রাজশাহী শহরের কাছে পদ্মা নদীর চরে তিনটি বড় পানকৌড়ি
রাজশাহী শহরের কাছে পদ্মা নদীর চরে তিনটি বড় পানকৌড়ি

পাখিরা টিকবে তো

কলেজের শিক্ষার্থী অসিম (ছদ্মনাম) যাচ্ছেন পাখি দেখতে রাজবাড়ীর বানিবহে। আমার গন্তব্য বালিয়াকান্দির কমলার বাগান। পাখি দেখা তাঁর শখ! পাখিবিশেষজ্ঞ সালিম আলীর বই পড়েন।

সঙ্গে বাইনোকুলার, ‘সালিম আলী’ ক্যাপ। ঘুরে বেড়ান নড়াইল, সাতক্ষীরা, হাকালুকি, জাহাঙ্গীরনগর। ঠিক হলো আগে বানিবহ, পরে বালিয়াকান্দি। গাছ তো উড়ে যাবে না, কিন্তু পাখি উড়াল দিতে পারে যেকোনো সময়। অকাট্য যুক্তি। ফি বছরের মতো রাজবাড়ীর বানিবহের শিবরামপুরের কর বাড়ির শতবর্ষী গাছে এসেছে শামুকখোল, পানকৌড়ি, সারস। এরা ঠিক সাইবেরিয়া থেকে আসা পাখি নয়, কাছের হিমালয়ের হবে। এবার একটু আগেই এসেছে। প্রায় প্রতিটি পাখির বাসায় আছে ডিম অথবা সদ্যোজাত বাচ্চা।

গাছপালা, প্রাণী, পাখি পৃথিবীকে টিকিয়ে রাখার জন্য তাদের কাজ করে যাচ্ছে; পৃথিবী তাদের ছাড়া অচল। অন্যদিকে পাখিসহ সব প্রাণীর প্রতি আমাদের ভালোবাসা দূরে থাক, সামান্য সহিষ্ণুতা বা খেয়ালের ফুরসত নেই।

দু-তিন বছর ধরে কর বাড়ির বাগানে পরিযায়ী পাখি আসছে। গত বছর (সেপ্টেম্বর, ২০২৫) প্রায় ১৫ হাজার এসেছে। আরও আসবে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ‘পরিযায়ী পাখিরা আগেভাগে আসছে, দেরিতে ফিরছে, এটা খুবই ভালো খবর। স্থানীয় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি ও জনগণেরও দায়িত্ব হচ্ছে এদের রক্ষা করা। আবাসস্থলগুলো যাতে দূষিত না হয় সেটা দেখা।’

জাহাঙ্গীরনগর আর আগের মতো পরিযায়ী পাখিদের আকর্ষণ করছে না। ঢিল ছোড়া ও উৎকট হাততালি, কীটনাশকের ব্যবহার এবং উন্নয়নের নামে যেখানে–সেখানে ভবন নির্মাণের ফলে পাখির ওড়ার পথ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। ঝোপঝাড় পরিষ্কার করার নামে আগুন দেওয়া হলে পাখি বিরক্ত হয়।

ধ্বংস হচ্ছে পাখিদের সম্ভাব্য খাদ্য উৎস। রাতের কৃত্রিম আলোর ছটা পাখি ও অন্যান্য বন্য প্রাণীর খাবার সংগ্রহ, প্রজনন এবং ঘুমের স্বাভাবিক প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করে। নানা কারণে জাহাঙ্গীরনগর থেকে পাখির মন উঠে যাচ্ছে।

এক ‘থার্টিফার্স্ট নাইটে’ (২০২৪) পাখিদের জীবন বাঁচাতে আতশবাজি বন্ধ রাখার জন্য এক জনপ্রিয় অভিনেত্রী কাতর অনুরোধ করেছিলেন, ‘পাখিরা আমাদের ক্যালেন্ডার ফলো করে না। কাজেই পটকা বা বাজি ফুটিয়ে তাদের বিরক্ত করবেন না।’

অসিম জানায়, রাজবাড়ীতে পাখিদের ঢল দেখে ফেসবুকে লিখেছিলাম ‘পাখিরা টিকবে তো’? এই প্রশ্নের জবাবে অনেকেই লিখেছেন, মানুষই টেকে কি না তার ঠিক নেই, আমি পড়ে আছি পাখির হিস্যা নিয়ে। গাছপালা, প্রাণী, পাখি পৃথিবীকে টিকিয়ে রাখার জন্য তাদের কাজ করে যাচ্ছে; পৃথিবী তাদের ছাড়া অচল। অন্যদিকে পাখিসহ সব প্রাণীর প্রতি আমাদের ভালোবাসা দূরে থাক, সামান্য সহিষ্ণুতা বা খেয়ালের ফুরসত নেই। তবে পাখির ব্যবসা বড় রমরমা। তার মানে এই নয় যে পাখপাখালির প্রতি আমাদের শ্রদ্ধা–সহিষ্ণুতা উথলে উঠছে। দিন দিন প্রাণিকুলের প্রতি আমাদের নির্মমতা বাড়ছে বৈ কমছে না।

