১৮ বছর আগের কথা। মালয়েশিয়ার দ্য ইউনিভার্সিটি অব মালয়ায় পিএইচডি থিসিস জমা দিয়ে সপরিবার দেশে ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছি। তবে ফেরার আগে সিঙ্গাপুর ভ্রমণের ইচ্ছা হলো। কিন্তু আমার ভিসা হলেও বউ-বাচ্চাদের ভিসা সময়মতো পেলাম না। হাতে মাত্র তিন দিন সময়। অগত্যা কুয়ালালামপুরের কাছেপিঠে কোথাও সারা দিনের জন্য বেড়ানোর সিদ্ধান্ত নিলাম। এমন সময় দূতাবাসের ফোন, ওদের ভিসা হয়ে গেছে। রাতের বাসেই সিঙ্গাপুর রওনা হয়ে গেলাম। পরদিন ভোরে ওখানে পৌঁছে সারা দিন জাদুঘর, নাইট সাফারি ও শহরের গুরুত্বপূর্ণ স্থান দেখে কাটালাম।
পরদিন সকালে চিড়িয়াখানা ঘুরে দুপুরে জুরং বার্ড পার্কে এলাম। খুব সুন্দর একটি পার্ক; নানা প্রজাতির পাখির মেলা যেন এখানে! তবে পুরো পার্কের মধ্যে সবচেয়ে ভালো লাগল নিশাচর পাখি-প্রাণীদের ঘরটি। কৃত্রিমভাবে তৈরি এত সুন্দর প্রাকৃতিক পরিবেশ এর আগে তেমন একটা দেখিনি। ঘরের ভেতর ঢুকে মনে হলো যেন প্রকৃতিতেই পাখি-প্রাণী দেখছি। নিশাচরদের ঘরে ফ্ল্যাশ ফটোগ্রাফি নিষেধ। ছবি তোলার সময় একটি প্যাঁচাকে কৃত্রিমভাবে বানানো গাছের ডালে বসে আমাদের দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখলাম। বেশ কয়েকটি ক্লিক করলাম। প্যাঁচাটিকে আমাদের সুন্দরবনেও দেখা যায়। জীবনে এতবার সুন্দরবন গিয়েছি অথচ কখনোই তার দেখা পাইনি।
দেশে ফেরার পর গত ১৮ বছরে যতবার সুন্দরবন গিয়েছি, ততবারই ওর খোঁজ করেছি। কটকা, কচিখালী, আন্ধারমানিক, কোকিলমণি, শেখেরটেক, হাড়বাড়িয়া, করমজল কোথায় না খুঁজেছি। কিন্তু দেখা পাইনি। অবশেষে ২৪ ডিসেম্বর ২০২৫ রাতে আটজনের টিমে ছোট্ট লঞ্চ ‘আলোর কোল’-এ মোংলা থেকে নলিয়ান বা খুলনা রেঞ্জের কালাবগী ইকোট্যুরিজম কেন্দ্রের উদ্দেশে রওনা হলাম। আলোর কোল সকাল আটটা নাগাদ কালাবগী পৌঁছাল। দিনভর কালাবগীর হাটডোরা খালের বিভিন্ন খাঁড়িতে বিরল ও দুর্লভ পাখির সন্ধান শেষে সন্ধ্যায় কালাবগী অফিসের কাছে লঞ্চ নোঙর করল। রাত সোয়া আটটা নাগাদ নৌকাযোগে বেরিয়ে পড়লাম সিঙ্গাপুর বার্ড পার্কে দেখা সেই প্যাঁচার খোঁজে পাশের নাম না-জানা এক খালে। শীতের রাত, তীব্র ঠান্ডা; মাঝেমধ্যে মৃদু সমীরণে ঠান্ডা যেন আরও বেড়ে যাচ্ছে। নিকষ কালো অন্ধকারে খালের দুই পাশের