সুন্দরবনের বেঙ্গল টাইগার সংরক্ষণে নিয়মিত জরিপ ও নজরদারি চালালেও বিলুপ্তির পথে থাকা এশীয় হাতি তেমন মনোযোগ পায়নি। বন বিভাগ সর্বশেষ হাতির জরিপ করেছে ২০১৬ সালে। এরপর এক দশক পার হলেও নতুন করে কোনো জাতীয় জরিপ হয়নি। এতে গত ১০ বছরে দেশে হাতির সংখ্যা বেড়েছে, নাকি কমেছে—তার নির্ভরযোগ্য তথ্য নেই সরকারি এই সংস্থার কাছে।
আজ ৩ মার্চ বিশ্ব বন্য প্রাণী দিবস। ‘ভেষজ ও সুগন্ধি উদ্ভিদ সংরক্ষণ—স্বাস্থ্য, ঐতিহ্য ও জীবিকার উন্নয়ন’ প্রতিপাদ্য নিয়ে সারা বিশ্বে দিবসটি পালন করা হচ্ছে। এমন সময়ে হাতি সংরক্ষণের এই শৈথিল্য নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
২০১৬ সালের জরিপ অনুযায়ী, দেশে বন্য আবাসিক হাতির সংখ্যা ছিল ২৬৮। আন্তসীমান্তীয় হাতি ছিল ৯৩টি এবং বন্দী বা ক্যাপ্টিভ হাতি ছিল ৯৬টি।
বিভাগভিত্তিক হিসাবে চট্টগ্রাম দক্ষিণ বন বিভাগে ৬৫টি, কক্সবাজার দক্ষিণে ৬৩টি এবং কক্সবাজার উত্তরে ৫৪টি হাতির সন্ধান পাওয়া যায়। এ ছাড়া লামা বন বিভাগে ৩০টি, বান্দরবানে ১১টি, পার্বত্য চট্টগ্রাম দক্ষিণে ২৮টি ও উত্তরে ১৭টি হাতির সন্ধান পেয়েছিল এই জরিপকারী দল।
মোট ২৬৮টি হাতির মধ্যে ২৫ শতাংশ ছিল পুরুষ (৬৫টি), ৬৪ শতাংশ নারী (১৭২টি) এবং বাচ্চা হাতি ছিল ২৯টি।
বন বিভাগের তথ্য বলছে, ২০১৬ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত মারা গেছে ১৪৬টি হাতি। এর মধ্যে ২৬টি হাতির মৃত্যু হয়েছে বৈদ্যুতিক ফাঁদে।
এই জরিপের আগে হাতি নিয়ে জরিপ হয়েছে এক যুগ আগে, ২০০৪ সালে। ওই জরিপে দেশে হাতির সংখ্যা ছিল ২২৭। ২০১৫ সালে আন্তর্জাতিক প্রকৃতি সংরক্ষণের জোট আইইউসিএন হাতিকে মহাবিপন্ন হিসেবে তালিকাভুক্ত করে। এর অর্থ হলো বাংলাদেশে হাতি বিলুপ্তির উচ্চঝুঁকিতে আছে।
কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নে ঘাটতি
জরিপের পর বন বিভাগ ২০১৮–২৭ মেয়াদে হাতি সংরক্ষণে একটি কর্মপরিকল্পনা নেয়। এতে হাতির আবাসস্থল দখলমুক্ত রাখা ও দখল হওয়া বনভূমি উদ্ধার করার রূপরেখা ছিল। তবে পরিকল্পনার পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন হয়নি।
বনের অবৈধ দখলদাররা বৈদ্যুতিক তারের ফাঁদ পেতে হাতি হত্যা করছে। বন দখল হয়ে যাওয়া মানেই হাতির আবাসস্থল সংকুচিত হওয়া।আহমদ কামরুজ্জামান মজুমদার, আহ্বায়ক, বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ জোট
বন বিভাগের তথ্য বলছে, ২০১৬ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত মারা গেছে ১৪৬টি হাতি। এর মধ্যে ২৬টি হাতির মৃত্যু হয়েছে বৈদ্যুতিক ফাঁদে। শেরপুর, জামালপুর, কক্সবাজার ও চট্টগ্রামে সংরক্ষিত বনের ভেতর হাতির চলাচলের পথে গড়ে ওঠা চা–বাগান, ফলের বাগান ও ধানখেতে এসব ফাঁদ পাতা হয়। খাবারের সন্ধানে লোকালয়ে এলে হাতি এসব ফাঁদে পড়ে মারা যায়।
২০২১ সালের ডিসেম্বর ও ২০২২ সালের জানুয়ারিতে প্রায় ২১টি হাতির মৃত্যু হয়। ঘটনাস্থল (চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার) পরিদর্শন করে পরিবেশ নিয়ে কাজ করা ৩৩টি সংগঠনের জোট বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ জোট।
২০১৬ সালের জরিপ অনুযায়ী, দেশে বন্য আবাসিক হাতির সংখ্যা ছিল ২৬৮। আন্তসীমান্তীয় হাতি ছিল ৯৩টি এবং বন্দী বা ক্যাপ্টিভ হাতি ছিল ৯৬টি। এই জরিপের আগে হাতি নিয়ে জরিপ হয়েছে এক যুগ আগে—২০০৪ সালে। ওই জরিপে দেশে হাতির সংখ্যা ছিল ২২৭।
