নদীর পাড় ঘেঁষে বানানো হয়েছে ইটভাটা। গত ২৪ ফেব্রুয়ারি দ্বিতীয় ধলেশ্বরী সেতুসংলগ্ন এলাকায়
নদীর পাড় ঘেঁষে বানানো হয়েছে ইটভাটা। গত ২৪ ফেব্রুয়ারি দ্বিতীয় ধলেশ্বরী সেতুসংলগ্ন এলাকায়

ডায়াবেটিসসহ নানা রোগ বাড়াচ্ছে বায়ুদূষণ, ঢাকাসহ কয়েক শহর ঝুঁকিতে

ডায়াবেটিস, হৃদ্‌রোগ, মানসিক স্বাস্থ্য, ডেঙ্গু রোগীর মৃত্যু ঝুঁকিসহ নানা রোগের কারণ হিসেবে বায়ুদূষণকে চিহ্নিত করা হয়েছে।

চলতি বছরের মধ্য–ফেব্রুয়ারির এক সকাল। রাজধানীর আগারগাঁওয়ের ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট টিবি হাসপাতালের বহির্বিভাগে দাঁড়িয়ে আছেন ৬৫ বছরের আবুল কাশেম। তিনি দীর্ঘদিনের শ্বাসকষ্টের রোগী। শীতের শেষ সময়ে তা আরও বেড়েছে। নগরীর আদাবরের বাসিন্দা আবুল কাশেম বলেন, ‘শীতটা আগের চেয়ে কমেছে, কিন্তু কাশি থামে না।’ চিকিৎসকেরা তাঁকে বলছেন, তাঁর সমস্যা শুধু বয়সজনিত নয়, বাতাসের দূষণও বড় কারণ।

কাশেমের মতো রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে টিবি হাসপাতালে রোগীর সংখ্যা ছিল ৯ হাজার ৭২। আর গত বছরের জানুয়ারিতে ছিল ৮ হাজার ৬১১। অর্থাৎ, এক বছরের ব্যবধানে রোগী বেড়েছে চার শতাধিক। চিকিৎসকেরা বলছেন, বক্ষব্যাধি ও শ্বাসতন্ত্রের রোগীর এই ঊর্ধ্বগতি বিচ্ছিন্ন নয়; এর পেছনে বায়ুদূষণের ভূমিকা ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে।

বায়ুদূষণ যে শুধু ফুসফুসের রোগের কারণ, তা নয়। গবেষণা বলছে, এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি, ডায়াবেটিসের আশঙ্কা, ডেঙ্গুতে মৃত্যুর ঝুঁকি, এমনকি বিষণ্নতার ছায়াও। বাংলাদেশে বায়ুদূষণ নিয়ে বহু বছর ধরে আলোচনা হচ্ছে। কিন্তু সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক গবেষণাগুলো বলছে, বিষয়টি কেবল পরিবেশগত সংকট নয়। এটি এক গভীর জনস্বাস্থ্য সংকট।

শীতটা আগের চেয়ে কমেছে, কিন্তু কাশি থামে না
আদাবরের বাসিন্দা আবুল কাশেম

ঢাকা, রাজশাহী, গ্রামীণ এলাকা—বিভিন্ন পরিপ্রেক্ষিতে পরিচালিত গবেষণাগুলো একসঙ্গে যে চিত্র তুলে ধরছে, তা উদ্বেগজনক। দূষণ বাড়ছে। বাড়ছে দূষণজনিত অসুখ–বিসুখ। এর প্রভাব পড়ছে অর্থনীতিতেও। দূষণ নিয়ে নানা প্রকল্প আর সেগুলোর ধারাবাহিক ব্যর্থতার মধ্যে চাপা পড়ছে মানুষের কষ্টের কথা। এ ছাড়া শীত মৌসুমে যে সামান্য বৃষ্টি হতো, তা–ও কমছে। ধুলাবালুর এ সময়ে বৃষ্টিতে দূষণ কিছুটা কমার সুযোগও কমে যাচ্ছে।

ধূলিকণার সঙ্গে বাড়ে ডায়াবেটিসের ঝুঁকি

বাংলাদেশে দ্রুত ডায়াবেটিস বাড়ার পেছনে সাধারণত কারণ হিসেবে বেশি শোনা যায় খাদ্যাভ্যাস, কম শারীরিক পরিশ্রম, স্থূলতা, বংশগত ঝুঁকি, মানসিক চাপ ইত্যাদি। কিন্তু নতুন একটি গবেষণা বলছে, ডায়াবেটিস বাড়ার পেছনে আরেকটি বড় ‘অদৃশ্য’ চালক হিসেবে কাজ করতে পারে বাতাসে থাকা সূক্ষ্ম ধূলিকণা।

