
আড়িয়ল বিলের পাঁচ ধরনের দেশি মাছে পাওয়া গেছে মাইক্রোপ্লাস্টিক বা প্লাস্টিকের ক্ষুদ্র কণা। মাছগুলো হলো, কই, বাটা, মেনি, গুলশা টেংরা ও পুঁটি। এসব মাছের মাংসপেশি ও অন্ত্রে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি শনাক্ত করেছেন গবেষকেরা। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে কই মাছে।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারিজ ম্যানেজমেন্ট বিভাগের এক গবেষণায় এ তথ্য উঠে এসেছে। গবেষকেরা বলছেন, কই মাছ সর্বভুক স্বভাবের হওয়ায় তলানি ও প্লাঙ্কটনের সঙ্গে মিশে থাকা প্লাস্টিক কণাও সহজে গ্রহণ করে। ফলে অন্য মাছের তুলনায় এ মাছের শরীরে মাইক্রোপ্লাস্টিক বেশি দেখা গেছে।
আড়িয়ল বিল পদ্মা নদীর মাঝখানে ছিটমহলসম জলাভূমি অঞ্চল। দেশের মধ্যাঞ্চলের সর্ববৃহৎ ও প্রাচীন এই প্লাবনভূমির অবস্থান ঢাকা ও মুন্সিগঞ্জ জেলায়। বিলের দৈর্ঘ্য ২৬ মাইল এবং প্রস্থ ১০ মাইল। অর্থাৎ মোট আয়তন ২৬০ বর্গমাইল বা ১ লাখ ৬৬ হাজার ৬০০ একর। এ বিলের মাছ নিয়মিত ঢাকাসহ আশপাশের বাজারে বিক্রি হয়।
২০২৪ সালের বর্ষায়, ২০২৪-২৫ সালের শীতে এবং ২০২৫ সালের শুষ্ক মৌসুমে বিলের পাঁচটি স্থান থেকে পানি ও তলানির নমুনা সংগ্রহ করা হয়। একই সময়ে ৫ প্রজাতির মোট ১৫০টি মাছ সংগ্রহ করে সেগুলোর অন্ত্র, ফুলকা ও মাংসপেশি আলাদাভাবে পরীক্ষা করে গবেষণার ফলাফল তুলে ধরা হয়েছে। গত জুলাই মাসে আন্তর্জাতিক গবেষণা সাময়িকী জার্নাল অব হ্যাজার্ডাস ম্যাটেরিয়ালস অ্যাডভান্সেসে গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে।
মাইক্রোপ্লাস্টিক এখন সবখানেই। তবে বিলের মাছের অন্ত্র ও মাংসপেশিতে এটা পাওয়া যাওয়া উদ্বেগজনক। যদিও এসব মাছ খেয়ে সরাসরি ক্ষতির আশঙ্কা কম। তবে দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি থাকতে পারে।মো. শাহজাহান, অধ্যাপক, ফিশারিজ ম্যানেজমেন্ট বিভাগ, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়
মাছে মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়ার ঘটনা অবশ্য বাংলাদেশে নতুন নয়। এর আগে বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, পুরাতন ব্রহ্মপুত্র, ঢাকার কয়েকটি হ্রদ, সুন্দরবনের উপকূলীয় এলাকা এবং বঙ্গোপসাগরের মাছ ও চিংড়িতে মাইক্রোপ্লাস্টিক শনাক্ত হয়েছে। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের একই গবেষক দল এর আগে চলনবিল ও হাওর অঞ্চলের মাছ নিয়েও গবেষণা করেছে। সেখানে তলদেশে থাকা মাছে তুলনামূলক বেশি মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে।
গবেষণা দলের প্রধান ও বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারিজ ম্যানেজমেন্ট বিভাগের অধ্যাপক মো. শাহজাহান প্রথম আলোকে বলেন, মাইক্রোপ্লাস্টিক এখন সবখানেই। তবে বিলের মাছের অন্ত্র ও মাংসপেশিতে এটা পাওয়া যাওয়া উদ্বেগজনক। যদিও এসব মাছ খেয়ে সরাসরি ক্ষতির আশঙ্কা কম। তবে দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি থাকতে পারে। তিনি বলেন, শরীরে জমতে থাকা এ ধরনের উপাদান হয়তো ৫-১০ বছরে বোঝা যাবে না। কিন্তু ২৫-৩০ বছর পর, এমনকি পরবর্তী প্রজন্মের মধ্যেও এর প্রভাব যেতে পারে।
বেশি মাইক্রোপ্লাস্টিক কই মাছে