জোটের আহ্বায়ক স্ট্যামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক আহমদ কামরুজ্জামান মজুমদার বলেন, বনের অবৈধ দখলদাররা বৈদ্যুতিক তারের ফাঁদ পেতে হাতি হত্যা করছে। বন দখল হয়ে যাওয়া মানেই হাতির আবাসস্থল সংকুচিত হওয়া।
কামরুজ্জামান মজুমদার আরও বলেন, দীর্ঘদিন হাতির জরিপ হয়নি। হাতির জরিপ করে বনগুলোতে কয়টি হাতি টিকে আছে তার সঠিক সংখ্যা নির্ণয় করা জরুরি।
করিডর দখল, সংকুচিত আবাস
কক্সবাজার ও চট্টগ্রামজুড়ে হাতির চলাচলের পথ এলিফ্যান্ট করিডর নামে পরিচিত। এই করিডর দখল করে নির্মাণ হয়েছে রেললাইনসহ নানা স্থাপনা। শেরপুর ও জামালপুরে হাতির আবাসস্থলে গড়ে উঠেছে মানববসতি।
বর্ষায় বন ঘন সবুজ হয়ে ওঠে। এ সময় বনজ উদ্ভিদে হাতির খাদ্যপ্রাচুর্য থাকলেও শুষ্ক মৌসুমে দেখা দেয় খাদ্যসংকট। খাবারের সন্ধানে তখন হাতি লোকালয়ে চলে আসে। বনের জমি দখল করে ধানখেত, ফসলি জমি ও ফলের বাগানে হাতির প্রবেশ ঠেকাতে পাতা হয় বিদ্যুতের ফাঁদ—যার বলি হয় বিপন্ন এ প্রাণীটি।
হাতি সংরক্ষণকে বন বিভাগ গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে। আগে হাতি সংরক্ষণে বিচ্ছিন্নভাবে কিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। তবে গত বছরের শেষে একনেক হাতি সংরক্ষণে ৪৮ কোটি টাকার একটি প্রকল্প অনুমোদন দিয়েছে। প্রকল্পে হাতির জরিপের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত আছে।রকিবুল হাসান, উপপ্রধান বন সংরক্ষক, বন অধিদপ্তর
চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার অঞ্চলে, যেখানে হাতির সংখ্যা বেশি, সেখানে প্রায় ৫১ হাজার একর বনভূমি দখল হয়েছে। ২০১৭ সালে মিয়ানমার থেকে বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গারা উখিয়া ও টেকনাফের সংরক্ষিত বনে আশ্রয় নেওয়ার পর আরও প্রায় ১০ হাজার একর বনভূমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। যেগুলোর বড় অংশ ছিল হাতির গুরুত্বপূর্ণ আবাসস্থল।
নতুন প্রকল্পে আশার ইঙ্গিত
বন অধিদপ্তরের উপপ্রধান বন সংরক্ষক রকিবুল হাসান প্রথম আলোকে বলেন, হাতি সংরক্ষণকে বন বিভাগ গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে। আগে হাতি সংরক্ষণে বিচ্ছিন্নভাবে কিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। তবে গত বছরের শেষে একনেক (জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি) হাতি সংরক্ষণে ৪৮ কোটি টাকার একটি প্রকল্প অনুমোদন দিয়েছে। প্রকল্পে হাতির জরিপের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত আছে।
হাতি সংরক্ষণে এর সংখ্যা নির্ধারণ, মানুষ–হাতি সংঘাতপ্রবণ এলাকা চিহ্নিত করা এবং ঝুঁকি কমাতে গবেষণা ও নিয়মিত মনিটরিং জরুরি।এম এ আজিজ, অধ্যাপক, প্রাণিবিদ্যা বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক এবং আইইউসিএনের এলিফ্যান্ট স্পেশালিস্ট গ্রুপের সদস্য এম এ আজিজ প্রথম আলোকে বলেন, অন্যান্য বন্য প্রাণীর তুলনায় হাতির প্রতি আরও বেশি মনোযোগ ও নজরদারি প্রয়োজন ছিল, কিন্তু তা হয়নি।
এম এ আজিজ বলেন, হাতি সংরক্ষণে এর সংখ্যা নির্ধারণ, মানুষ–হাতি সংঘাতপ্রবণ এলাকা চিহ্নিত করা এবং ঝুঁকি কমাতে গবেষণা ও নিয়মিত মনিটরিং জরুরি। এখন বন বিভাগ এসব বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেবে বলে প্রত্যাশা করেন তিনি।