এই গবেষণা করা হয়েছে দেশব্যাপী পরিচালিত জনমিতি ও স্বাস্থ্য জরিপের (২০২২) তথ্য নিয়ে। ফলাফলে দেখা যায়, দীর্ঘদিন ধরে বাতাসে খুব সূক্ষ্ম ধূলিকণা বা পিএম ২ দশমিক ৫ যত বাড়ে, ডায়াবেটিসের ঝুঁকিও তত বাড়ে। বিশেষভাবে, পিএম ২ দশমিক ৫ যদি প্রতি ঘনমিটারে ১০ মাইক্রোগ্রাম করে বাড়ে, তাহলে ডায়াবেটিসের ঝুঁকি গড়ে ১০ শতাংশ বেশি বাড়ে।

গবেষকেরা হিসাব করে দেখিয়েছেন, বাংলাদেশ যদি বাতাসকে কিছুটা পরিষ্কার করতে পারে (অর্থাৎ বছরজুড়ে পিএম ২ দশমিক ৫ কমিয়ে আনতে পারে), তাহলে জনসংখ্যা পর্যায়ে ডায়াবেটিসের ঝুঁকি প্রায় ৪ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে ৭ দশমিক ৫ শতাংশ পর্যন্ত কমানো সম্ভব।

ঢাকা, রাজশাহী, গ্রামীণ এলাকা—বিভিন্ন পরিপ্রেক্ষিতে পরিচালিত গবেষণাগুলো একসঙ্গে যে চিত্র তুলে ধরছে, তা উদ্বেগজনক। দূষণ বাড়ছে। বাড়ছে দূষণজনিত অসুখ–বিসুখ। এর প্রভাব পড়ছে অর্থনীতিতেও।
শুষ্ক মৌসুমে রাজধানীতে বেড়েছে বায়ুদূষণ। গতকাল ঢাকা–নারায়ণগঞ্জ মহাসড়কে

পিএম ২.৫ আসলে কী

পিএম ২.৫ বলতে বোঝায় বাতাসে থাকা এমন সূক্ষ্ম কণা, যার ব্যাস ২.৫ মাইক্রোমিটার বা তার কম। মানুষের চুলের তুলনায়ও বহুগুণ ছোট, যা চোখে দেখা যায় না। কিন্তু নিশ্বাসের সঙ্গে ফুসফুসে ঢুকে রক্তপ্রবাহে প্রভাব ফেলতে পারে। গবেষকেরা ব্যাখ্যা করে বলেছেন, এসব ধূলিকণা শরীরে প্রদাহ, অক্সিডেটিভ স্ট্রেস এবং ইনসুলিন কাজ করার প্রক্রিয়ায় বাধা তৈরি করতে পারে। এর ফলে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স বাড়ে এবং ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়তে পারে।

এই জরিপে দুই ধাপে নমুনা নেওয়া হয়েছে। প্রাপ্তবয়স্ক ১৫ হাজার ২৪৯ জন জরিপে অংশ নেন। পরবর্তী ধাপে যাঁদের ডায়াবেটিসের ওষুধ নেওয়ার তথ্য নেই, তাঁদের বাদ দিয়ে চূড়ান্ত বিশ্লেষণে রাখা হয় ১৩ হাজার ৯৬৫ জন (নারী ৭ হাজার ৭১২; পুরুষ ৬ হাজার ২৫৩)।

গবেষণায় কী পাওয়া গেল

গবেষণাটি করেছেন বাংলাদেশ ও আন্তর্জাতিক কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের গবেষকেরা। এর নেতৃত্ব দিয়েছেন কানাডার ম্যাকগিল ইউনিভার্সিটির রোগতত্ত্ব বিষয়ের গবেষক জুয়েল রানা। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, এই জরিপে দুই ধাপে নমুনা নেওয়া হয়েছে। প্রাপ্তবয়স্ক ১৫ হাজার ২৪৯ জন জরিপে অংশ নেন। পরবর্তী ধাপে যাঁদের ডায়াবেটিসের ওষুধ নেওয়ার তথ্য নেই, তাঁদের বাদ দিয়ে চূড়ান্ত বিশ্লেষণে রাখা হয় ১৩ হাজার ৯৬৫ জন (নারী ৭ হাজার ৭১২; পুরুষ ৬ হাজার ২৫৩)।

জুয়েল রানা প্রথম আলোকে বলেন, এসব ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তি ২০২২ সালের পর থেকে পরের তিন বছর কতটুকু বায়ুদূষণের সংস্পর্শে এসেছেন, তা নির্ণয় করা হয়। তাঁরা যে এলাকায় বাস করেছেন, যে বাসায় থেকেছেন, সেখানে বায়ুদূষণ পরিস্থিতি পরিমাপ করা হয়েছে।

