
বাংলাদেশে এ পর্যন্ত ৭২২টি প্রজাতির পাখির উপস্থিতি নথিভুক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে কমবেশি ৩৪০টি প্রজাতি আবাসিক। এরা সারা বছর দেশের ভৌগোলিক সীমানায় থাকে এবং বংশবৃদ্ধি করে। বাকি প্রায় ৩৭০ প্রজাতি পরিযায়ী। তার মানে বছরের একটি নির্দিষ্ট সময় ওরা এ দেশে আসে, বাস করে এবং সময়মতো আগের আবাসে ফিরে যায়। এরা পরিযায়ী পাখি নামে পরিচিত।
অল্প কিছু প্রজাতি বাদে বেশির ভাগ পরিযায়ী পাখি আসে শীতকালে। মূল আবাসস্থলের খাদ্যাভাব আর কনকনে শীতের কবল থেকে বাঁচার জন্য এসব পাখি বাংলাদেশসহ আফ্রিকা, অস্ট্রেলিয়া ও এশিয়ার নানা দেশে পরিযায়ী হয়। পরিযায়ন ওদের জীবনচক্রের অবিচ্ছেদ্য অংশ। শীতের আবাসে এসে সচরাচর ওরা বংশবিস্তার করে না। তবে ব্যতিক্রম আছে। যেমন কুড়া ইগল।
বেশ কিছু পরিযায়ী পাখির উপস্থিতি এ দেশে অনিয়মিত। ওরা অন্যদের মতো প্রতিবছর আসে না, ৫–১০ বছর পরপর আসে। এ কারণে ওরা যাযাবর বা ভবঘুরে পরিযায়ী পাখি হিসেবে পরিচিত। ওদের সংখ্যা এ দেশের মোট পরিযায়ী পাখির প্রায় এক-তৃতীয়াংশ।
কোনো কোনো পাখি আবার অন্য কোনো দেশে পরিযায়নের পথে অল্প কদিনের জন্য এ দেশে বিশ্রাম নেয়। যেমন বাদামি চটক, বন–খঞ্জন, লাল-পা তুরমতি ইত্যাদি। ওরা পন্থ-পরিযায়ী পাখি নামে পরিচিত। মূলত সেপ্টেম্বর থেকে অক্টোবরে অন্য কোনো দেশে পরিযায়নের পথে আবার ফেব্রুয়ারি থেকে মার্চে পুরোনো আবাসে ফিরে যাওয়ার পথে এ দেশে ওরা যাত্রাবিরতি করে।
পরিযায়ী পাখি বলতে মূলত শীতের পাখিগুলোকেই বোঝায়। তবে কিছু পাখি গ্রীষ্মকালেও পরিযায়ী হয়। যেমন বিভিন্ন প্রজাতির কোকিল, সুমচা, সুইচোরা, মাছরাঙা ইত্যাদি। ওরা গ্রীষ্মের প্রজনন–পরিযায়ী বা সামার ব্রিডিং মাইগ্রেন্ট নামে পরিচিত।
এই গরমের আবহাওয়ায় আজ কয়েকটি গ্রীষ্মের পরিযায়ী পাখির গল্প হওয়াই সংগত।
পান্না বা সবুজাভ কোকিল (এশিয়ান এমারাল্ড কুক্কু): দক্ষিণ ও দক্ষিণ–পূর্ব এশিয়ার আবাসিক এই কোকিল এপ্রিল থেকে জুলাইয়ে সিলেট ও চট্টগ্রাম বিভাগের মিশ্র চিরসবুজ বনে আসে। বিরল ও ক্ষুদ্রাকৃতির পাখিটি মৌটুসি বা মাকড়সাভুক পাখির বাসায় ডিম পাড়ে।
চাতক বা পাকড়া কোকিল (জেকোবিন কুক্কু): আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়ার আবাসিক এই পাখি মার্চ থেকে জুলাইয়ে এ দেশে আসে। দেশজুড়ে বিচরণ করে এবং সচরাচর ছাতারে পাখির বাসায় ডিম পাড়ে।
লাল-ডানা কোকিল (চেস্টনাট-উইঙ্গড কুক্কু): খয়েরি বা লাল ডানার খোপাওয়ালা এই পাখি দক্ষিণ ও দক্ষিণ এশিয়ার আবাসিক পাখি। ওরা এ দেশে বেশ দুর্লভ। সুন্দরবনসহ অন্যান্য বন ও বনের পাশের এলাকায় মার্চ থেকে আগস্টে ওদের দেখা মেলে। সচরাচর পেঙ্গাজাতীয় পাখির বাসায় ডিম পাড়ে।
এ ছাড়া আরও যেসব প্রজাতির কোকিল এ দেশে বংশবৃদ্ধির জন্য পরিযায়ী হয়, সেগুলোর মধ্যে আছে বউ কথা কও, ধূসর-পেট কোকিল আর বেগুনি কোকিল। তবে আইইউসিএনের মতে, ওরা এ দেশেরই আবাসিক পাখি। এ ছাড়া এ তালিকায় ছোট কোকিলও রয়েছে।
সুমচা বা সাদা হালতি (ইন্ডিয়ান পিট্টা): দক্ষিণ এশিয়ার এই আবাসিক পাখি এপ্রিল থেকে আগস্টে ঢাকা, রাজশাহী, রংপুর ও ময়মনসিংহ বিভাগের পাতাঝরা ও গ্রামীণ বনে আসে। এই দুর্লভ পাখিটিকে সম্প্রতি মিরপুরের জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যানে দেখা গেছে।
হালতি বা সবুজাভ সুমচা (হুডেড পিট্টা): দক্ষিণ ও দক্ষিণ–পূর্ব এশিয়ার এই আবাসিক পাখি এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বরে খুলনা বিভাগের গ্রামীণ বন এবং সিলেট ও চট্টগ্রাম বিভাগের মিশ্র চিরসবুজ বনে প্রজনন ও বংশবৃদ্ধি করে। দুর্লভ এই পাখিকে ২০ মে মিরপুর উদ্ভিদ উদ্যানে দেখা গেছে।
বামন বা বুনো মাছরাঙা (ওরিয়েন্টাল ডোয়ার্ফ কিংফিশার): এ দেশে গ্রীষ্মকালে প্রজনন করতে আসা পাখিগুলোর মধ্যে এই মাছরাঙা ক্ষুদ্রতম। এটি বেশ বিরল ও বিপন্ন। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া থেকে আসা পাখিটি সিলেট ও চট্টগ্রাম বিভাগের পাহাড়ি ছড়া বা জলাধারের কাছে এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বরে বংশবৃদ্ধি করে।
নীল-লেজ সুইচোরা (ব্লু-টেইল্ড বি-ইটার): দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় এই আবাসিক পাখি মার্চ থেকে জুনে দেশজুড়ে প্রজনন করে। তবে সিলেট ও চট্টগ্রাম বিভাগের পাহাড়ি বন এবং সুন্দরবন ও রাজশাহীতে বেশি দেখা যায়।
আ ন ম আমিনুর রহমান, পাখি ও বন্য প্রাণী প্রজনন ও চিকিৎসাবিশেষজ্ঞ