গবেষণায় কই মাছে সবচেয়ে বেশি মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে। শুধু অন্ত্র বা ফুলকায় নয়, মানুষের খাওয়ার উপযোগী মাংসপেশিতে অন্য মাছের তুলনায় কই মাছে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি বেশি। বর্ষা, শীত ও শুষ্ক—তিন মৌসুমেই প্রতিটি কই মাছের মাংসে গড়ে একটি করে মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা পাওয়া গেছে। অন্য ৪ প্রজাতির ক্ষেত্রে এ সংখ্যা ছিল গড়ে শূন্য দশমিক ৫০ থেকে শূন্য দশমিক ৯০টির মধ্যে। কই মাছের অন্ত্রে গড়ে ১ দশমিক ৭০ থেকে ১ দশমিক ৯০ এবং ফুলকায় ১ দশমিক ৩০ থেকে ১ দশমিক ৪০টি কণা পাওয়া গেছে। গবেষকেরা বলছেন, মাছের অন্ত্র বা ফুলকায় মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়ার ঘটনা আগেও জানা গেছে। তবে মানুষের খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত মাংসপেশিতেও মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়ার বিষয়টি জনস্বাস্থ্যের দৃষ্টিকোণ থেকে নতুন গুরুত্ব পাচ্ছে।
আন্তর্জাতিক প্রচলিত সংজ্ঞা অনুযায়ী, ৫ মিলিমিটারের চেয়ে ছোট প্লাস্টিক কণাকে মাইক্রোপ্লাস্টিক বলা হয়। এসব কণা আরও ক্ষুদ্র হয়ে ১ মাইক্রোমিটারের (এক হাজার ন্যানোমিটার) নিচে নেমে গেলে তাকে ন্যানোপ্লাস্টিক বলা হয়। কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ওই গবেষণায় ন্যানোপ্লাস্টিকের পরিমাপ করা সম্ভব হয়নি। তবে তা থাকার আশঙ্কা গবেষকেরা উড়িয়ে দিচ্ছেন না।
আরও চার প্রজাতির মাছে মাইক্রোপ্লাস্টিক
কই মাছের পর মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি বেশি পাওয়া গেছে বাটা মাছে। তৃণভোজী এই মাছের অন্ত্রে বর্ষা মৌসুমে গড়ে সর্বোচ্চ ১ দশমিক ৫০টি মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে। আর মাংসপেশিতে তিন ঋতুতেই প্রায় একই মাত্রায় (শূন্য দশমিক ৮০ থেকে শূন্য দশমিক ৯০টি) প্লাস্টিক কণা পাওয়া গেছে।
শরীরে জমতে থাকা এ ধরনের উপাদান হয়তো ৫-১০ বছরে বোঝা যাবে না। কিন্তু ২৫-৩০ বছর পর, এমনকি পরবর্তী প্রজন্মের মধ্যেও এর প্রভাব যেতে পারে।মো. শাহজাহান, অধ্যাপক, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়
নান্দিনা বা মেনি মাছের অন্ত্রে শীত ও শুষ্ক মৌসুমে তুলনামূলক বেশি প্লাস্টিক কণা পাওয়া গেছে। তবে মাংসপেশিতে এর মাত্রা ছিল শূন্য দশমিক ৬০ থেকে শূন্য দশমিক ৭০টির মধ্যে। একই ধরনের চিত্র দেখা গেছে গুলশা টেংরাতেও। এ মাছের অন্ত্রে শীত মৌসুমে সর্বোচ্চ ১ দশমিক ৩০টি কণা পাওয়া গেছে আর মাংসপেশিতে পাওয়া গেছে শূন্য দশমিক ৫০ থেকে শূন্য দশমিক ৮০টি প্লাস্টিক কণা।
অন্যদিকে ছোট আকারের সর্বভুক পুঁটি মাছে সবচেয়ে কম মাইক্রোপ্লাস্টিক শনাক্ত হয়েছে। এর মাংসপেশিতে মাত্র শূন্য দশমিক ৫০ থেকে শূন্য দশমিক ৫১টি কণা পাওয়া গেছে।
বিলের পানি ও তলানিতে দূষণ
গবেষণায় আড়িয়ল বিলের প্রতি লিটার পানিতে ১১ থেকে প্রায় ৩২টি এবং প্রতি কেজি তলানিতে ১২ থেকে ১২৭টির বেশি মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে।
বর্ষাকালে পানিতে দূষণের মাত্রা সবচেয়ে বেশি ছিল। গবেষকদের মতে, বৃষ্টির পানির সঙ্গে আশপাশের প্লাস্টিকবর্জ্য বিলে এসে পড়ায় এ সময় দূষণ বাড়ে। অন্যদিকে শুষ্ক মৌসুমে পানির প্রবাহ কমে যাওয়ায় কণাগুলো তলদেশে জমা হয় এবং তলানির দূষণ বেড়ে যায়।
