সুন্দরবনে প্রতি ১০টি সুন্দরীগাছের মধ্যে ৪টি (৩৯ শতাংশ) আগামরা বা টপ-ডাইং রোগে আক্রান্ত। এখন আক্রান্ত সুন্দরীগাছের সংখ্যা ১২ কোটি ৯৫ লাখ। এর মধ্যে মারাত্মকভাবে আক্রান্ত সুন্দরীগাছের সংখ্যা ২ কোটি ২ লাখ ৪০ হাজার।
সুন্দরবনে সুন্দরীগাছের সংখ্যা এখন প্রায় ৩৩ কোটি। প্রাকৃতিকভাবে হেক্টরপ্রতি চারা জন্মানোর হারও কমেছে বিশ্বের বৃহৎ এ ম্যানগ্রোভ বনে। এ কারণে সুন্দরবনের কার্বন শোষণের ক্ষমতা কমেছে ১৫ শতাংশ। দুই বছর ধরে (২০২৪-২৫) সুন্দরবনের সামগ্রিক প্রতিবেশব্যবস্থা নিয়ে করা এক গবেষণায় এ চিত্র উঠে এসেছে।
‘ইকোলজিক্যাল মনিটরিং অব সুন্দরবন’ শীর্ষক বহুমাত্রিক এ গবেষণা পরিচালনা করেছে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সহযোগী প্রতিষ্ঠান সিইজিআইএস (সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্টাল অ্যান্ড জিওগ্রাফিক ইনফরমেশন সার্ভিসেস) ও আরণ্যক ফাউন্ডেশন। সুন্দরবনের বন্য প্রাণী, বায়ু, মাটি, পানি ও বৃক্ষসম্পদ নিয়ে গবেষণাটি করা হয়। গত ১৪ সেপ্টেম্বর রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বন ভবনে এক কর্মশালায় এ গবেষণার ফলাফল প্রকাশ করা হয়। গবেষণায় সুন্দরীগাছের এ দুর্দশার বিস্তারিত চিত্র উঠে এসেছে।
গবেষকদের আশঙ্কা, সুন্দরবনের আচ্ছাদন, কার্বন সঞ্চয় করার সক্ষমতা, বন্য প্রাণীর আবাস ও বিন্যাস বদলে যেতে পারে। কারণ, আগামরা রোগ হলে প্রথমে সুন্দরীগাছের পাতা আক্রান্ত হয়। এরপর ডালপালা ও শাখা-প্রশাখা শুকিয়ে গাছের মূলকাণ্ড ধ্বংস হয়ে যায়। গবেষণায় সুন্দরবনের গুরুত্বপূর্ণ এ বৃক্ষের দুর্দশার পেছনে লবণাক্ততা বৃদ্ধি, মিঠাপানির প্রবাহ কমে যাওয়া, পলিপতন, জোয়ার-ভাটায় পরিবর্তন আসা ও জলবায়ুর পরিবর্তনকে দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা।
গবেষণাটি করেন সিলেট বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফরেস্ট্রি অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্সের অধ্যাপক স্বপন সরকার। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, সুন্দরবনে ১৯৮৬ সাল থেকে ১২০টি স্থায়ী সার্ভে প্লট বা জরিপ প্লট আছে। এসব জরিপ প্লটে থাকা গাছের পরিবর্তনগুলোকে শনাক্তের পর নির্দিষ্ট পদ্ধতি অনুসরণ করে আক্রান্ত গাছের এ সংখ্যা পাওয়া গেছে। তিনি বলেন, ১৯৮৬ সালের তুলনায় টপ-ডায়িং রোগ কিছুটা কমলেও এ রোগে গুরুতর অসুস্থ হওয়া গাছের সংখ্যা বেড়েছে। উচ্চ ও মাঝারি মাত্রার লবণাক্ত অঞ্চলে সুন্দরীগাছের এ রোগে আক্রান্ত হওয়ার হার বেশি।