প্রশ্ন ছিল এভাবে যে ডায়াবেটিক রোগীর বায়ুদূষণের প্রভাব দেখা হয়েছে এর জীববৈজ্ঞানিক ভিত্তি কী? উত্তরে জুয়েল রানা বলেন, যখন দূষিত বায়ু কেউ নিশ্বাসের মাধ্যমে নেয়, তখন শরীরের মধ্যে একধরনের প্রদাহ তৈরি হয়। মানুষের শরীরে যে ইনসুলিন তৈরি হয়, তার কার্যকারিতা কমে আসে। আর ব্যাহত হলে রক্তে শর্করার পরিমাণ নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়ে। আর নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়লেই ডায়াবেটিস বেড়ে যায়।

গবেষণায় দেখা গেছে, বাতাসে পিএম ২.৫ যদি ১০ ইউনিট বাড়ে, তাহলে ডায়াবেটিস হওয়ার ঝুঁকি প্রায় ১০ শতাংশ বেড়ে যায়। যেসব এলাকায় বাতাস সবচেয়ে দূষিত, সেখানে ডায়াবেটিসের হারও সবচেয়ে বেশি। মহিলা, ওজন বেশি, উচ্চ রক্তচাপ আছে, বয়স বেশি এবং যাঁরা শহরে থাকেন, তাঁদের ক্ষেত্রে বায়ুদূষণজনিত ডায়াবেটিসের ঝুঁকি আরও বেশি। যেমন ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, নরসিংদীর মতো জেলাগুলোয় বায়ুদূষণ ও ডায়াবেটিস—দুটিই একসঙ্গে বেশি দেখা গেছে।

যদি বাংলাদেশ সরকার বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্ধারিত মান অর্জন করতে পারে, তাহলে দেশে ডায়াবেটিসের হার ৫ থেকে ৮ শতাংশ পর্যন্ত কমানো সম্ভব। বিশেষ করে নারী, বয়স্ক মানুষ, শহরের বাসিন্দা, স্থূল ও উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকিতে থাকা মানুষ সুফল পাবেন সবচেয়ে বেশি হবে।

সরকারের নির্ধারিত বায়ুমান লক্ষ্য (১৫ মাইক্রোগ্রাম প্রতি ঘনমিটারে) অর্জন করা গেলে দেশের ২৫টি জেলায় ডায়াবেটিস কমার হার জাতীয় গড় (৬ দশমিক ৬ শতাংশ) থেকেও বেশি হতে পারে। সবচেয়ে বেশি উপকার দেখা গেছে সেই জেলাগুলোয়, যেখানে ডায়াবেটিসের হার বেশি এবং একই সঙ্গে বায়ুদূষণের মাত্রাও অত্যন্ত বেশি। যেমন নারায়ণগঞ্জে ডায়াবেটিস কমার সম্ভাবনা প্রায় ১৬ দশমিক ৭ শতাংশ। যেসব জেলায় এই স্বাস্থ্যগত লাভ বেশি হতে পারে, সেসব এলাকায় বায়ুদূষণের উৎসও আলাদা ধরনের। এর মধ্যে রয়েছে যানবাহন ও শিল্পকারখানার ধোঁয়া, ইটভাটা, বন্দরভিত্তিক দূষণ, খনিশিল্প, সীমান্ত পেরিয়ে আসা দূষণ, কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং জাহাজভাঙাশিল্প। কিছু এলাকায় বায়ুদূষণের মাত্রা জাতীয় গড়ের কাছাকাছি হলেও স্বাস্থ্যগত লাভ বেশি হতে পারে।

২৬ কোটির বেশি কর্মদিবস নষ্ট হয় দূষণে

আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর রিসার্চ অন এনার্জি অ্যান্ড ক্লিন এয়ার (ক্রিয়া) বাংলাদেশের বায়ুদূষণ নিয়ে একটি গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। ‘বাংলাদেশে সূক্ষ্ম কণাদূষণের জনস্বাস্থ্য প্রভাব’ শীর্ষক এই প্রতিবেদন গত বছরের ১৮ জানুয়ারি ক্রিয়ার নিজস্ব ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়। গবেষণাটি পরিচালনা করেন ড্যানিয়েল নেসান, হুবার্ট থিয়েরিও ও জেমি কেলি। সম্পাদক ছিলেন জোনাথন সাইডম্যান।

গবেষণায় দেখা যায়, বর্তমান পিএম ২.৫ দূষণের কারণে বাংলাদেশে বছরে প্রায় ১ লাখ ২ হাজার ৪৫৬ জনের অকালমৃত্যু ঘটছে। এর বড় অংশই হৃদ্‌রোগ, স্ট্রোক, দীর্ঘস্থায়ী শ্বাসতন্ত্রের রোগ, নিম্ন শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ ও ফুসফুস ক্যানসারের সঙ্গে সম্পর্কিত। পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের মধ্যে শুধু নিম্ন শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণেই বছরে প্রায় ৫ হাজার ২৫৮ জনের মৃত্যু হচ্ছে।

