গাছে আশ্রয় নিয়েছে নানান জাতের পাখি। মৌলভীবাজারের বড়লেখা উপজেলার হাল্লা গ্রামের পাখিবাড়িতে। সম্প্রতি তোলা
গাছে আশ্রয় নিয়েছে নানান জাতের পাখি। মৌলভীবাজারের বড়লেখা উপজেলার হাল্লা গ্রামের পাখিবাড়িতে। সম্প্রতি তোলা

বড়লেখার হাল্লা গ্রামের অন্য রকম ‘পাখিবাড়ি’ 

উত্তর-দক্ষিণে লম্বা একতলা বাড়ি, অর্ধেক অংশে টিনের ছাউনি, বাকিটুকুতে ছাদ। তিন ভাইয়ের লাগোয়া বাড়ি, লম্বাটে উঠান। পানকৌড়ি আর বক পাখিরা মলত্যাগ করে রাঙিয়ে রেখেছে উঠানের পুরো জমিন।

আমাদের দেখে ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন বাড়ির মালিকদের একজন—নাম আক্তার আহম্মদ শিবু। পরিচয় পেয়ে জোর করে ঘরের ভেতরে নিয়ে বসালেন। শিবু মরহুম মনোহর আলী মাস্টারের ছয় ছেলের একজন। লুঙ্গি পরা, খালি গায়ে কাঠের চৌকিতে বসে ছিলেন। তালপাখা নিয়ে এলেন বাতাস করতে। বারণ সত্ত্বেও ভেতরে গিয়ে চা বানানোর জন্য বলে এলেন।

ঘণ্টাখানেক আগেই এই বাড়িতে ঢুকেছি। বাড়িটির নাম ‘পাখিবাড়ি’। হাকালুকি হাওর এলাকায় মেছো বিড়াল সংরক্ষণ কার্যক্রম তদারকি করতে গত ২৯ আগস্ট পাখিবাড়ি পরিদর্শন করি। বড়লেখা উপজেলার হাল্লা গ্রামের মূল সড়ক ফেলে ইট বিছানো রাস্তায় নামতেই সামনে পড়ল বর্ষার পানি। প্যান্ট গুটিয়ে হাঁটুপানি ভেঙে যখন এই বাড়ির পথ ধরি, তখন দুপুর ১২টার কাছাকাছি।

কাদাপানির রাস্তা ধরে হাঁটতে হাঁটতে যেন আমার শৈশব ফিরে পেলাম। বর্ষার গ্রাম, চারপাশে টলটলে পানিতে মাথা জাগিয়ে শাপলার চওড়া হাঁসি, পানি নেমে গিয়ে ফেলে যাওয়া কাদাময় রাস্তা, রাস্তার দুই পাশজুড়ে ঠাসা কচুরিপানার সবুজ জলাভূমি। এ তো বাংলার এক নিখাদ গ্রামের ছবি। 

এমনই এক গ্রামীণ আবহে নিজের বেড়ে ওঠার অমূল্য স্মৃতি ভেসে উঠল। শৈশবে দলবলে পানিতে সাঁতার কাটা, ছিপ ফেলে পুঁটি মাছ ধরা কিংবা কাদাপানি মাড়িয়ে স্কুলে যাওয়ার সেই দিনগুলো হাল্লা গ্রামে এসে দেখতে পেলাম।

পাখিবাড়ির বাসিন্দা দুই ভাই শিবু ও স্বপন

প্রায় আড়াই একর জায়গাজুড়ে বিস্তৃত পাখিবাড়ির চারপাশ নানা জাতের গাছপালায় আচ্ছাদিত। বাড়িতেই ঢুকতেই নাকে এল তীব্র ভোঁটকা গন্ধ। বাতাসে পাখির ছানাপোনাদের বিরতিহীন কিচিরমিচির। তীব্র রোদ, বাতাস নেই, ভ্যাপসা গরম। 

হাল্লা গ্রামের পাখিবাড়িটি আর দশটা বাড়ি থেকে আলাদা। বাড়ির দক্ষিণ পাশের রাস্তা লাগোয়া হাকালুকি হাওরের কৈয়ারকোনা বিল। সারা দিন মাছ শিকার করে বিলের কয়েক হাজার পানকৌড়ি আর বক পাখিরা মনোহর মাস্টারের বাড়ির গাছপালায় এসে আশ্রয় নেয়, নিরাপদে রাত কাটায়।