বিপুলসংখ্যক গাছ আগামরা রোগে আক্রান্তের ফলে বন, বন্য প্রাণী ও বনের সার্বিক বাস্তুতন্ত্রে কী প্রভাব পড়ছে, তার জন্য আলাদা গবেষণা দরকার।
সুন্দরবনে আক্রান্ত গাছগুলো সব একই মাত্রায় আক্রান্ত হয় না। পাতা থেকে গাছের মূলকাণ্ড পর্যন্ত কতটুকু আক্রান্ত হয়েছে, সেটির ওপর ভিত্তি করে আক্রান্ত হওয়ার শতাংশ নির্ধারণ করা হয়। যেমন গাছের পাতা ও শাখা-প্রশাখা অল্প মাত্রায় আক্রান্ত হলে সেটি ২৫ শতাংশের কম আক্রান্ত। গবেষণার উপাত্ত বলছে, ২৫ শতাংশের কম আক্রান্ত গাছের সংখ্যা ৮ কোটি ৩০ লাখ ৩০ হাজার।
২৫ থেকে ৫০ শতাংশ (গাছের পাতা, শাখা-প্রশাখার পুরোটা) আক্রান্ত গাছের সংখ্যা ২ কোটি ৫০ লাখ ৮০ হাজার। ৫০ শতাংশের বেশি অর্থাৎ যেসব গাছের পাতা, শাখা-প্রশাখা ও মূলকাণ্ড আক্রান্ত হয়েছে, এমন গাছের সংখ্যা ২ কোটি ২ লাখ ৪০ হাজার। গবেষণার উপাত্ত অনুযায়ী, সুন্দরবনের ৩৩ কোটি গাছের মধ্যে সুস্থ গাছের সংখ্যা ২০ কোটির মতো।
অধ্যাপক স্বপন কুমার বলেন, ‘১৯৮৬ সালে গুরুতর অসুস্থ গাছের সংখ্যা ছিল ১ কোটি ১৯ লাখ ২০ হাজার। সেটি এখন ২ কোটি ২ লাখ ৪০ হাজারে পৌঁছেছে। এটা ভাবনার বিষয়। দীর্ঘ মেয়াদে এসব প্রবণতাকে পর্যবেক্ষণে রেখে আমাদের সমাধান খুঁজে বের করতে হবে।’
গবেষণায় লবণাক্ততাকে সুন্দরবনের বাস্তুতান্ত্রিক স্বাস্থ্য রক্ষায় অন্যতম গুরুতর সংকট হিসেবে চিহ্নিত করে বলা হয়েছে, সুন্দরবনের মধ্য ও পশ্চিমাঞ্চল উচ্চ লবণাক্ততার ঝুঁকিতে রয়েছে। উজান থেকে পানির প্রবাহ কমে আসা, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, বৃষ্টির তারতম্যের কারণে এ সংকট দিন দিন বাড়ছে।
গবেষণার সুবিধার্থে সুন্দরবনকে ৫৩টি কম্পার্টমেন্টে ভাগ করা হয়েছে। এসব কম্পার্টমেন্টের মধ্যে আগামরা রোগে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হচ্ছে খুলনা রেঞ্জের পাটকোস্টাম, কাগা দোবেকি ও গেওয়াখালী এলাকায়। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ আক্রান্ত এলাকা হলো সাতক্ষীরা রেঞ্জের দোবেকি, চান্দপাই রেঞ্জের হারবাড়িয়া, চড়াপুটিয়া এবং শরণখোলা রেঞ্জের কোকিলমনি।
১৯৮৮ সালের জানুয়ারিতে ব্রিটিশ উদ্ভিদবিজ্ঞানী ও ইউনিভার্সিটি অব এবারডনের অধ্যাপক এরিক বোয়া ‘সিম্পটম অ্যান্ড কজেস অব টপ ডায়িং’ শীর্ষক একটি গবেষণা করেন। সেই গবেষণায় লবণাক্ততা বৃদ্ধিকে দায়ী করা হয়েছিল।
অধ্যাপক স্বপন কুমারের মতে, লবণাক্ততা বেশি এমন অঞ্চলে রোগ বেশি ছড়ালেও এটি এখনো বৈজ্ঞানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত নয় যে লবণাক্ততাই এককভাবে দায়ী। এখানে দীর্ঘ মেয়াদে আরও গবেষণার প্রয়োজন আছে।