এ ছাড়া বছরে প্রায় ৬ লাখ ৬৮ হাজার হাঁপানিজনিত রোগে জরুরি বিভাগে ভর্তি, প্রায় ২৬ কোটির বেশি কর্মদিবস নষ্ট, ৯ লাখের বেশি অপরিণত (সময়ের আগে) জন্ম এবং প্রায় ৭ লাখ কম ওজনের নবজাতকের জন্মের সঙ্গে সূক্ষ্ম কণাদূষণের সম্পর্ক পাওয়া গেছে।

গবেষণায় দেখা যায়, বর্তমান পিএম ২.৫ দূষণের কারণে বাংলাদেশে বছরে প্রায় ১ লাখ ২ হাজার ৪৫৬ জনের অকালমৃত্যু ঘটছে। এর বড় অংশই হৃদ্‌রোগ, স্ট্রোক, দীর্ঘস্থায়ী শ্বাসতন্ত্রের রোগ, নিম্ন শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ ও ফুসফুস ক্যানসারের সঙ্গে সম্পর্কিত।

গবেষণাটি বলছে, যদি বাংলাদেশ তার নিজস্ব জাতীয় মান (ঘনমাত্রা ৩৫ মাইক্রোগ্রাম প্রতি ঘনমিটারে) অর্জন করতে পারে, তবে অকালমৃত্যু প্রায় ১৯ শতাংশ কমতে পারে। আর বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০২১ সালের নির্দেশিকা (৫ মাইক্রোগ্রাম প্রতি ঘনমিটারে) অর্জিত হলে মৃত্যুহার প্রায় ৭৯ শতাংশ পর্যন্ত কমানো সম্ভব।

গবেষণায় বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, ঢাকা ও চট্টগ্রাম বিভাগে দূষণজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকি সবচেয়ে বেশি হলেও দেশের কোনো অঞ্চলই নিরাপদ সীমার মধ্যে নেই। সুতরাং কঠোর বায়ুমান নিয়ন্ত্রণ ও কার্যকর নীতিমালা বাস্তবায়ন ছাড়া এই স্বাস্থ্যসংকট মোকাবিলা সম্ভব নয়।

বায়ুদূষণ ও মানসিক স্বাস্থ্যঝুঁকি: দুই শহরের গল্প

বায়ুদূষণ যে শ্বাসতন্ত্র ও হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি বাড়ায়, তা আগে থেকেই প্রতিষ্ঠিত। তবে সাম্প্রতিক এক গবেষণা দেখিয়েছে, সূক্ষ্ম দূষিত কণা (পিএম ২.৫) মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও গভীর প্রভাব ফেলছে, বিশেষ করে ঢাকার মতো উচ্চ দূষণপ্রবণ নগরে। ‘এয়ার পলিউশন অ্যান্ড মেন্টাল হেলথ ইন ঢাকা অ্যান্ড রাজশাহী’ শীর্ষক এ গবেষণায় ঢাকা ও রাজশাহীর তুলনামূলক বিশ্লেষণের মাধ্যমে বায়ুদূষণ ও বিষণ্নতা, উদ্বেগ এবং মানসিক চাপের সম্পর্ক খতিয়ে দেখা হয়েছে। বিশ্বখ্যাত নেচার সাময়িকীতে এ গবেষণা প্রকাশিত হয়েছে চলতি বছরের ২৬ জানুয়ারি।

গবেষণাটি ২০২২ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত পরিচালিত একটি ক্রস-সেকশনাল পর্যবেক্ষণভিত্তিক সমীক্ষা। দুই শহর থেকে প্রাপ্তবয়স্ক অংশগ্রহণকারী নির্বাচন করা হয় নির্দিষ্ট মানদণ্ড অনুসরণ করে। সরাসরি সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে মানসিক স্বাস্থ্যসংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ করা হয়।

বায়ুদূষণের তথ্য নেওয়া হয় সরকারি পরিবেশ পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের উপাত্ত থেকে। গড় বার্ষিক পিএম ২.৫ মাত্রা ছিল ঢাকায় প্রায় ৭৬–৮২ মাইক্রোগ্রাম/ঘনমিটার আর রাজশাহীতে প্রায় ৪২–৪৮ মাইক্রোগ্রাম/ঘনমিটার। অর্থাৎ ঢাকায় সূক্ষ্ম দূষিত কণার মাত্রা রাজশাহীর তুলনায় প্রায় ১.৭ গুণ বেশি।

