শেরপুর জেলার ঝিনাইগাতী উপজেলায় অবস্থিত গজনী অবকাশকেন্দ্র। এর বেশির ভাগজুড়েই রয়েছে বন। গারো পাহাড়ের পাদদেশের এই পর্যটনকেন্দ্র পিকনিক স্পট হিসেবে সুপরিচিত। বন, পাহাড়, টিলা ও লেক নিয়ে সুন্দর এক জায়গা এটি। এখানকার প্রধান গাছ হচ্ছে শাল ও সেগুন। গত বছরের ১০ জানুয়ারি গিয়েছিলাম এই অবকাশকেন্দ্রে। প্রকৃতিতে তখন পৌষ মাস। এ স্থানেই দেখা পাই সাদা গুইচা আর বন মটমটিয়ার।
সাদা গুইচা
হাঁটছিলাম বন ও টিলার মধ্য দিয়ে। দুচোখ করে যাচ্ছিল নতুন উদ্ভিদের সন্ধান। নানা রকম ঝোপঝাড়ের মধ্যে হাঁটতে ভালো লাগছিল। হাঁটতে হাঁটতে চলে এলাম লেকের পশ্চিম পাশে। এখানেই লতানো, আরোহী এই গুল্মজাতীয় উদ্ভিদ চোখে পড়ল। অনেকটা এলাকা ছেয়ে আছে এই গুল্মে। উদ্ভিদের অগ্রভাগে আছে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ফুলের কলি আর সাদা রঙের কচি পাতা। ফুল তখনো ফোটেনি। এই উদ্ভিদ বাংলায় পরিচিত ‘সাদা গুইচা’ নামে। পরে জেনে অবাক হলাম আমাদের পরিচিত মধুমঞ্জরিলতা আর মাঙ্কি বুশ একই গণের উদ্ভিদ। এ দুটি উদ্ভিদকে আলংকারিক হিসেবে চাষ করা হয় বারান্দা, বাগান বা ছাদের সৌন্দর্য বাড়ানোর জন্য। অথচ সাদা গুইচা বনের মধ্যে পড়ে আছে অবহেলায়।
উদ্ভিদের বৈজ্ঞানিক নাম Combretum decandrum। এই উদ্ভিদ আরোহী, কাণ্ড কাষ্ঠল ও কাঁটাযুক্ত। ফুল ছোট, লোমশ, রং সাদা থেকে হলুদ। ফল ডানাযুক্ত, চকচকে।
উদ্ভিদ ৮-১০ মিটার পর্যন্ত উঁচু হয়। পাতার বিন্যাস বিপরীত। পাতার আকৃতি উপবৃত্তাকার থেকে ডিম্বাকার। পাতায় ক্ষুদ্র গ্রন্থি ও লোম থাকে।
উদ্ভিদের ফুল ছোট, লোমশ। পাপড়ি পাঁচটি, হলুদাভ সবুজ, প্রায় ২ মিলিমিটার লম্বা, পাপড়ির উভয় পিঠে হলুদ লোম থাকে। ফুল শাখার প্রান্তে এবং পাতার অক্ষে স্পাইক পুষ্পমঞ্জরিতে জন্মে। পুষ্পমঞ্জরি ৫-১৫ সেন্টিমিটার লম্বা হয়। ফুল ও ফল হয় সারা বছর ধরে, তবে বিশেষভাবে নভেম্বর থেকে জুন পর্যন্ত ফুল ও ফল ধরে। ফুলে মধু থাকে। ফল খাওয়ার যোগ্য। ফল রান্না করে বা কাঁচা খাওয়া যায়।
বন মটমটিয়া
গজনী অবকাশকেন্দ্রের এক জায়গায় টিলা বেয়ে বেয়ে নিচে নেমে গেলাম। জায়গাটা সমতল। বাঁ দিকে একটু দূরে একটা সেতু চোখে পড়ল। তার মানে আমি যে জায়গায় দাঁড়িয়ে আছি, সেটা নদীর ধার। বর্ষায় হয়তো নদী পানিতে ভরে যায়। শীতে নদীর ধার ছেয়ে আছে বন মটমটিয়ার ফুলে। আর তীব্র শীত উপেক্ষা করে বন মটমটিয়া ফুল যেন সৌন্দর্যপ্রেমীদের হাতছানি দিচ্ছে। ফুল বলে মানুষ যেটি চেনে সেটি আসলে ক্যাপিচুলাম পুষ্পমঞ্জরি। এস্টার, সূর্যমুখী, চন্দ্রমল্লিকাতেও একই ধরনের পুষ্পমঞ্জরি থাকে। একেকটা পুষ্পমঞ্জরিতে অনেকগুলো ফুল থাকে। ফুল নীলাভ-সাদা। এর পাতা উপবৃত্তাকার, কিনারা দাঁতের মতো খাঁজকাটা। উদ্ভিদের কাণ্ড বা শাখাকে মটমট করে ভাঙা যায় বলেই হয়তো এর এরূপ নামকরণ। পাতায় গন্ধ আছে। উদ্ভিদের বৈজ্ঞানিক নাম Chromolaena odorata। এটি ধীরে ধীরে হামাগুড়ি দিয়ে চলা উদ্ভিদ এবং অন্য উদ্ভিদের গায়ে জন্মাতে পারে। এই উদ্ভিদ ২ দশমিক ৫ মিটার পর্যন্ত উঁচু হতে পারে। ইংরেজিতে এই গুল্ম জ্যাক ইন দ্য বুশ, বিটারবুশ, ক্রিসমাস বুশ ইত্যাদি নামে পরিচিত।
বন মটমটিয়া একটি আগ্রাসী আগাছা। এর আদি নিবাস উত্তর আমেরিকা, ফ্লোরিডা, টেক্সাস, মেক্সিকো ও ক্যারিবীয় অঞ্চল। বাংলাদেশসহ এশিয়া, পশ্চিম আফ্রিকা ও অস্ট্রেলিয়ার বিভিন্ন অংশেও এ উদ্ভিদ বিস্তার লাভ করেছে।
চয়ন বিকাশ ভদ্র, অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগ, মুমিনুন্নিসা সরকারি কলেজ, ময়মনসিংহ