
মৌসুমি ফুলের বাগানে বিচিত্র রঙের সমারোহ থাকলেও তাতে নীল রঙের উপস্থিতি তুলনামূলকভাবে কম। এ কারণে নীল রঙের কর্নফ্লাওয়ার খুব সহজেই আমাদের নজর কাড়ে। অবশ্য নীল লুপিন ও অ্যাস্টারও এ ক্ষেত্রে অনেক বড় ভূমিকা রাখে। শীতকালে ঢাকার বিভিন্ন পার্ক, উদ্যান ও অফিস প্রাঙ্গণে কর্নফ্লাওয়ার চোখে পড়ে। একসঙ্গে অনেক ফুলের বেড করা হয় বলে দূর থেকেই সাদা, নীল ও গোলাপি রঙের ফুলগুলো সবাইকে আকৃষ্ট করে। আমাদের দেশে তিন রঙের ফুলের মধ্যে নীল কর্নফ্লাওয়ার মোটামুটি সহজলভ্য। ঢাকায় রমনা পার্ক, কার্জন হল প্রাঙ্গণ, জাতীয় জাদুঘর ও অন্যান্য মৌসুমি ফুলের বাগানে এ ফুল দেখা যায়।
কর্নফ্লাওয়ার বর্ষজীবী উদ্ভিদ। ইউরোপে সহজলভ্য। বুনো কর্নফ্লাওয়ারের একটি আদি জাত ইউরোপ ও ব্রিটিশ দ্বীপপুঞ্জে দেখা যায়। ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ডসের বুনো নীল ফুলের প্রজাতি থেকেই বর্তমান উন্নত প্রকরণভেদগুলোর উৎপত্তি। বিভিন্ন উদ্যানে প্রাকৃতিক তারতম্যে এদের জাতের ভিন্নতা দেখা যায়। পৃথিবীতে নীল রং ছাড়াও গোলাপি, মেরুন, বেগুনি ও সাদা রঙের কর্নফ্লাওয়ার চোখে পড়ে। গাছ ৮০ থেকে ৯০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত উঁচু হয়। তবে ছোট জাতের গাছগুলো ৩০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত উঁচু হতে পারে। পাতা সরু, লম্বাটে। বামন জাতের বিন্দু বিন্দু ছোপওয়ালা গাছও আকর্ষণীয় ফুলের জন্য বিখ্যাত।
কর্নফ্লাওয়ার (Centaurea cyanus) সাধারণত কাটফ্লাওয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়। গাছের নিচের দিকের পাতাগুলো সাধারণত দেখা যায় না। কম বৃষ্টিপাতের অঞ্চলে বীজ বপনের সময় জুন-জুলাইয়ের আগেও হতে পারে। পাহাড়ি অঞ্চলে মার্চ-এপ্রিল এবং আগস্ট থেকে অক্টোবরের মধ্যে বীজ বপন করতে হয়। বীজ কোনো স্থায়ী জায়গায়ও সরাসরি বপন করা হয়। বীজ বোনার তিন থেকে সাড়ে তিন মাসের মধ্যে গাছে ফুল ফোটে।
কর্নফ্লাওয়ার আমাদের দেশে যত্নের সঙ্গে চাষ করা হলেও ইউরোপের নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চলে প্রাকৃতিকভাবে জন্মে। গাছটিকে সেখানকার গম বা তেলবীজের খেতে ক্ষতিকর আগাছা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। একটি কর্নফ্লাওয়ারগাছ শীতকালীন তেলবীজ এবং গমখেতে হেক্টরপ্রতি ৩০ কেজি পর্যন্ত ফলন হ্রাস করতে পারে বলে মনে করা হয়। একেকটি কর্নফ্লাওয়ারগাছে প্রায় ৮০০ বীজ থাকে। এ কারণে গাছটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে।
কর্নফ্লাওয়ারে মধু থাকায় নানা রকম কীটপতঙ্গ ভিড় জমায়। প্রতিদিন একেকটি ফুলে পর্যাপ্ত পরিমাণ মধু উৎপাদনের সক্ষমতা থাকায় মৌমাছি পালনকারীদের কাছে প্রজাতিটি অত্যন্ত সমাদৃত। এ গাছ একধরনের উদ্বায়ী পদার্থ উৎপন্ন করতে পারে, যা বাঁধাকপির খেতে মথ (Mamestra brassicae) নিয়ন্ত্রণে কীটনাশকের বিকল্প হিসেবে রোপণের পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল। মাঠপর্যায়ের পরীক্ষায় দেখা গেছে, বাঁধাকপির খেতে প্রতি বর্গমিটারে একটি কর্নফ্লাওয়ারগাছ রোপণ করলে সেখানে মথের আক্রমণ নিয়ন্ত্রিত থাকে এবং ফলন ভালো হয়।
কর্নফ্লাওয়ার ফুল কাঁচা, শুকনা বা রান্না করে খাওয়া যায়। খাবারে রং যোগ করার জন্য ব্যবহার করা হয়। পাশাপাশি এর শুকনা পাপড়ি মসলা হিসেবে খাবারে ব্যবহারের প্রচলন রয়েছে। কাঁচা বা শুকনা পাপড়ি সালাদ, পানীয় ও মিষ্টান্নেও ব্যবহার করা যেতে পারে। এ ছাড়া শুকনা পাপড়ি চা ও অন্যান্য পানীয়তেও ব্যবহার্য। পাতা, বীজ ও ফুলের মাথা ভেষজ চিকিৎসায় কার্যকর। বিশেষ করে ফুলের মাথা থেকে সংগৃহীত নির্যাস চোখের ছোটখাটো প্রদাহের চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়।
জন্মস্থানে ফুলটির নানামাত্রিক ব্যবহারের উল্লেখ রয়েছে। প্রচলিত লোকমত থেকে জানা যায়, একসময় প্রেমে পড়া যুবকেরা কর্নফ্লাওয়ার পরত; যদি ফুলটি খুব দ্রুত বিবর্ণ হয়ে যেত, তবে তা পুরুষের ভালোবাসা ফিরে না পাওয়ার লক্ষণ হিসেবে বিবেচনা করা হতো। নীল কর্নফ্লাওয়ার জার্মানির জাতীয় প্রতীকগুলোর মধ্যে একটি।