গবেষণায় দেখা যায়, ঢাকায় ৪৬–৫০ শতাংশ অংশগ্রহণকারীর মধ্যে মাঝারি থেকে তীব্র বিষণ্নতার উপসর্গ পাওয়া গেছে। রাজশাহীতে এ হার ছিল ২৮ থেকে ৩২ শতাংশ। অর্থাৎ ঢাকায় বিষণ্নতার হার অন্তত ১৫ থেকে ১৮ শতাংশ বেশি।

গবেষণা অনুযায়ী ঢাকায় ৪০ থেকে ৪৪ শতাংশ অংশগ্রহণকারীর মধ্যে উদ্বেগ দেখা গেছে। কিন্তু রাজশাহীতে বিষণ্নতা দেখা গেছে ২৫ থেকে ২৯ শতাংশ ব্যক্তির মধ্যে। রিগ্রেশন বিশ্লেষণে দেখা যায়, পিএম ২.৫ মাত্রা প্রতি ১০ মাইক্রোগ্রাম/ঘনমিটার বৃদ্ধিতে উদ্বেগ স্কোর ০.৮ থেকে ১.২ পয়েন্ট পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়, অন্যান্য সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভাবক নিয়ন্ত্রণের পরও।

খুলনা নগরীর শিপইয়ার্ড সড়কে উড়ছে ধুলা। রক্ষা পেতে মুখে কাপড় দিয়ে যাচ্ছেন এক পথচারী। লবণচরা, খুলনা, ২৫ ফেব্রুয়ারি

ঢাকায় মানসিক চাপ ৩৫ থেকে ৩৮ শতাংশ মানুষের মধ্যে। রাজশাহীতে এই হার ২০ থেকে ২৩ শতাংশ। গবেষণায় ব্যবহৃত মাল্টিভেরিয়েট রিগ্রেশন মডেলে দেখা গেছে, উচ্চ দূষণপ্রবণ এলাকায় বসবাসকারীদের মাঝারি–তীব্র বিষণ্নতায় আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা ১.৬ থেকে ১.৯ গুণ বেশি। বয়স, আয়, শিক্ষা ও ধূমপানের মতো ভেরিয়েবল নিয়ন্ত্রণ করার পরও এই সম্পর্ক তাৎপর্যপূর্ণ থাকে। নারী, নিম্ন আয়ের মানুষ ও বয়স্কদের ক্ষেত্রে প্রভাব তুলনামূলকভাবে বেশি পাওয়া গেছে।

গবেষণায় স্পষ্টভাবে দেখা যায়, ঢাকার উচ্চমাত্রার বায়ুদূষণ শুধু শারীরিক স্বাস্থ্য নয়, মানসিক স্বাস্থ্যঝুঁকিও বাড়াচ্ছে। রাজশাহীর তুলনায় ঢাকায় বিষণ্নতা, উদ্বেগ ও মানসিক চাপের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি এবং এই পার্থক্য পরিসংখ্যানগতভাবে প্রতিষ্ঠিত।

নিজের অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, দূষণের প্রভাবে আগে শ্বাসকষ্ট বা অ্যাজমার রোগী যেমন ছিল গত দুই–তিন বছরে তা অনেক বেড়েছে। এ সংখ্যা বাড়ছেই।
রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের রেসপেরটরি মেডিসিন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক রেজাউল ইসলাম

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার উপাত্তের ভিত্তিতে ২০১৬ সালের ১৬ জুন যুক্তরাজ্যের দ্য গার্ডিয়ান পত্রিকায় প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, রাজশাহীর বাতাসে ভাসমান ক্ষুদ্র ধূলিকণা (১০ মাইক্রোমিটার আকারের) প্রতি ঘনমিটার বাতাসে ছিল ১৯৫ মাইক্রোগ্রাম। এটা প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ কমে ২০১৬ সালে দাঁড়ায় ৬৩ দশমিক ৯ মাইক্রোগ্রামে। দুই বছর আগে এ শহরে আরও ক্ষুদ্র ধূলিকণা (২ দশমিক ৫ মাইক্রোমিটার আকারের) প্রতি ঘনমিটার বাতাসে ছিল ৭০ মাইক্রোগ্রাম। ২০১৬ সালে এটি প্রায় অর্ধেক হয়ে দাঁড়ায় ৩৭ মাইক্রোগ্রাম।

ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, বিশ্বের যে ১০টি শহরে গত (২০১৫ ও ২০১৪) দুই বছরে বাতাসে ভাসমান ক্ষুদ্র ধূলিকণা কমেছে, এর মধ্যে রাজশাহীতে কমার হার সবচেয়ে বেশি। এর পরিমাণ ৬৭ শতাংশ।

