
রংপুরে বহুবর্ষী মাধবীলতা দেখলাম। এ গাছের বয়স কত হতে পারে, তা নির্দিষ্ট করে বলা কঠিন। স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলে যেটুকু বুঝলাম, তাতে এ গাছের বয়স শত বছর পেরিয়ে গেছে।
আমরা বর্তমানে যে রংপুর শহর দেখি, তার গোড়াপত্তন হয়েছিল মাহিগঞ্জে। মাহিগঞ্জে একটি স্থানকে বলা হয় বড় রংপুর। এই বড় রংপুরে একটি পুরোনো পুকুর আছে। পুকুরের বয়স ২০০ বছরের কম নয়। পুকুরটির চারদিকে চারটি ঘাট বাঁধা ছিল। পূর্ব দিকে মন্দির ছিল। মন্দিরের পাশে গোসলের পর পোশাক পরিবর্তনের একটি ঘর ছিল। প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন হিসেবে পুরোনো আমলের ইটের ভাঙা দেয়াল টিকে আছে। তাজহাট জমিদারের স্ত্রী এই পুকুরে স্নান করতেন। ৩০-৪০ বছর আগে মন্দির ভেঙে পড়েছে। মন্দির ভেঙে পড়ার আগে অনেকে অবকাঠামো দেখেছেন।
পুকুরটির পশ্চিম পাড়ে জঙ্গল ছিল, সেখানেই বট-পাকুড় জড়াজড়ি করে আছে। এদের বয়স সম্পর্কে ধারণা নেই স্থানীয় লোকজনের। পাকুড়ের শিকড় গাছে ঝুলে আছে মোটা হয়ে। এ গাছের শিকড় এমনভাবে গাছ থেকে নেমে মাটির গভীরে গেছে এবং এতটাই মোটা হয়েছে দেখলে মনে হয় শিকড়গুলোই গাছ। গাছ থেকে লতানো শিকড়গুলো বড় গাছের মতো মোটা হয়ে ওঠা দেখেও ধারণা করা যায়, এগুলো অনেক পুরোনো গাছ। এই গাছ দুটি বেয়ে উঠে গেছে মাধবীলতা। লতার প্রস্থ সুপারিগাছের মতো হবে। অনেক পুরোনো গাছের ভেতরে যেমন গর্তের মতো হয় এই লতারও ভেতরে গর্তের মতো হয়েছে। লতা উঠে গেছে গাছের চূড়ায়। সেখানেই ফুটেছিল মাধবীলতা।
এই গাছ দেখালেন হাসান ফেরদৌস রাসেল। তিনি সাংবাদিকতা করেন। নিরাপদ সড়ক আন্দোলনসহ নানা রকম সামাজিক কাজে যুক্ত। প্রকৃতির প্রতি তাঁর অকৃত্রিম টান, বিশেষত গাছ, লতাপাতা, পাখির প্রতি। বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে আমি একটি মাধবীলতার গাছ রোপণ করেছি। সেখানে ফুলও আসে।
রংপুরে আর কোথায় কোথায় মাধবীলতা আছে, এসব নিয়ে গত বছর মার্চে একদিন কথা হচ্ছিল। তখন হাসান ফেরদৌস বলেন, এ রকম একটি গাছ তিনি চেনেন। নাম জানেন না। সেটা মাধবীলতা হওয়ার কথা। পরে একদিন তিনি আমাকে নিশ্চিত করেন, সেটি মাধবীলতা।
ফেব্রুয়ারি মাস মাধবীলতা ফোটার মৌসুম। হাসান ফেরদৌসের সঙ্গে গেলাম মাহিগঞ্জে সেই মাধবীলতা দেখার জন্য। মাধবীলতা দেখার আগেই কয়েকটি পলাশগাছে চোখ আটকে গেল। প্রচুর পলাশ ফুটেছে। পরে জানতে পারি আরও অনেক পলাশগাছ ছিল। এখন কমেছে। পলাশ ফুলের পাশেই বসে ছিল মেঘ হও মাছরাঙা পাখি। ফুল-পাখি একসঙ্গে দেখতে দারুণ লাগছিল। আরেক দিন ওই স্থানে ধলাবুক মাছরাঙাও দেখেছি। এ পুকুরের ধারেই আছে বরুণ ফুল। বসন্তের শেষে প্রচুর ফোটে।
পুকুরের পশ্চিমে মাধবীলতার পাশে দেখা হলো পঞ্চাশোর্ধ্ব সুভাষ রায়ের সঙ্গে। তিনি জানালেন, ছোটবেলা থেকে এ রকমই দেখেছেন। প্রায় ৫০ বছর আগে বিয়ে হয়ে আসা এক ভদ্রমহিলা জানান, এ গাছ তিনি বিয়ে হয়ে আসার পর থেকে দেখে এসেছেন। তবে এই গাছ যে এত দুর্লভ, তা তিনি জানতেন না। পাশেই বাসা অবসরপ্রাপ্ত এক কলেজশিক্ষকের। তিনি পুকুর-ঘাট-মন্দিরের ইতিহাস জানালেন। তিনিও মাধবীলতার বয়স সম্পর্কে যা বললেন, তাতেও বোঝা যায়, এর বয়স শতবর্ষের কম নয়। মাধবীলতার ফুল কিছু ঝরে পড়েছিল। হাতে নিয়ে দেখলাম মিষ্টি গন্ধ। স্থানীয় লোকজন বললেন, রাতে এর গন্ধ চারদিকে ছড়িয়ে যায়।
রাসেল ভাই পাশেই কসপিয়া নামে আরেকটি ফুল দেখালেন। কসপিয়াও বেশ দুর্লভ। রংপুরে একটি সরকারি অফিসে চোখে পড়েছে। রংপুরে আর কোথাও এ ফুল দেখা হয়নি।
আমাদের কাছে জেনে পরে অনেকেই শতবর্ষী মাধবীলতা দেখতে গিয়েছিলেন। এ রকম পুরোনো একটি মাধবীলতা দেখতে পাওয়া সত্যি আনন্দের। শতবর্ষী গাছই আমাদের কমে যাচ্ছে। এই বাস্তবতায় শতবর্ষী মাধবীলতা টিকে আছে, সেটি বিস্ময়ের! জানি না দেশে আর কোথাও শতবর্ষী মাধবীলতা আছে কি না।