বড় বড় গাছে টর্চের লাল আলো ফেলে এগিয়ে চলছি যেন পাখিরা বিরক্ত না হয়। মুঠোফোনে বাজছে প্যাঁচাটির ডাক। কিন্তু এটি অন্য প্রজাতির প্যাঁচার মতো ডাকের প্রত্যুত্তর দিচ্ছে না। ঘণ্টাখানেকের মধ্যে পুরো খাল ঘুরে যখন ফেরত আসছি, এমন সময় পক্ষীসঙ্গী সফিউল্লাহ হারেস কিছু একটাকে উড়ে গিয়ে বড় একটি গাছে বসতে দেখল। দ্রুত সেদিকে নৌকা ঘোরালাম। এবার টর্চের লাল আলো ফেলে পাখিটিকে স্পট করে স্বাভাবিক আলো ফেলতেই মনটা আনন্দে ভরে উঠল। রাত ৯টা ১১ মিনিট ৩৭ সেকেন্ডে প্রথম ক্লিক করলাম। এরপর ১৪ মিনিটে ৪০০টি ছবি তুলে ‘আলোর কোল’-এর দিকে নৌকা ঘোরালাম।
জুরং বার্ড পার্ক ও সুন্দরবনের কালাবগীর প্যাঁচাটি এ দেশের বিরল ও তথ্য অপ্রতুল আবাসিক পাখি বেলাই ভুতুম প্যাঁচা। ইংরেজি নাম বাফি/মালয় ফিশ আউল। স্ট্রিজিডি গোত্রের প্যাঁচাটির বৈজ্ঞানিক নাম Ketupa ketupu। বাংলাদেশ ছাড়া মিয়ানমার, কম্বোডিয়া, লাওস, ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর প্রভৃতি দেশে বাস করে।
প্রাপ্তবয়স্ক প্যাঁচার দৈর্ঘ্য ৪০ থেকে ৪৮ সেন্টিমিটার। ওজন ১.০৩ থেকে ২.১০ কেজি। দেহের ওপরটা কমলা-বাদামি, তার ওপর থাকে মোটা কালো দাগ। মাথায় ও ঘাড়ে গাঢ় দাগ। বাদামি কানঝুঁটিতে কোনো দাগ নেই। দেহের নিচটা লালচে-কমলা; তাতে রয়েছে সরু কালো ডোরা। চোখের রং উজ্জ্বল হলুদ। চঞ্চু, পা ও পায়ের পাতা ধূসরাভ। অপ্রাপ্তবয়স্ক পাখির দেহের পালক লালচে; তাতে দাগছোপ অস্পষ্ট।
এ দেশে বেলাই ভুতুম প্যাঁচা কেবল সুন্দরবনেই দেখা যায়। সচরাচর একাকী বা জোড়ায় থাকে। দিনে গাছের ঘন পত্রগুচ্ছের আড়ালে ঘুমিয়ে কাটায়। ভোর, গোধূলি ও পূর্ণিমা রাতে বেশি সক্রিয়। শিকারের জন্য খাঁড়ির পাশে বসে থাকে এবং কাঁকড়া, মাছ ও ব্যাঙ শিকার করে। প্রজননের সময় লম্বা করে ‘বুপ-বুপ-বুপ...’ শব্দে ডাকে।
ডিসেম্বর থেকে মে প্রজননকাল। এ সময় কোনো বড় গাছের গর্তে বাসা বানায়। অনেক সময় শঙ্খচিলের পরিত্যক্ত বাসাও ব্যবহার করে। ডিম পাড়ে একটি, রং ফ্যাকাশে সাদা। ডিম ফোটে ২৮ থেকে ২৯ দিনে। প্রায় ছয় সপ্তাহে ছানা বড় হয়ে যায়। আয়ুষ্কাল ১০ থেকে ২০ বছর।
আ ন ম আমিনুর রহমান, পাখি ও বন্য প্রাণী প্রজনন ও চিকিৎসা বিশেষজ্ঞ, গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়