সুন্দরবনে প্রতি হেক্টরে চারার ঘনত্ব কমছে। গবেষণা বলছে, ১৯৮৬ সালে সুন্দরবনের প্রতি হেক্টরে চারার ঘনত্ব ছিল ২ হাজার ৬৮৯টি। ২০২২ সালে সেটি কমে এসে দাঁড়িয়েছে ৭৭৬টিতে। ৩৬ বছরে চারার ঘনত্ব কমেছে প্রায় ৭১ শতাংশ। এতে সুন্দরবন প্রাকৃতিক পুনর্জন্মের সক্ষমতা হারাচ্ছে। গত তিন দশকে সুন্দরবনের ভূ-উপরিস্থ বায়োমাস (জৈবভর) কমেছে ১৫ শতাংশ।
জানতে চাইলে বন অধিদপ্তরের প্রধান বন সংরক্ষক মো. আমীর হোসাইন চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, স্বাধীনতার আগে-পরে মিলিয়ে এটি সুন্দরবনের প্রথম বেজলাইন স্টাডি (ভিত্তিমূলক সমীক্ষা)। টপ-ডায়িং সুন্দরবনের শতাব্দীপ্রাচীন সমস্যা। এ সমস্যা মোকাবিলায় আশি ও নব্বইয়ের দশকের শুরুতে বাংলাদেশ ফরেস্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউট (বিএফআরআই) আক্রান্ত গাছগুলো চিহ্নিত করে কেটে ফেলত। ধারণা করা হতো, সুস্থ গাছে এ রোগ আর ছড়াবে না। সে পদ্ধতি কাজে না আসায় পরে তা বন্ধ করে দেওয়া হয়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দীর্ঘ মেয়াদে সুন্দরীগাছ টিকে থাকবে কি না, সুন্দরীর জায়গায় অন্য প্রজাতির গাছ চলে আসার কারণে সুন্দরবনের বাস্তুতন্ত্রে কী প্রভাব পড়ছে, বন্য প্রাণীর ওপর এর প্রভাব কী হচ্ছে, সেটা বলা যাচ্ছে না। তার একমাত্র কারণ সুন্দরবন নিয়ে একাডেমিক বা রাষ্ট্রীয়ভাবে কোনো ধারাবাহিক গবেষণা হয় না।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব ফরেস্ট্রি অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্সের অধ্যাপক খালেদ মিসবাহুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, সুন্দরবনে অনুক্রমিক উদ্ভিদের বিস্তারে সুন্দরীগাছ আসে সবার শেষে। অর্থাৎ সুন্দরবনের খোলা জায়গায় যেসব চারা জন্মাবে, সেখানে সবার শেষে জন্মায় সুন্দরী। তাই এ প্রজাতিকে ক্লাইমেক্স স্পিসিজ বলা হয়। এই গাছ সুন্দরবনের প্রাধান্য বিস্তারকারী (ডমিনেন্ট) প্রজাতি। কোনো কোনো ক্ষেত্রে যেখানে আগে অনেক বেশি সুন্দরীগাছ ছিল, সেসব স্থানে ছোট ছোট বৃক্ষ প্রজাতি সিংড়া ও আমুর বৃক্ষের প্রাকৃতিক পুনর্জন্ম দেখা যাচ্ছে। তা ছাড়া সুন্দরী বৃক্ষের অঞ্চলে গরানের বিস্তারও কোথাও কোথাও বাড়ছে। তাঁর মতে, সুন্দরবনকে বাঁচানোর স্বার্থে এসব পরিবর্তনের প্রভাব বোঝাটা জরুরি। আশা করা যায়, সরকার ও বন অধিদপ্তর ধারাবাহিক গবেষণার প্রয়োজনীয়তা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করবে।