এক ‘থার্টিফার্স্ট নাইটে’ (২০২৪) পাখিদের জীবন বাঁচাতে আতশবাজি বন্ধ রাখার জন্য এক জনপ্রিয় অভিনেত্রী কাতর অনুরোধ করেছিলেন, ‘পাখিরা আমাদের ক্যালেন্ডার ফলো করে না। কাজেই পটকা বা বাজি ফুটিয়ে তাদের বিরক্ত করবেন না।’ কেউ শোনেনি। পাখিদেরও ডিম পাড়ার বাসা বাঁধার ক্যালেন্ডার আছে। সেটা মেনেই তারা চলার চেষ্টা করে। কোকিল ডিম পাড়ে ফাল্গুন–চৈত্র, বড়জোর বৈশাখে। কিন্তু এখন আষাঢ়েও সে খুঁজে পায় না কাকের বাসা। বড় বড় গাছ কেটে ফেলার জন্য কাকেরা এখন গৃহহীন। বহুতল বাড়ি তৈরি করতে গিয়ে সড়কের পাশের সরকারি গাছগুলোও কেটে ফেলছে অনেক ডেভেলপার। পাখির গায়ে হাত না তুলেও যে তার সর্বনাশ করা যায়, এটা তার একটা ক্ল্যাসিক উদাহরণ।

কথায় কথায় গণচীনের সেই ভয়াবহ ভুলের কথা চলে আসে। ‘সামান্য’ চড়ুই পাখি নিধনকে কেন্দ্র করে গত শতকে (১৯৫৮ সালে) চীনে যে প্রাকৃতিক বিপর্যয় হয়েছিল, তা হয়তো কখনো কারও পক্ষে কল্পনা করাও সম্ভব ছিল না। বিজ্ঞানীরা জানিয়েছিলেন, বছরে একটি চড়ুই খায় প্রায় ৪.৫ কেজি শস্যদানা। তাহলে এক মিলিয়ন চড়ুই হাপিস করতে পারলে, আনুমানিক ৬০ হাজার মানুষের খাদ্যসংস্থান করা সম্ভব হবে। সিদ্ধান্ত হয় চড়ুই নিধনের। ‘দ্য গ্রেট স্প্যারো ক্যাম্পেইন!’

প্রকৃতির সঙ্গে কথা না বলে প্রাণপ্রকৃতির বিষয়ে যেকোনো সিদ্ধান্ত যে কতটা আত্মঘাতী হতে পারে, তা চীনের সঙ্গে সঙ্গে সারা দুনিয়া বুঝেছিল সেইবার। চড়ুই শুধু শস্যদানা খেতো না, তারা শস্যের ক্ষতিকর পোকাও খেতো। পরের বছর দেখা গেল, ধানগাছে পোকামাকড়ের ভয়ানক আক্রমণ শুরু হয়েছে। কীটনাশক দিয়েও এসব পোকা নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছিল না। তার ওপর আসে পঙ্গপালের সর্বনাশা আক্রমণ। লাখ লাখ একর জমির ফসল ধ্বংস হয়ে যায়। শুরু হয় এক মারাত্মক দুর্ভিক্ষ।

সেই দুর্ভিক্ষে দেড় থেকে চার কোটির বেশি মানুষ মারা যায়। পরে বড় রকমের কাফফারা দিতে হয় চীনকে। চড়ুই নিধনের আদেশ প্রত্যাহারের পাশাপাশি আশপাশের দেশ থেকে চড়ুই আমদানি করতে হয় নগদে। সেই সব দেশের তালিকায় পাকিস্তানও ছিল। তখন বাংলাদেশ ছিল পাকিস্তানের অংশ। সেই সুবাদে এখানকার চড়ুইদেরও চীন সফরের সুযোগ মিলে যায়। ফাঁদ পেতে আমন খেতে ঝাঁকে ঝাঁকে পাখি ধরার সেই শুরু। এখন অনেক চীনা বন্ধু ঠাট্টা করে বলেন, ‘আমাদের পাখিরা বাংলায় কথা বলে।’

দেশে চলছে বিষটোপ দিয়ে পাখি হত্যা। গত বছরের (২০২৫) জানুয়ারিতে রাজশাহীর পদ্মা নদীতে বিষটোপ দিয়ে নির্বিচার পাখি হত্যার খবর চাউর হলে কর্মকর্তারা অভিযানে নামেন। জবাই করা অবস্থায় এক শিকারির বাড়ি থেকে নয়টি চখা, পাখি ধরার জাল ও অন্যান্য সরঞ্জাম জব্দ করা হয়। একই খবর আসে মৌলভীবাজারের জুড়ী উপজেলার হাকালুকি হাওর থেকে।

পাখি দেখতে দেখতে অসিম জার্মানির এক বাংলাদেশি শিশুর গল্প বলে। শিশুটির দাদি তাকে হোয়াটসঅ্যাপে একটা গুলতি দেখিয়ে বলেছিল, এটা আমি তোমার জন্য কিনে রেখেছি; কেউ গেলে তোমার জন্য এটা আমি পাঠিয়ে দেব। শিশুটি জানতে চায় গুলতি কী? ওটা দিয়ে কী করে? পাখি মারে ভাইয়া; তুমি পাখি শিকার করবে। শিশুটি বুঝে পায় না পাখিকে কেন মারতে হবে? ‘আই এনজয় দেয়ার সংস; দে হ্যাভ ফ্যামিলি টু, হোয়াই শুড আই কিল দেম? ইউ আর টুউউউ ক্রয়েল দাদিমা’। তারপর শিশুটি দাদির সঙ্গে আর কথা বলেনি। আহা, আমাদের শিশুরাও যদি এভাবে রুখে দাঁড়াত!

সব গল্প ছাপিয়ে শুধু মনে পড়ে ওদেরও পরিবার আছে!! একটা পাখি মারা গেলে তার বাচ্চাদের কী হবে? যে শিক্ষা শিশুদের মগজে এই চিন্তা ঢুকিয়ে দেয়, আমাদের সেই শিক্ষা ছাড়া শুধু আইন দিয়ে পাখি নিধন বন্ধ হবে না। ধন্যবাদ অসিম।

# লেখক গবেষক wahragawher@gmail.com