সবচেয়ে বেশি পাওয়া গেছে সুতার মতো আকৃতির কণা। এসব কণা মূলত কাপড় ধোয়ার সময় বের হওয়া কৃত্রিম তন্তু, গৃহস্থালির বর্জ্যপানি এবং মাছ ধরার জাল থেকে আসে। রাসায়নিক বিশ্লেষণে সবচেয়ে বেশি শনাক্ত হয়েছে পলিইথিলিন, পলিপ্রোপাইলিন ও পলিস্টাইরিন, যেগুলো প্লাস্টিক ব্যাগ, মোড়ক ও অন্যান্য দৈনন্দিন পণ্যে বহুল ব্যবহৃত হয়।
তবে গবেষকদের ভাষ্য, আড়িয়ল বিল এবং এই বিলের কই, বাটা, পুঁটি, গুলশা টেংরা ও নান্দিনা মাছ নিয়ে এটিই প্রথম বৈজ্ঞানিক গবেষণা।
দরকার প্লাস্টিক বর্জ্যের সঠিক ব্যবস্থাপনা
এমন এক সময়ে এ গবেষণার ফলাফল সামলে এল, যখন দেশে মাইক্রোপ্লাস্টিক নিয়ে উদ্বেগ দ্রুত বাড়ছে। সম্প্রতি বেসরকারি একটি সংস্থার এক গবেষণায় বাজারে বিক্রি হওয়া ৩৪টি টুথপেস্টের মধ্যে ২৬টিতে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি পাওয়ার দাবি করা হয়। এর মধ্যে শিশুদের জন্য তৈরি ছয়টি টুথপেস্টের চারটিতেও প্লাস্টিক কণা শনাক্ত হয়েছে। আরও কয়েকটি গবেষণায় দুধ, চিনি ও সয়াবিন তেলের মতো নিত্য ব্যবহৃত খাদ্যপণ্যেও মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। এ নিয়ে ভোক্তাদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসন (এফডিএ) বলছে, মানুষের প্রস্রাব, মল, রক্ত এমনকি বিভিন্ন অঙ্গেও ইতিমধ্যে মাইক্রোপ্লাস্টিক ও ন্যানোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে। তবে স্বাস্থ্যের এর প্রভাব সম্পর্কে এখনো পর্যাপ্ত তথ্য নেই। এ কারণে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের দুটি সংস্থা-‘এজেন্সি ফর টক্সিক সাবস্ট্যান্সেস অ্যান্ড ডিজিজ রেজিস্ট্রি’ এবং ‘সিডিসির ন্যাশনাল সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্টাল হেলথ’ যৌথভাবে একটি বিশেষজ্ঞ দল গঠন করে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে গবেষণা চালাচ্ছে।
তবে এফডিএর সামগ্রিক অবস্থান হলো, কিছু গবেষণা মানবস্বাস্থ্যে প্রভাবের ইঙ্গিত দিলেও, খাদ্যে পাওয়া মাইক্রোপ্লাস্টিকের বর্তমান মাত্রা স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ-এ সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো সামগ্রিক বৈজ্ঞানিক প্রমাণ এখনো নেই। এ কারণে আগেভাগেই উৎস পর্যায়ে প্লাস্টিক দূষণ নিয়ন্ত্রণ ও খাদ্য সংরক্ষণে নিরাপদ ব্যবস্থাপনার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক গাউসিয়া ওয়াহিদুন্নেসা চৌধুরী বিভিন্ন প্রতিবেশে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি, ব্যবহার, ঝুঁকি ও টেকসই সমাধান নিয়ে কাজ করেছেন। তাঁর মতে, অপরিকল্পিত ব্যবহার, অসচেতনভাবে প্লাস্টিক ফেলে দেওয়া এবং দুর্বল বর্জ্যব্যবস্থাপনা দূষণের প্রধান কারণ।
অধ্যাপক গাউসিয়া ওয়াহিদুন্নেসা চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, এই দূষণ কমাতে একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের ব্যবহার কমানো, গরম খাবার প্লাস্টিকের পাত্রে না রাখা, প্লাস্টিকের পাত্র মাইক্রোওভেনে ব্যবহার না করা এবং কাচ, স্টিল বা সিরামিকের পাত্র ব্যবহারের অভ্যাস বাড়ানো দরকার। একই সঙ্গে প্লাস্টিক বর্জ্যের সঠিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে।