প্রায় দেড় কিলোমিটার মেঠো পথের কিছুদূর পরপর কংক্রিটের ঢালাই দেওয়া হয়েছে
প্রায় দেড় কিলোমিটার মেঠো পথের কিছুদূর পরপর কংক্রিটের ঢালাই দেওয়া হয়েছে

কক্সবাজারে দখলদারদের সুবিধার্থে সংরক্ষিত বনে সড়ক

কক্সবাজারের মহেশখালী উপজেলার শাপলাপুর সড়ক ধরে জেএম ঘাটের দিকে যেতে সারি সারি গাছ দেখা যায়। জেএম ঘাট থেকে সংরক্ষিত বনের শুরু। এখান থেকে সংরক্ষিত বনের ভেতর দিয়ে চলে গেছে একটি মেঠো পথ। মেঠো পথটি এখন রূপান্তরিত হচ্ছে ১৮ ফুট সড়কে। এতে ঝুঁকিতে পড়ছে দেশের একমাত্র পাহাড়ি বনসমৃদ্ধ মহেশখালীর এই সংরক্ষিত বন।

১৬ সেপ্টেম্বর সরেজমিনে দেখা যায়, প্রায় দেড় কিলোমিটার এই মেঠো পথের কিছুদূর পরপর কংক্রিটের ঢালাই। দুই পাশে পাহাড় ঘেঁষে ঘরবাড়ি, দোকানপাট ও পানের বরজ মিলে পুরো একটা জনপদ গড়ে উঠেছে বনের ভেতর। এখানে বসবাসরত সবাই বন বিভাগের নথিতে জবরদখলকারী হিসেবে তালিকাভুক্ত।

মেঠো পথটি যেখানে গিয়ে শেষ হয়েছে, সেখানে একটি পাহাড়ি ছড়া। রাস্তার এক পাশে স্তূপ করে রাখা নির্মাণসামগ্রী। ছড়ার ওপর ১০ থেকে ১২ জন শ্রমিক সড়ক নির্মাণের কাজে ব্যস্ত। সেখানে নির্মাণকাজ তদারকি করছিলেন মোহাম্মদ ইদ্রিস (৪৫)। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘এ সড়কটি হলে আমরা এখান থেকে পাশের ইউনিয়ন কালামারছড়ায় অল্প সময়ে যাতায়াত করতে পারব। দিনরাত কাজ চলছে। আমরাও সহযোগিতা করছি।’ সড়কের কাজ বন্ধে আদালতের নিষেধাজ্ঞার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এসব আমাদের জানা নেই।’

ইদ্রিসের কাছে জানতে চাইলাম, যে জায়গায় তিনি বসবাস করছেন, সেটা তাঁর নিজের জমি কি না? জবাবে ইদ্রিস জানালেন, এখানে সবাই সরকারি জায়গায় বসবাস করছে। কারও কাছে জমির কাগজ নেই। উপস্থিত অন্যরা এ বিষয়ে কথা বলতে চাননি।

বন বিভাগের তথ্য বলছে, ১৯৫৭ সালে বন আইন-১৯২৭ সালের ২০ ধারায় শাপলাপুরের এই অংশ ১২ নম্বর পাহাড় মৌজাকে সংরক্ষিত বন ঘোষণা করে সরকার। এ মৌজায় বনভূমির পরিমাণ ১৮ হাজার ২৮৬ একর।

সুবিধা পাবে দখলদারেরা

বন বিভাগের তথ্য বলছে, শাপলাপুর এলাকার ১৮ হাজার ২৮৬ একর সংরক্ষিত বনের ভেতর অবৈধভাবে ঘরবাড়ি, দোকানপাট নির্মাণ করে বসবাস করছে চার হাজারের বেশি মানুষ। এই সড়ক হলে তারা সুবিধা পাবে। একই সঙ্গে বনভূমি দখলের প্রবণতা বাড়বে উল্লেখ করে এ বছরের জুনে স্থানীয় সংসদ সদস্যকে (এমপি) চিঠি দেয় বন বিভাগ। সড়ক নির্মাণে বন বিভাগের সহায়তা চেয়ে দেওয়া চিঠির জবাবে স্থানীয় এমপি আলমগীর মোহাম্মদ মাহফুজুল্লাহ ফরিদকে এ বিষয়টি জানায় বন বিভাগ।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) মহেশখালী উপজেলার ভারপ্রাপ্ত সভাপতি আমিনুল হক প্রথম আলোকে বলেন, যারা বনের ভেতর বসবাস করছে, সড়কটি হলে তারা সুবিধা পাবে। এমনিতে বনের ভেতর অবৈধ বাড়িঘর, দোকানপাট হয়েছে। এ সড়ক হলে বন যেটুকু অবশিষ্ট আছে, সেটাও রক্ষা করা যাবে না।

চট্টগ্রাম উপকূলীয় বন বিভাগের মাঠ পর্যায়ের কার্যালয় শাপলাপুরের বিট কর্মকর্তা মিল্টন চন্দ্র সরকার বলেন, বন আইন অনুযায়ী, সংরক্ষিত বনে কোনো ধরনের স্থাপনা বা অবকাঠামো করার সুযোগ নেই। বন বিভাগ বাধা দিয়ে কাজ বন্ধ করলেও গায়ের জোরে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। এ ঘটনায় একটি মামলা করেছেন বলে জানান তিনি।

জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো–অপারেশন এজেন্সির (জাইকা) অর্থায়নে সাড়ে চার কিলোমিটারের এ সড়কটি নির্মাণ করছে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল বিভাগ। এ সড়ক নির্মাণে ব্যয় করা হচ্ছে ২২ কোটি ৩৭ লাখ টাকা। জানতে চাইলে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল বিভাগের উপজেলা প্রকৌশলী বনি আমিন প্রথম আলোকে বলেন, ‘এ সড়কটি আমাদের আইডিভুক্ত। যোগাযোগব্যবস্থা করার সুবিধার্থে দেশের প্রতিটি জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়নের নির্দিষ্ট কিছু সড়ককে আমরা চিহ্নিত করি, যেগুলোর প্রতিটির জন্য একটি নম্বর থাকে।’ তিনি বলেন, এ সড়ক নির্মাণে আদালত নিষেধাজ্ঞা দিয়েছেন বলে তিনি শুনেছেন। এখনো আদেশের নথি পাননি। তিনি দাবি করেন, এ সড়ক হলে পাশের ইউনিয়নের সঙ্গে শাপলাপুর ইউনিয়নের ২০ কিলোমিটার দূরত্ব কমে মাত্র সাড়ে চার কিলোমিটারে নেমে আসবে। তবে কতজন মানুষ এ সড়কের সুবিধা পাবে, তা বলতে পারেননি।

ঝুঁকিতে পড়বে বন্য প্রাণী, উজাড় হবে বন

সড়ক নির্মাণে বন বিভাগের বাধার পরিপ্রেক্ষিতে স্থানীয় এমপি আলমগীর মোহাম্মদ মাহফুজুল্লাহ ফরিদ বন বিভাগকে প্রশাসনিক সহায়তা প্রদানের অনুরোধ জানিয়ে একটি চিঠি দেন গত জুনে। চিঠির জবাবে বন বিভাগ জানায়, এ বনটি সংরক্ষিত বনভূমি বিধায় বিদ্যমান আইনে এখানে সড়ক নির্মাণের কোনো সুযোগ নেই। চিঠিতে বলা হয়, এ বনে চিত্রা হরিণ, মায়া হরিণ, সংকটাপন্ন পাহাড়ি কচ্ছপ, মুখপোড়া হনুমান, অজগরসহ নানা প্রজাতির সরীসৃপ ও বন্য প্রাণীর গুরুত্বপূর্ণ আবাসস্থল। এখানে সড়ক হলে এসব বন্য প্রাণী অস্তিত্ব সংকটে পড়বে।

চিঠিতে আরও উল্লেখ করা হয়, প্রাকৃতিক বন ও বাস্তুতন্ত্র একটি জটিল প্রক্রিয়ায় বহু বছর ধরে গড়ে ওঠে। বন্য প্রাণী, মাটির অণুজীব, কীটপতঙ্গ, উদ্ভিদ, জলাধার ও বিভিন্ন পরিবেশগত উপাদানের মাধ্যমে বনের দীর্ঘমেয়াদি একটি বাস্তুতন্ত্র গড়ে ওঠে। সড়কটি নির্মাণ করা হলে সেটি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। বন্য প্রাণীর স্বাভাবিক চলাচল বাধাগ্রস্ত হবে, বনের ভেতরের শতবর্ষী গাছ কাটা পড়বে, বন দখলের প্রবণতা বাড়বে মানুষের মধ্যে।

আদালতের আদেশ ও বন আইন উপেক্ষা

এ বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জিতে ক্ষমতায় আসার পর অন্তর্বর্তী সরকারের করা অধ্যাদেশগুলোর মধ্যে আইনে পরিণত করা হয় ‘বন ও বৃক্ষ সংরক্ষণ আইন-২০২৬’। এ আইনের বনভূমি সুরক্ষা ও ব্যবস্থাপনা–সংক্রান্ত ধারা ৭ অনুযায়ী, কোনো প্রাকৃতিক বন বনবিরুদ্ধ বা বনবহির্ভূত কাজে ব্যবহার করা যাবে না। তবে অন্যান্য বনভূমির ক্ষেত্রে জাতীয় অপরিহার্য কারণে বা কোনো বিকল্প না থাকলে নিরপেক্ষ পরিবেশগত ও সামাজিক প্রভাব নিরূপণ, ক্ষতিপূরণমূলক বনায়ন করতে হবে। তবে সেটা হতে হবে মন্ত্রিসভার অনুমোদন সাপেক্ষে।

বন ও বৃক্ষ সংরক্ষণ আইন-২০২৬, জাতীয় বননীতি ও উচ্চ আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী সংরক্ষিত বনের ভেতর কোনো ধরনের স্থাপনা ও অবকাঠামো গড়ে তোলা নিষেধ।

সংবিধানের ১৮(ক) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, রাষ্ট্র বর্তমান ও ভবিষ্যৎ নাগরিকদের জন্য পরিবেশ সংরক্ষণ ও উন্নয়ন করবে। প্রাকৃতিক সম্পদ, জীববৈচিত্র্য, জলাভূমি, বন ও বন্য প্রাণীর সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা বিধান করার বাধ্যবাধকতার কথাও ১৮(ক) অনুচ্ছেদে উল্লেখ রয়েছে। এ ছাড়া জাতীয় বননীতি-২০২৫ তে উন্নয়ন প্রকল্পে বনভূমির ব্যবহারকে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) সাধারণ সম্পাদক মো. আলমগীর কবির প্রথম আলোকে বলেন, মহেশখালী দেশের একমাত্র পাহাড়ি জীববৈচিত্র্যসমৃদ্ধ দ্বীপ। দেশের বিদ্যমান আইন অনুযায়ী সংরক্ষিত বনের ভেতর কোনোভাবে সড়ক নির্মাণ করার সুযোগ নেই। এমনিতে দেশে বনভূমির পরিমাণ কমছে। তার ওপর বনের ভেতর সড়ক করা হলে বনভূমির উজাড় করার সুযোগ বাড়বে।