পাখির কিচিরমিচিরের সঙ্গে মনোহর মাস্টার নিজের জীবনের সুর খুঁজে পেয়েছিলেন। তাই প্রতিবেশীদের আপত্তি সত্ত্বেও তিনি পরম মমতায় পাখিদের আশ্রয় দেন। চল্লিশোর্ধ্ব শিবু জানালেন, জন্মের পর থেকেই বাড়িতে পাখি দেখে এসেছেন তাঁরা। পাখির সঙ্গেই বেড়ে উঠেছেন। ২০০৯ সালে বাবা মারা যাওয়ার সময় ছেলেদের বলে গেছেন, ‘তোমাদের সঙ্গে পাখিরাও এ বাড়ির উত্তরাধিকার।’ এভাবে একদিন মাস্টারবাড়ি পাখিবাড়ি নামে পরিচিত হয়ে ওঠে।

নানা জাতের বড়, মাঝারি গাছপালা আছে পাখি বাড়িতে। এর মধ্যে হিজল, করচ, বরুণ, কড়ই, কদম অন্যতম। দু–একটি নারকেলগাছও আছে। সব গাছভর্তি বক আর পানকৌড়ি পাখি। প্রতিটি ডালে বক-পানকৌড়ির একাধিক ছানা। ছানারা মাথা উঁচু করে একে অপরকে ছাড়িয়ে মুখ হাঁ করে খাবারের জন্য অপেক্ষা করছে। 

কৈয়ারকোনা বিল থেকে মা ও বাবা পাখিরা মাছ নিয়ে এলেই ছানারা অস্থির হয়ে পড়ে। কে আগে খাবার নেবে—এ নিয়ে ছানাদের মধ্যে শুরু হয় যুদ্ধ। একটু দেরি হলেই মা-বাবাদের মুখে, গায়ে, পালকে অনবরত ঠোকর মারতে থাকে ছানারা। মা ও বাবা পাখিরা নিজের পাকস্থলীর শেষ টুকরা মাছ নিংড়ে ছানাদের মুখে ঢেলে দেয়।

গাছের ওপর থেকে অনবরত পাখির মল পড়ছে নিচে। আমার গায়ের জামা ও ক্যামেরা সাদা হয়ে গেল কিছুক্ষণের মধ্যে। নিচের মাটি, গাছের পাতা, ঘরের ছাউনি-ছাদ, বাড়ির উঠোন পাখির সাদা মলের আস্তরে ভরে উঠেছে। তীব্র দুর্গন্ধে নাকে-চোখে জ্বালা অনুভব করলাম। এমন পরিবেশে কীভাবে শিবুরা বছরের পর বছর টিকে আছে, বিষয়টি আমার কাছে বিস্ময় ঠেকল। পাখির প্রতি গভীর মায়া না থাকলে এমন ত্যাগ অসম্ভব।

শিবু আর তাঁর ভাই স্বপন এখন এই পাখিবাড়ির স্থায়ী বাসিন্দা। পরিবার নিয়ে থাকেন। ২০১৯ সালে পরিবেশ সংরক্ষণে জাতীয় পদক পেয়েছেন। তবে তাঁদের অভিযোগ, পুরস্কারের আংশিক অর্থ তাঁরা পেয়েছেন, বাকি অর্থ স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের হস্তগত হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট ফান্ডের আওতায় ২০২৩ সালে পাখিবাড়ির জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের জন্য একটি প্রকল্প নেওয়া হলেও আজ পর্যন্ত তেমন কোনো কার্যক্রম দেখেননি তাঁরা।

দিনে দিনে পাখি বাড়ির গাছগুলো বুড়ো হয়েছে, অতিরিক্ত পাখির কারণে অনেক গাছ ভেঙেও পড়েছে। নতুন করে কিছু গাছ লাগানো প্রয়োজন, যাতে পুরোনো গাছগুলো ভেঙে পড়লে পাখিরা আশ্রয়হীন হয়ে না পড়ে। শিবুদের তেমন কোনো চাওয়া–পাওয়া নেই। তবে হতাশা আছে। আর পাখিদের সঙ্গে বসবাস করতে গিয়ে খুব ক্লান্ত মনে হলো পাখিবাড়ির বাসিন্দাদের।

পাখির প্রতি নিঃস্বার্থ ভালোবাসাই কি আজ বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে পাখিবাড়ির জন্য? আইন-বিধিমালা তৈরি করা ছাড়া আমাদের কি আর কিছুই করার নেই? শিবু-স্বপনদের সীমাহীন ত্যাগ কি আমাদের উদাসীনতার বেড়াজাল ছিন্ন করতে পারবে?