সেই উদাহরণ সৃষ্টিকারী শহরের বায়ুদূষণ এখন প্রবল আর এতে মানুষের ওপর প্রভাবও পড়ছে ব্যাপক হারে, এমনটাই মনে করেন রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের রেসপেরটরি মেডিসিন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক রেজাউল ইসলাম। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘নিজের অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, দূষণের প্রভাবে আগে শ্বাসকষ্ট বা অ্যাজমার রোগী যেমন ছিল গত দুই–তিন বছরে তা অনেক বেড়েছে। এ সংখ্যা বাড়ছেই।

হৃদ্‌রোগজনিত মৃত্যুঝুঁকি বাড়ছে

ঢাকায় বায়ুদূষণের সূক্ষ্ম কণা (পিএম ২.৫) যত বাড়ছে, হৃদ্‌রোগে মৃত্যুঝুঁকিও তত বাড়ছে—এমনটাই প্রমাণ করেছে ‘ইফেক্টস অব ফাইন পার্টিকুলেট ম্যাটার এয়ার পলিউশন অন কার্ডিওভাসকুলার মর্টালিটি ইন ঢাকা ২০০২–২০২৪’ শীর্ষক গবেষণা।

২০২০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত পাঁচ বছরের তথ্য বিশ্লেষণ করে গবেষকেরা দেখেছেন, পিএম ২.৫ প্রতি ১০ মাইক্রোগ্রাম/ঘনমিটার বৃদ্ধি পেলে একই মাসে হৃদরোগজনিত মৃত্যু গড়ে ৩.১ শতাংশ বাড়ে। এখানে মোট হৃদ্‌রোগজনিত মৃত্যুর প্রায় ১৬ শতাংশ এই দূষণের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। শীতকালে ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি। এ সময়ে প্রায় ২৮.৭ শতাংশ হৃদ্‌রোগজনিত মৃত্যু পিএম ২.৫-এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। অর্থাৎ, বায়ুদূষণ ঢাকায় হৃদ্‌রোগের একটি বড় এবং তাৎক্ষণিক ঝুঁকির কারণ।

গবেষকেরা ২০২০–২০২৪ সময়ে ঢাকার চারটি প্রধান সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে মাসভিত্তিক হৃদ্‌রোগজনিত মৃত্যুর তথ্য সংগ্রহ করেন। একই সময়ের পিএম ২.৫ মাত্রার উপাত্ত নেওয়া হয় পরিবেশ অধিদপ্তর থেকে। আবহাওয়া–সংক্রান্ত তথ্য (তাপমাত্রা, আর্দ্রতা ইত্যাদি) সংগ্রহ করা হয় নাসা পাওয়ার প্রকল্প থেকে, যাতে আবহাওয়ার প্রভাব বিশ্লেষণে নিয়ন্ত্রণ করা যায়।

মোট মৃত্যু ও ঝুঁকির পরিমাণ

গবেষণার ব্যাপ্ত সময়ে মোট ১৭ হাজার ৫৩১টি হৃদ্‌রোগজনিত মৃত্যু নথিভুক্ত হয়। বিশ্লেষণে দেখা যায়, পিএম ২.৫ মাত্রা প্রতি ১০ মাইক্রোগ্রাম/ঘনমিটার বৃদ্ধি পেলে একই মাসে হৃদ্‌রোগজনিত মৃত্যু ৩.১ শতাংশ বৃদ্ধি পায় (৯৫ শতাংশ বিশ্বাসযোগ্যতা সীমা: ১.১ শতাংশ থেকে ৫.২ শতাংশ)। অর্থাৎ এই সম্পর্কটি পরিসংখ্যানগতভাবে তাৎপর্যপূর্ণ।

গবেষণার অনুমান অনুযায়ী, মোট হৃদ্‌রোগজনিত মৃত্যুর প্রায় ১৬ শতাংশ পিএম ২.৫ এক্সপোজারের সঙ্গে সম্পর্কিত। অর্থাৎ দূষণমাত্রা কমানো গেলে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক অকালমৃত্যু প্রতিরোধ সম্ভব।

ঋতুভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, শীতকালে পিএম ২.৫-এর প্রভাব বেশি তীব্র। শীতকালে হৃদ্‌রোগজনিত মৃত্যুর ২৮.৭ শতাংশ পিএম ২.৫-এর সঙ্গে সম্পর্কিত, যেখানে গরমকালে এই হার ছিল মাত্র ৭.১৫ শতাংশ। অর্থাৎ দূষণ ও নিম্ন তাপমাত্রার সম্মিলিত প্রভাবে শীতকালে স্বাস্থ্যঝুঁকি বহুগুণে বাড়ে।

ডেঙ্গুর মৃত্যুহার বাড়াচ্ছে দূষণ

ডেঙ্গুতে মৃত্যুর সঙ্গে যে বায়ুদূষণের সম্পর্ক আছে, তা উঠে এসেছে সাম্প্রতিক এক বৈশ্বিক গবেষণায়। এনভায়রনমেন্টাল পলিউশন সাময়িকীতে গত ২৯ জানুয়ারি এই গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়েছে। বাংলাদেশি বিজ্ঞানী শাকিরুল খান এ গবেষণার নেতৃত্ব দেন। তিনি জাপানের ওইতা ইউনিভার্সিটির গ্লোবাল অ্যান্ড লোকাল ইনফেকশাস ডিজিজ সেন্টারে শিক্ষকতা করছেন। গবেষণায় যুক্ত ছিলেন বাংলাদেশ ও জাপানের ১২ জন বিজ্ঞানী।

গবেষণায় দেখা যায়, বাংলাদেশসহ যেসব দেশে বায়ুদূষণ বেশি, সেসব দেশে ডেঙ্গুতে মৃত্যুহার বিশ্বের গড় মৃত্যুহারের চেয়ে অনেক বেশি। আবার এসব দেশের যেসব এলাকা বেশি দূষিত, মৃত্যুহারও সেসব এলাকায় বেশি।

গবেষণায় বাতাসে থাকা অতিক্ষুদ্র ধূলিকণা বা পিএম ২.৫ এবং দূষণকারী অন্যান্য উপাদানের সঙ্গে ডেঙ্গু রোগীর জটিলতা এবং মৃত্যুঝুঁকির পরিসংখ্যানগতভাবে শক্তিশালী সম্পর্ক পাওয়া গেছে। বায়ুদূষণের কারণে মানুষের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়ে, ফুসফুস ও রক্তনালিতে প্রদাহ বাড়ে। এর ফলে ডেঙ্গু সংক্রমণ আরও মারাত্মক রূপ নিতে পারে বলে গবেষকেরা ব্যাখ্যা করেছেন।

২০২০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার ডেঙ্গুপ্রবণ ২০টি দেশে গবেষণাটি পরিচালনা করা হয়। জাতীয় পর্যায়ে ডেঙ্গুর তথ্যের সঙ্গে স্যাটেলাইটের মাধ্যমে পাওয়া পিএম ২.৫–এর মান এবং সামাজিক–অর্থনৈতিক ও জলবায়ুগত সূচক একত্র করে এ গবেষণা করা হয়। দীর্ঘমেয়াদি পিএম ২.৫–এর সংস্পর্শ ও ডেঙ্গুজনিত মৃত্যুহারের সম্পর্ক বিশ্লেষণে ‘জেনারালাইজড লিনিয়ার মিক্সড–ইফেক্টস মডেল’ ব্যবহার করা হয়েছে।

গবেষণার প্রধান লেখক শাকিরুল খান প্রথম আলোকে বলেন, ‘এটি প্রথম বৈশ্বিক গবেষণা, যেখানে প্রমাণ করা হয়েছে যে বায়ুদূষণের কারণে ডেঙ্গু যেমন ছড়িয়ে পড়ে, তেমনি মৃত্যুঝুঁকিও বেড়ে যায়। আমরা দেখেছি, দূষণপ্রবণ দেশগুলোয় ডেঙ্গু তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি প্রাণঘাতী। ডেঙ্গু মোকাবিলায় আমরা এত দিন মূলত মশা নিয়ন্ত্রণের দিকেই গুরুত্ব দিয়েছি। কিন্তু এই গবেষণা দেখাচ্ছে, বায়ুদূষণ কমানোও ডেঙ্গুজনিত মৃত্যু কমানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশল হতে পারে।’

বৃষ্টি কমে আসা ও উষ্ণতর শীত

শুধু দূষণ নয়, জলবায়ুর পরিবর্তনও পরিস্থিতিকে জটিল করছে। বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের দীর্ঘমেয়াদি বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত এক দশক বা তার বেশি সময়ে শুষ্ক মৌসুমে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ কমছে, শীতের তীব্রতা হ্রাস পাচ্ছে, মৌসুমি ধরন বদলাচ্ছে।

সাম্প্রতিক উপাত্ত বলছে, ২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে ৩৭ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। অথচ এ মাসে সাধারণত ৪২ দশমিক ৪ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়ে থাকে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে বৃষ্টি হয়েছিল ৩ মিলিমিটার। অথচ এ মাসে স্বাভাবিক বৃষ্টির পরিমাণ ৯ মিলিমিটার। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে স্বাভাবিকের চেয়ে ৯৮ শতাংশ কম বৃষ্টি হয়েছে। চলতি ২০২৬ সালের জানুয়ারি মাস বৃষ্টিশূন্য ছিল। অথচ জানুয়ারিতে সাধারণত ৯ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়।

