অনুকূল পরিবেশ পেয়ে রংপুর অঞ্চলকে বসবাসের জন্য বেছে নিয়েছে খয়রা কাস্তেচরা। সম্প্রতি লালমনিরহাটের কালীগঞ্জ উপজেলা থেকে তোলা
অনুকূল পরিবেশ পেয়ে রংপুর অঞ্চলকে বসবাসের জন্য বেছে নিয়েছে খয়রা কাস্তেচরা। সম্প্রতি লালমনিরহাটের কালীগঞ্জ উপজেলা থেকে তোলা

রংপুরে খয়রা কাস্তেচরার আবাস

বাংলাদেশে যে কয়েক প্রজাতির কাস্তেচরা দেখা যায়, তার মধ্যে একটি খয়রা কাস্তেচরা। আমাদের দেশে এ পাখি প্রধানত শীতকালে দেখা যায়। বিলে, নদীর পাড়ে, ভেজা ফসলের মাঠে এগুলো বিচরণ করে খাবার সংগ্রহের জন্য। বাংলাদেশে কয়েক বছর ধরে এদের আবাস লক্ষ করা যাচ্ছে।

২০২৩ সালে প্রথম খবর পেয়েছিলাম খয়রা কাস্তেচরা পাখি জয়পুরহাটে দলবদ্ধভাবে আবাস গড়ে তুলেছে। প্রজননকাল শেষ হলে বাসা ছেড়ে চলে যায় পাখিরা। ২০২৪ সালের জুলাই থেকে খবর নিচ্ছিলাম পাখিটি এসেছে কি না। একদিন খবর পেলাম বগুড়ায় একটি মাঠে দু–এক দিন দেখা গেছে। এরই মধ্যে বাংলাদেশের পাখির কলোনিবিষয়ক গবেষক শিবলি সাদিকের কাছে খবর পাই—জয়পুরহাটে আসতে শুরু করেছে খয়রা কাস্তেচরা।

রংপুর থেকে আমরা তিনজন—প্রকৌশলী ফজলুল হক, লেখক রানা মাসুদ এবং আমি—জয়পুরহাটে গিয়েছিলাম বিরল কাস্তেচরা পাখি দেখতে। জয়পুরহাটে পাখি আলোকচিত্রী আছেন আহনাফ আল সাদমান। তরুণ আহনাফ আমাদের পাখির কলোনিতে নিয়ে যান। কলোনির পাশে একটি মাঠে দেখলাম ঝাঁক বেঁধে খয়রা কাস্তেচরা খাবার সংগ্রহ করছে। শহরের উপকণ্ঠে একটি আবাসিক এলাকা। বাড়িগুলো টিনের চালের। পাশেই একটি ডোবা। তার পাশেই বাঁশঝাড়। পাখিগুলো সেখানেই আশ্রয় নিয়েছে। কয়েকটি বাচ্চাও দেখলাম আমরা। সেই প্রথমবার আমি এ পাখি দেখার সুযোগ পেলাম।

গত বছর (২০২৫) পাখিপ্রেমী রাসেল আহমেদের কাছে খবর পেলাম খয়রা কাস্তেচরা লালমনিরহাটে দেখা গেছে। খবর পেয়ে খুঁজতে গিয়েছিলাম। সেদিন গিয়ে কয়েকটি দেখতে পাই। ওই একদিনই সেবার দেখা সম্ভব হয়েছে।

এ বছরও আমরা কয়েকজন মিলে পাখিটি দেখতে গিয়েছিলাম। এ বছর কয়েকটি খয়রা কাস্তেচরা দেখার সুযোগ হয়। গত এপ্রিল মাসের শেষের দিকে জানতে পারলাম রংপুরের মীরবাগ এলাকায় খয়রা কাস্তেচরা ঝাঁক বেঁধে এসেছে। যেহেতু এপ্রিল মাসে অনেক কাস্তেচরা এসেছে, তাই মনে হলো এর কলোনি পাওয়া সম্ভব।

