বাংলাদেশে যে কয়েক ধরনের মৌটুসি পাখি দেখা যায়, সিঁদুরে মৌটুসি তার মধ্যে সবচেয়ে সুন্দর। শুধু মৌটুসি পাখির মধ্যে নয়, আমাদের দেশে যত সুন্দর পাখি আছে, তার মধ্যে অন্যতম সিঁদুরে মৌটুসি। অনেক দিন কেবল ছবি দেখতাম। ছবির বাইরে বাস্তবে এই পাখি দেখার প্রবল ইচ্ছা ছিল।
রংপুরে এ পাখি অনেক খুঁজেছি। মান্দার ফুলের মধু এ পাখির খুব পছন্দ। এ কারণে মান্দারের মৌসুম এলেই এই পাখির খোঁজ বেড়ে যেত। যাঁরা পাখির খোঁজখবর রাখেন, তাঁদের অনেকে বলেছিলেন, রংপুরের কোথাও এই পাখি দেখা যায় না। কেউ কেউ বলেছিলেন, কেবল রংপুরে নয়; সম্পূর্ণ উত্তরাঞ্চলে কোথাও এ পাখি আসে না। গভীর বনের পাখি সিঁদুরে মৌটুসি। সাতছড়ি উদ্যানে, সুন্দরবনে আছে। চট্টগ্রামের হাজারিখিলেও দেখা যায়। এসব শুনে রংপুরে এই পাখি খোঁজা ছেড়ে দিয়েছিলাম।
কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলায় আমার গ্রামের বাড়ি। ২০২২ সালের এক শীতের সকালে বাড়িতেই এ পাখির দেখা মিলল। সকালে নাশতা খেতে খেতে দেখলাম, দূরে একটি শিম ফুলের মধু খাচ্ছে সিঁদুরে মৌটুসি। একটু খটকা লাগল, সত্যি কি না! খাওয়া ছেড়ে দ্রুত ক্যামেরা বের করে ছবি তুললাম। ভালো ছবি না পেলেও কুড়িগ্রামে এই পাখি দেখাটাই একটি বড় ঘটনা হয়ে থাকল।
দেশের উত্তরাঞ্চলে যাঁরা পাখির ছবি তোলেন, তাঁদের অনেকের সঙ্গে কথা বলি। তাঁরা প্রত্যেকে আবারও জানান, তাঁদের জানামতে এই পাখি উত্তরাঞ্চলে দেখার রেকর্ড নেই। আমি মনে করি, যদি কুড়িগ্রামের বাইরে উত্তরাঞ্চলে আর কোথাও থেকেও থাকে, তবুও এটিকে এই অঞ্চলে বিরল বলতে হবে।
অনেকে অবাক হলেন এই ভেবে যে গভীর বনের পাখি বনহীন জনপদে এল কীভাবে। পরে জেনেছি, কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার কোথাও কোথাও এই পাখি দেখা যায়। আলোকচিত্রী সঞ্জয় চৌধুরী নাগেশ্বরী উপজেলায় এ পাখির ছবি তুলেছেন। এতে বোঝা যায়, এই পাখি কুড়িগ্রামের বিভিন্ন উপজেলায় আছে।
যেহেতু এই পাখি একবার দেখা গেছে, তাই যতবার বাড়িতে যাই, আমি এই পাখি খুঁজি। লিচুর মৌসুমে আমাদের বাড়ির গাছে বেশ পাখি আসে। ২০২৩ সালে আমি লিচুর পাশাপাশি বিভিন্ন পাখির ছবি তুলছিলাম। ফুলঝুরি, শ্বেতাক্ষী ও বুলবুলি পাখি বারবার এসে লিচু খাচ্ছিল। ছবি তুলতে তুলতে দেখি, রং ছড়িয়ে চলে এল সিঁদুরে মৌটুসি। এ পাখি যে লিচুর রস খায়, এটি কোনো দিন শুনিনি, কারও ছবিতেও দেখিনি। লিচুর রস খাচ্ছে—এমন সুন্দর ছবি তুলতে পারলাম। এরই মধ্যে কুড়িগ্রামের রাজারহাটের বৈদ্যেরবাজার নামের স্থানে মধুমঞ্জরী এবং জবা ফুলে এই পাখি দেখেছি।
আরেক দিনের কথা। গ্রামের বাড়িতে গিয়েছি। দুই দিন থেকে ফেরার সময় হঠাৎ দেখতে পেলাম, আমাদের বাড়ির উঠানে গোলাপজাম ফুলে সিঁদুরে মৌটুসি। পরে গোলাপজাম ফুলে এ পাখির খুব সুন্দর ছবি পেয়েছি। ২০১৯ সালে গোলাপজাম ফুলের সঙ্গে সিঁদুরে মৌটুসি স্ত্রী পাখির ছবি তুলেছিলাম। স্ত্রী পাখিটি দেখতে পুরুষ পাখিটির মতো রঙিন নয়। তা ছাড়া তখন এ পাখি ভালোভাবে চিনতাম না। ২০২৩ সালের পরে বুঝতে পেরেছিলাম, ২০১৯ সালে তোলা পাখির ছবিটি সিঁদুরে মৌটুসি স্ত্রী পাখির।
২০২৪ সালে সুন্দরবনে খুব কাছে থেকে এই পাখি দেখেছি। চট্টগ্রামের হাজারিখিলে দেখেছি। এখানে একধরনের পরগাছা ফুলের মধু খাচ্ছিল। অনেকে হবিগঞ্জে জাতীয় উদ্যান সাতছড়িতে মান্দার ফুলের সঙ্গে এই পাখির ছবি তুলেছেন। আমার পক্ষে সেটি সম্ভব হয়নি। তবে লিচুর সঙ্গে কিংবা গোলাপজাম ফুলের সঙ্গে যেভাবে এই পাখি দেখেছি, তা মন ভরে ওঠার জন্য যথেষ্ট।
পাখিটির মাথা, গলা ও গলাসংলগ্ন অংশটুকু সিঁদুরের মতো টকটকে লাল। কেবল কপাল ও চোখ কালো। চঞ্চুর গোড়া থেকে একটি কালো রেখা লাল রঙের ওপর দিয়ে গলার দিকে এগিয়ে গেছে। চঞ্চু লাল রং–প্রভাবিত। ফুল থেকে মধু সংগ্রহ করার জন্য লম্বা জিব আছে। লাল অংশটুকু বাদ দিলে পাখিটির অন্য অংশ ধূসর। পাখিটির আকৃতি অন্য সব মৌটুসির চেয়ে সামান্য বড়। সিঁদুরে মৌটুসির ইংরেজি নাম ‘Crimson Sunbird’। পাখিটির বৈজ্ঞানিক নাম Ayethopyga siparaja।