বিশ্ব বাঘ দিবসের অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্য দেন পরিবেশমন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু। রাজধানীর আগারগাঁও। ২৯ জুলাই
বিশ্ব বাঘ দিবসের অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্য দেন পরিবেশমন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু। রাজধানীর আগারগাঁও। ২৯ জুলাই

বিশ্ব বাঘ দিবস

পরিবেশ-জীববৈচিত্র্যের সামঞ্জস্যনা হলে উন্নয়ন টেকসই হবে না

পরিবেশ সংরক্ষণে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা তুলে ধরে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু বলেছেন, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মাধ্যমে মানুষের জীবনমানের উন্নয়ন করতে গেলে উৎপাদন বাড়াতে হবে। উৎপাদন বাড়াতে গেলে পরিবেশ ও প্রতিবেশ নষ্ট হবে। তবে পরিবেশ, প্রতিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের মধ্যে সামঞ্জস্য আনতে না পারলে উন্নয়ন টেকসই হবে না।

আজ বুধবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ের বন ভবনে বন অধিদপ্তর আয়োজিত বিশ্ব বাঘ দিবসের অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এ কথা বলেন তিনি। মন্ত্রী বলেন, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মাধ্যমে জীবনমান উন্নয়ন করা ছাড়া অন্য কোনো পন্থা নেই। উন্নয়নের জন্য দেশের উৎপাদন বাড়াতে হবে। উৎপাদন বাড়াতে গেলে বিভিন্ন কলকারখানা আসবে। সেখানে পরিবেশ–প্রতিবেশ নষ্ট হবে।

আবদুল আউয়াল মিন্টু বলেন, ‘আমাদের আইনের অভাব নেই। বাংলাদেশে যে কটা আইন আছে যদি আপনি শতভাগ প্রয়োগ করেন তাহলে কলকারখানা সব বন্ধ করে দিতে পারবেন। বাড়িঘরের দরজাও লক করে দিতে পারবেন।’

পরিবেশ রক্ষা করতে গিয়ে সব মানুষকে দেশ থেকে বের করে দিতে পারেন কি না, সে প্রশ্ন তুলে মন্ত্রী বলেন, ‘আমার কথায় আপনারা খারাপ কিছু মনে করিয়েন না। আমি কিন্তু আপনাদের পক্ষের লোক। আমাকে মাঠের বাস্তবতা তুলে ধরতে হবে। কত ধরনের আইন আছে দেখলাম। একটা আছে ইটভাটা সব বন্ধ করে দিতে হবে। ২ হাজার ৩০০ কোটি ইট লাগে দেশে বছরে। পারবেন বন্ধ করতে? বিকল্প কী? আছে ব্লক। সেটাতে ২০ কোটি উৎপাদন হয়। যখনই ইট পোড়াবেন তখনই পরিবেশদূষণ হবে। বিকল্প ব্যবস্থা না হলে এসব বন্ধ করা যাবে না।’

বাঘ সংরক্ষণ করা জরুরি বললেও পার্বত্য অঞ্চলে বাঘের আরেকটি আবাসস্থল গড়ে তোলার প্রস্তাবের সমালোচনা করেন মন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু। তিনি বলেন, ‘ওখানে এমনিতে হাতি নিয়ে সমস্যায় আছি। এখন বাঘ ছেড়ে দিলে তো মানুষ সব বের করে দিতে হবে। এটাই আমাদের বাস্তবতা। বাস্তবতাকে ধর্তব্যে না আনলে কোনো আইন কাজ করবে না। মানুষই যদি না থাকল তাহলে বাঘ থাকলেই–বা কী, না থাকলেই কী।’

মন্ত্রী বলেন, প্রকৃতি ও বন্য প্রাণীর সঙ্গে সহাবস্থান করতে চাইলে খুব সতর্কতার সঙ্গে এগোতে হবে। পরিবেশ, প্রতিবেশ, জীববৈচিত্র্য—এগুলোর মধ্যে সামঞ্জস্য আনতে না পারলে ভবিষ্যৎ উন্নয়নটা টেকসই হবে না।

অনুষ্ঠানে বাঘ সংরক্ষণের দুর্বলতা, চ্যালেঞ্জ ও করণীয় বিষয়ে একটি গবেষণাপত্র উপস্থাপন করেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক এম এ আজিজ। তিনি জলবায়ু পরিবর্তনসহ নানা কারণে সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য হ্রাস পাওয়ার চিত্র তুলে ধরেন।

এম এ আজিজ গবেষণাপত্রে বলেন, বাঘ যেসব প্রাণী শিকার করে তার ৭৯ শতাংশই হরিণ। সুতরাং বাঘ রক্ষা করতে হলে হরিণ রক্ষা করতে হবে। সুন্দরবনে শিকারিদের পাতা ফাঁদ হরিণের জন্য একটা বড় বিপদ হয়ে দেখা দিয়েছে।

অনুষ্ঠানে উদ্বোধনী বক্তব্য দেন বন অধিদপ্তরের বন্য প্রাণী ও প্রকৃতি সংরক্ষণ অঞ্চলের বন সংরক্ষক মো. ছানাউল্যা পাটোয়ারি। তিনি বাঘ সংরক্ষণের নানা দিক তুলে ধরেন।

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম বলেন, বাঘ সংরক্ষণে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর বনের ওপর নির্ভরশীলতা কমাতে হবে। বিকল্প জীবিকা গড়ে তুলতে বিশ্বব্যাংক, প্রকৃতি সংরক্ষণের আন্তর্জাতিক জোট ও জার্মান সংস্থা জেআইজেড কাজ করে যাচ্ছে।

মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব ফাহমিদা খানম বলেন, বাঘের জন্য বনের ভেতরে হুমকি যেমন আছে, বনের বাইরে থেকেও হুমকি তৈরি হচ্ছে। সুন্দরবনের ১০ কিলোমিটারের মধ্যে শিল্পকারখানার দূষণ কমিয়ে আনতে হবে।

সচিবের বক্তব্যের পর অনুষ্ঠানে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সচেতনতার জন্য তৈরি বাঘ সংরক্ষণে কাজ করা ওয়াইল্ড টিমের তৈরি একটি ভিডিও প্রদর্শন করা হয়। বন অধিদপ্তরের প্রধান বন সংরক্ষক মো. আমীর হোসাইন চৌধুরীর সভাপতিত্বে আরও বক্তব্য দেন প্রকৃতি সংরক্ষণের আন্তর্জাতিক জোট আইইউসিএনের বাংলাদেশের কান্ট্রি রিপ্রেজেন্টেটিভ বিপাশা এস হোসেন ও খুলনা অঞ্চলের বন সংরক্ষক ইমরান আহমেদ।