস্থিত, ফলক ডিম্বাকৃতি বা উপবৃত্তাকার। পাতার কিনারা অখণ্ড এবং ঘন ও ছোট রোমের ঝালরযুক্ত। উপপত্রগুলো যুক্ত হয়ে একটি নলাকার আবরণ তৈরি করে। এ গাছ হিমালয় অঞ্চল থেকে শুরু করে পূর্বে চীন, কোরিয়া ও জাপান পর্যন্ত এবং সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১ হাজার ৮০০ মিটার উচ্চতা পর্যন্ত দেখা যায়। ফুল ফোটার মৌসুম জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বিস্তৃত।
বিষকাঁটালি ভেষজগুণে সমৃদ্ধ। পাতার রস রক্তপাত বন্ধ করে। রক্তবমি ও রক্ত আমাশয়েও উপকারী। ফোঁড়া ফাটানোর জন্য গাছটি ব্যবহৃত হয়।