মীরবাগে গিয়ে দেখলাম অনেক খয়রা কাস্তেচরা। এদের গতিবিধি লক্ষ করছিলাম। দেখলাম দূরে একটি বাঁশঝাড়ের দিকে পাখিগুলো যাচ্ছে। আবার অনেক পাখি ওই বাঁশঝাড় থেকে আসছে। তাদের গতিপথ অনুসরণ করে আমরা বাঁশঝাড়টির দিকে এগোলাম। সেখানে গিয়ে দেখতে পেলাম খয়রা কাস্তেচরার অনেকগুলো বাসা। বাড়ির উঠানে, ঘর ঘেঁষে, ঘরের পেছনে গাছে গাছে অনেক কাস্তেচরা বাসা বেঁধেছে।

রংপুরে কাস্তেচরার বাসা দেখতে পাওয়া আনন্দের। খয়রা কাস্তেচরার কলোনির কাছেই একজনের কাছে শুনতে পেলাম, পাখিশিকারি এসেছিল। শিকারিকে স্থানীয় ব্যক্তিরা বাধা দেন। আমরাও আমাদের ফোন নম্বর দিয়ে এসেছি, যদি কেউ ওই পাখি শিকার করেন, তাহলে যেন আমাদের খবর দেন। আর যাঁরা পাখি শিকার করতে আসবেন, তাঁদের ছবিও তুলে রাখতে হবে। পরে খবর নিয়ে জেনেছি কেউ আর পাখি শিকার করতে আসেননি।

যে পাখি এ দেশে তেমন দেখাই যায় না, সেই পাখি দল বেঁধে বাসা তৈরি করেছে, এটা বড় ঘটনা। পাখির কলোনিবিষয়ক গবেষক শিবলি সাদিক বললেন, ‘২০১১ সালে টাঙ্গুয়ার হাওরে প্রথমবারের মতো তিনটি খয়রা কাস্তেচরা দেখা গিয়েছিল। বাংলাদেশে এ পাখি ভালো খাবার পাচ্ছে এবং আগে যে দেশে থাকত, সেখানে কোনো না কোনো অসুবিধা থাকার কারণে বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকায় আসছে।’

খয়রা কাস্তেচরা দেখতে বেশ সুন্দর। চঞ্চু দেখতে অন্যান্য কাস্তেচরার মতোই লম্বা ও বাঁকানো। চঞ্চুর রং ধূসর, চোখের ওপরে-নিচে চঞ্চুর গোড়ায় সামান্য সাদা। মাথা থেকে গলা ও পিঠের দিকে বেশ খানিকটা জায়গাজুড়ে গাঢ় খয়েরি। পাখার অংশে কিছুটা সবুজ রঙের মিশ্রণ আছে। রোদ পড়লে চকচক রং রোদে মিশে উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। তখনই প্রকৃত রূপ ধরা দেয়। এই চকচকে হয়ে ওঠার কারণে এর নাম ইংরেজিতে গ্লোসি যুক্ত হয়েছে।

খয়রা কাস্তেচরার ইংরেজি নাম Glossy Ibis, বৈজ্ঞানিক নাম Plegadis falcinellus.

দেশে জলাভূমি, বন ও ঝোপঝাড় দ্রুত কমে যাওয়ায় অনেক পাখিই নিরাপদ আবাস হারাচ্ছে। খয়রা কাস্তেচরা দেশের বিভিন্ন স্থানে দেখা গেলেও তাদের প্রজনন কলোনি এখনো অত্যন্ত বিরল। তাই যেখানে তারা বাসা বেঁধেছে, সেই স্থানগুলোকে নিরাপদ রাখা জরুরি। স্থানীয় মানুষের সচেতনতা, শিকার প্রতিরোধ এবং আবাসস্থল সংরক্ষণ নিশ্চিত করা গেলে এই সুন্দর অতিথি পাখি ভবিষ্যতেও বাংলাদেশে প্রজনন চালিয়ে যেতে পারবে।

  • তুহিন ওয়াদুদ, অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর