বলধা গার্ডেনের সাইকি থেকে সম্প্রতি তোলা কনকসুধার ছবি
বলধা গার্ডেনের সাইকি থেকে সম্প্রতি তোলা কনকসুধার ছবি

কনকসুধার রূপমাধুরী

কনকসুধা নামের মধ্যেই একধরনের মাধুর্য আছে। আছে মায়াময়তাও। এই নামের আড়ালে ঢাকা পড়েছে গাছটির ভিনদেশি পরিচয়। উষ্ণমণ্ডলীয় আমেরিকার এই উদ্ভিদ প্রজাতিটির বাংলা নামকরণ করেন অধ্যাপক সানাউল্লাহ। তিনি কিছুকাল বলধা গার্ডেনের কর্মী নিসর্গী অমৃতলাল আচার্যের নিত্যসঙ্গী ছিলেন। কনকসুধা নিয়ে একটি কবিতাও লিখেছিলেন, ‘তোমার কনককান্তি সুরভির সুধা/ স্নিগ্ধ করে প্রাণমন, মুগ্ধ এ বসুধা’।

অমৃতলাল আচার্য একজন নিবেদিতপ্রাণ নিসর্গী ছিলেন। জমিদার নরেন্দ্রনারায়ণ রায়ের মৃত্যুর পর দেশের চরম সংকটকালে বলধা গার্ডেন যখন প্রায় ধ্বংসের উপক্রম, তখন তিনি ঐতিহাসিক এই বাগানের হাল ধরেছিলেন। নিজের সন্তানের মতো আগলে রেখেছিলেন বাগানটি। জানা যায়, উদ্যান নির্মাণের প্রাথমিক পর্যায়ে এই ফুলের গাছটি শ্রীলঙ্কা থেকে সংগ্রহ করার উদ্যোগ নেন বৃক্ষপ্রেমী জমিদার। সে অনুযায়ী ক্রয়াদেশও পাঠানো হয়। কিন্তু গাছটি ভুলবশত জাহাজে চড়ে চলে যায় অস্ট্রেলিয়ায়। পরে অনেক চেষ্টায় বাগানের প্রতিষ্ঠাতা জমিদার নরেন্দ্রনারায়ণ রায় অস্ট্রেলিয়া থেকে গাছটি উদ্ধার করে বাগানে নিয়ে আসেন। রোপণ করা হয় বাগানের সাইকি অংশে, যার বয়স এখন শতোর্ধ্ব। বলধা-বাগানে বেড়াতে আসা প্রকৃতিপ্রেমীরা স্নিগ্ধ শোভার এই ফুলটির রূপ–লাবণ্য দেখে মুগ্ধ হন। সেখানকার সিবিলি ও সাইকিতে এর স্নিগ্ধশোভা আমাদের নজর কাড়ে। বাগানের মালিরা জানিয়েছেন, এ গাছের চারা-কলম করা মোটেও সহজ কাজ নয়। এ কারণে কনকসুধা আমাদের দেশে দুষ্প্রাপ্য। গাছটি (Odontadenia semidigyna) বলধা গার্ডেন ব্যতীত ময়মনসিংহে অবস্থিত বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের বোটানিক্যাল গার্ডেনেও আছে। কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আশরাফুজ্জামান জানিয়েছেন, ২০১০ সালের দিকে গাছটি সেখানে রোপণ করা হয়।

কনকসুধা চিরসবুজ, শক্ত ও কাষ্ঠল লতার গাছ। লতা একটানা ৬ মিটার পর্যন্ত লম্বা হতে পারে। পাতা ডিম্ব-আয়তাকার, পুরুষ্ঠু, মসৃণ, ১০ থেকে ১৬ সেন্টিমিটার লম্বা। ফুল গুচ্ছবদ্ধ, বড়, উজ্জ্বল হলুদ ও মৃদু সুগন্ধিযুক্ত। ফুলের ঘণ্টাকৃতি দলের মুখ প্রায় ৫ সেন্টিমিটার চওড়া, প্রস্ফুটন মৌসুম বেশ দীর্ঘ হলেও বেশি ফোটে গ্রীষ্মে। গুটি কলম ও দাবা কলমে বংশবৃদ্ধি ঘটে। কনকসুধা বর্তমানে পৃথিবীর বিভিন্ন উষ্ণমণ্ডলে ছড়িয়ে পড়েছে। তবে আমাদের দেশে ব্যাপকভাবে চাষের জন্য বিশেষ কোনো যত্নের প্রয়োজন নেই। তাপমাত্রা ১৪ ডিগ্রির নিচে থাকলে এ গাছ সহজে বেঁচে থাকতে পারে না। আমাদের দেশে এ গাছের অভিযোজন চমৎকার।

১৮১৯ সালে অস্ট্রিয়ান উদ্ভিদবিদ জোহান জ্যাকব রোমার ও জোসেফ অগাস্ট শুল্টেস ব্রাজিল থেকে প্রাপ্ত নমুনা বিশ্লেষণ করে এটিকে Echites macrantha হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন। প্রজাতিটির নাম প্রাচীন গ্রিক শব্দ Makros অর্থ ‘long’ এবং ‘Ges anther’ অর্থ ‘flower(ing)’ থেকে উদ্ভূত। জর্জ বেন্থাম ১৮৩৭ সালে গায়ানা থেকে সংগৃহীত নমুনা পরীক্ষা করে ১৮৪১ সালে এটিকে অডনটাডেনিয়া স্পেসিওসা হিসেবে শনাক্ত করেন। আগে নিকারাগুয়া ও কোস্টারিকায় পাওয়া এদের অপেক্ষাকৃত ছোট এবং ভিন্ন আকৃতির ফুলকে পৃথক প্রজাতি হিসেবে বিবেচনা করা হতো। পরে ব্রাজিল থেকে অডনটাডেনিয়া সেলভেসট্রিস নামে যে প্রজাতিটি নথিভুক্ত করা হয়, তা মূলত অডনটাডেনিয়া সেমিডিজিনা। কনকসুধা পুরোনো জ্বর, বাতজ্বর, বাতব্যথা ও চর্মরোগের চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়। পাখির খাবারের উৎস হিসেবেও এ গাছের ব্যবহার রয়েছে।

কনকসুধার পাতা

কনকসুধা মধ্য ও দক্ষিণ আমেরিকা, ওয়েস্ট ইন্ডিজ এবং উত্তরে গুয়াতেমালা থেকে দক্ষিণে ব্রাজিল পর্যন্ত বিস্তৃত। এ গাছ সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৮০০ মিটার উচ্চতা পর্যন্ত স্বাভাবিকভাবে জন্মে। সিঙ্গাপুরের বিভিন্ন উদ্যানে চাষ করা হয়। বাগানে শোভা বৃদ্ধির জন্য এ গাছ রোপণ করা হয়।

  • মোকারম হোসেন, প্রকৃতিপরিবেশবিষয়ক লেখক