শীতকালে বৃষ্টি কম হলে বাতাসে জমে থাকা দূষিত কণিকা ধুয়ে নামার সুযোগ কমে যায়। ফলে উচ্চমাত্রার দূষণ দীর্ঘ সময় স্থায়ী হয়। আবহাওয়া অধিদপ্তরের বিশেষজ্ঞদের মতে, পশ্চিমা বায়ুপ্রবাহ, তাপমাত্রার উল্লম্ব স্তরবিন্যাস ও কম আর্দ্রতা—সব মিলিয়ে শীতকালে দূষণ আটকে থাকে।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ মো. বজলুর রশীদ দীর্ঘ সময় ধরে দেশের জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব নিয়ে কাজ করছেন। তিনি গবেষণার তথ্য তুলে ধরে বলেন, দুই দশক ধরেই বিশেষ করে দেশের মধ্যাঞ্চল, উত্তর–পূর্বাঞ্চল ও উত্তরাঞ্চলে কমছে শীতের দিনের সংখ্যা। বাড়ছে উষ্ণতা। বায়ুদূষণে এর প্রভাব পড়ছে।

রাজশাহী নগরীতে বেড়েছে বায়ুদূষণের পরিমাণ। নগরের রেলগেট এলাকা থেকে ২৫ ফেব্রুয়ারি তোলা

দূষণ যেভাবে শরীর ক্ষয় করছে

এ প্রতিবেদন শুরু হয়েছিল রাজধানীর আগারগাঁওয়ের টিবি হাসপাতালের চিত্র তুলে ধরে। হাসপাতালের পরিচালক আয়েশা সিদ্দিকা প্রথম আলোকে বলেন, ‘এবার যে রোগী ভর্তি হয়েছে, তা গত পাঁচ বছরে হয়নি। দিন দিন রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। এখানে আসা রোগীরা কাছাকাছি এলাকার। কিন্তু এ অবস্থা রাজধানীর সর্বত্র। অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, দেশেরও সর্বত্র।’

খ্যাতনামা বক্ষব্যাধি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক আসিফ মুজতবা মাহমুদ বলেন, দূষিত বায়ু সরাসরি ফুসফুসের মধ্যে যায়। ফুসফুসের একটা স্বাভাবিক প্রতিরোধব্যবস্থা রয়েছে। তার মধ্যে অনেকগুলো কোষ আছে যেগুলো এই সমন্বিত প্রতিরোধব্যবস্থা গড়ে তোলে। পিএম ২.৫–সহ নানা ধরনের দূষক যখন ফুসফুসে যায়, তখন কর্মরত কোষের ক্ষতি ঘটিয়ে থাকে। স্বাভাবিক যে অক্সিজেনের প্রবেশ ও কার্বন ডাই–অক্সাইড বের হয়ে যাওয়ার প্রক্রিয়া, তা ব্যাহত হয়। ফলে শুধু ফুসফুস নয়, হৃৎপিণ্ড, অগ্ন্যাশয় ক্ষতিগ্রস্ত করার পাশাপাশি ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়ায়। এতে মস্তিষ্কের ওপরও প্রভাব পড়ে।

দূষণ কেবল পরিবেশের বিষয় নয়; শ্বাসকষ্টের রোগীর সঙ্গে এখন হৃদ্‌রোগ, ডায়াবেটিস, মানসিক চাপ—সব মিলিয়ে জটিল স্বাস্থ্যচিত্র তৈরি হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, যানবাহনের ধোয়া নির্গমন নিয়ন্ত্রণ, শিল্পকারখানায় মানদণ্ড কঠোর করা, ইটভাটা সংস্কার, পরিচ্ছন্ন জ্বালানি ও নগর সবুজায়ন—সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া পরিস্থিতি বদলানো কঠিন। একই সঙ্গে জলবায়ু অভিযোজন ও শুষ্ক মৌসুমে দূষণ ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা জাতীয় স্বাস্থ্যনীতির অংশ হওয়া প্রয়োজন।

ডা. আয়েশা সিদ্দিকা বললেন, ‘রোগী আসছেন চিকিৎসা দিচ্ছি। ওষুধ তো আছে, কিন্তু বাতাস? তাকে শুদ্ধ করবে কে?’

প্রশ্নটি শুধু এক চিকিৎসকের নয়—এটি এক শহরের, এক দেশের। প্রতিদিনের নিশ্বাসে যদি অদৃশ্য ঝুঁকি ঢুকে পড়ে, তবে স্বাস্থ্যব্যবস্থা যতই শক্তিশালী হোক, সংকট কমবে না। দূষণ ও জলবায়ু পরিবর্তন—এই দুই সংকটকে মাথায় রেখেই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।