উপকূলীয় বাংলাদেশের ৪০ বছর বা তার বেশি বয়সী মানুষের প্রতি ৫ জনের একজন আগামী ১০ বছরে মাঝারি থেকে উচ্চমাত্রার (অন্তত ১০ শতাংশ বা তার বেশি) কার্ডিওভাসকুলার (সিভিডি) রোগ অর্থাৎ, হৃদ্রোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকিতে রয়েছেন বলে গবেষণায় উঠে এসেছে।
একই গবেষণায় উপকূলের খাবার পানির উৎসে ব্যাপক লবণাক্ততার চিত্রও পাওয়া গেছে। খুলনার কয়রা ও সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলার ২৭ হাজার ৬৯৭টি পানির উৎস পরীক্ষা করে দেখা গেছে, এসব উৎসের প্রায় এক-চতুর্থাংশ খাবার পানি হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। আর খাবার পানির উৎসগুলোর মধ্যে কয়রায় ৫৫ দশমিক ৩ শতাংশ এবং আশাশুনিতে ২৩ দশমিক ৩ শতাংশে লবণাক্ততা পাওয়া গেছে।
‘বাংলাদেশে খাবার পানির লবণাক্ততা এবং স্বাস্থ্য: প্রমাণ, অভিযোজন এবং নীতিগত সমাধান’ শীর্ষক সেমিনারে গবেষণার প্রাথমিক এসব ফলাফল প্রকাশ করা হয়। আইসিডিডিআর,বি ও ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডনের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে গবেষক, সরকারি কর্মকর্তা, শিক্ষাবিদ, উন্নয়ন সহযোগী ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। আজ সোমবার রাজধানীর মহাখালীতে আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ (আইসিডিডিআর,বি)-এর সাসাকাওয়া মিলনায়তনে এ অনুষ্ঠান হয়।
আইসিডিডিআর,বি-এর জ্যেষ্ঠ বিজ্ঞানী আলিয়া নাহিদ গবেষণার বাংলাদেশ কর্মসূচির প্রাথমিক ফলাফল উপস্থাপন করেন। কর্মসূচির আওতায় খুলনার কয়রা উপজেলা ও সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলার ৭১টি কমিউনিটি ক্লিনিকের আওতাধীন ১৭২টি গ্রামের ওপর খাবার পানির জরিপটি করা হয়।
গবেষকেরা ২ উপজেলার ২৭ হাজার ৬৯৭টি পানির উৎস জরিপ করেন। এর মধ্যে ৬ হাজার ৭০৩টি বা ২৪ দশমিক ২ শতাংশ উৎস খাবার পানি হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছিল। খাবার পানির উৎসে লবণাক্ততার হার কয়রায় আশাশুনির তুলনায় অনেক বেশি পাওয়া যায়।
গবেষণার আরেকটি অংশে ২ উপজেলার ৪০ বছর বা তার বেশি বয়সী ১৫ হাজার ৪৭১ জন প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির হৃদ্রোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকি মূল্যায়ন করা হয়। এতে দেখা যায়, ২১ দশমিক ৬ শতাংশ ব্যক্তির আগামী ১০ বছরে মাঝারি থেকে উচ্চমাত্রার হৃদ্রোগ কিংবা স্ট্রোক হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। কয়রায় এ হার ১৯ দশমিক ৭ শতাংশ এবং আশাশুনিতে ২৩ দশমিক ৬ শতাংশ।
তবে গবেষকেরা পানির লবণাক্ততা ও হৃদ্রোগের ঝুঁকির এই তথ্যকে সরাসরি কারণ-ফল সম্পর্ক হিসেবে উপস্থাপন করেননি। উপকূলীয় এলাকায় খাবার পানিতে লবণাক্ততার উপস্থিতি এবং একই জনগোষ্ঠীর মধ্যে হৃদ্রোগের ঝুঁকির উচ্চ হার—দুটি বিষয়ই গবেষণায় তুলে ধরা হয়েছে। পানির সোডিয়ামসহ বিভিন্ন খনিজ উপাদান কীভাবে দীর্ঘ মেয়াদে স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব ফেলে, তা নিয়ে আরও গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে।
আলিয়া নাহিদ প্রথম আলোকে বলেন, এ গবেষণা শুরু হয়েছিল ২০২৩ সালে আর এটি শেষ হবে আগামী বছরের সেপ্টেম্বর মাসে।
আজকের অনুষ্ঠানে ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডনের অধ্যাপক পাওলো ভিইনিস বলেন, খাবার পানির লবণাক্ততার জন্য এখনো কোনো নির্দিষ্ট স্বাস্থ্যভিত্তিক সীমা নির্ধারিত হয়নি। পানিতে সোডিয়াম ও অন্যান্য খনিজ উপাদানের স্বাস্থ্যগত প্রভাব নিয়ে আরও গবেষণা করে উপযুক্ত স্বাস্থ্যভিত্তিক নির্দেশিকা তৈরির প্রয়োজন রয়েছে।
ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডনের অধ্যাপক অ্যাড্রিয়ান বাটলার বলেন, ঘূর্ণিঝড়–জলোচ্ছ্বাসের কারণে উপকূলের পুকুর ও ভূগর্ভস্থ পানির উৎস দীর্ঘ সময় লবণাক্ত থাকতে পারে। এ কারণে দুর্যোগের পর দ্রুত পানির উৎস পরিষ্কার ও পুনরুদ্ধার করা এবং উপকূলীয় বাঁধের রক্ষণাবেক্ষণ ও প্রয়োজন অনুযায়ী তা উঁচু করা জরুরি।
আইসিডিডিআর,বি-এর নির্বাহী পরিচালক তাহমিদ আহমেদ বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশের স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে তথ্যপ্রমাণ এখনো সীমিত। খোদ আইসিডিডিআর,বির গবেষণায় জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে স্বাস্থ্যঝুঁকির বিষয়টি উঠে এসেছে। উপকূলে স্বাস্থ্য সমস্যা প্রকট হচ্ছে।
এ গবেষণার যে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য রয়েছে, তা জানান গবেষকেরা। তাঁদের বক্তব্য, এ গবেষণার ফলাফলের ভিত্তিতে কম লবণাক্ত খাবার পানির প্রাপ্যতা বাড়াতে একটি সমন্বিত কর্মসূচি নেওয়া হচ্ছে। এর আওতায় বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, পুকুরের পানি ফিল্টার (পন্ড স্যান্ড ফিল্টার), টিউবওয়েল ব্যবস্থাপনা ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য খাবার পানির উৎসের ডিজিটাল নিবন্ধন ও নজরদারিব্যবস্থা তৈরির উদ্যোগ রয়েছে। পাশাপাশি প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস ও দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগের স্ক্রিনিং, চিকিৎসা, রেফারেল ও ফলোআপ যুক্ত করার পরিকল্পনা করা হয়েছে। এসব কার্যক্রমে স্থানীয় জনগোষ্ঠী ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনের মতামত নেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশের উপকূল, সেখানকার পানিতে লবণাক্ততা, সুপেয় পানির অভাব, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব—এসব বিষয় নিয়ে দীর্ঘ সময় ধরেই আলোচনা চলছে। গবেষণাও কম নয়। কিন্তু তারপরও পরিস্থিতির আশানুরূপ উন্নতি নেই—আজকের অনুষ্ঠানে এমন মন্তব্যও করেন কেউ কেউ। এর কারণ হিসেবে আলোচকেরা বলেন, উপকূলের এসব বাস্তবতা সামলাতে আন্তমন্ত্রণালয় সমন্বয় নেই। কখনো এসব বিষয়কে স্বাস্থ্যর সমস্যা, কখনো পরিবেশ বা জলবায়ুর সমস্যা ইত্যাদি বিচ্ছিন্নভাবে দেখা হয়। আজকের অনুষ্ঠানে এসবের একটি সমন্বয়ের তাগিদ দেওয়া হয়।
আর গবেষণালব্ধ উপাত্ত যে জলবায়ু বিষয়ে বাংলাদেশের ঝুঁকি তুলে ধরতে খুবই কার্যকর উপাদান হিসেবে কাজ করবে, তা জানান অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব ফাহমিদা খানম। তিনি বলেন, খাবার পানির লবণাক্ততা একই সঙ্গে জলবায়ু অভিযোজন ও জনস্বাস্থ্যের বিষয়। এটি মোকাবিলায় পরিবেশ, স্বাস্থ্য, পানি ও স্থানীয় সরকার খাতের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
অনুষ্ঠানের সভাপতি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, হৃদ্রোগ, ডায়াবেটিস ইত্যাদি অসংক্রামক রোগ বৃদ্ধি একটি বড় সমস্যা। এসব ঝুঁকি কমিয়ে আনার ক্ষেত্রে সরকারের স্পষ্ট প্রতিশ্রুতি রয়েছে।
সেমিনারে পানির গুণগত মান পর্যবেক্ষণ ও তথ্য আদান-প্রদান জোরদার, খাবার পানিতে সোডিয়ামের স্বাস্থ্যভিত্তিক নির্দেশিকা প্রণয়ন, পানির উৎসের টেকসই ব্যবস্থাপনা এবং নিরাপদ পানির কার্যক্রমকে অসংক্রামক রোগপ্রতিরোধ ও প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে যুক্ত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
অনুষ্ঠানে প্যানেল আলোচনায় অংশ নেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) ইনস্টিটিউট অব ওয়াটার অ্যান্ড ফ্লাড ম্যানেজমেন্টের অধ্যাপক মাশফিকুস সালেহিন, এক্সপ্যান্ডিং অ্যাকসেস টু ইন্টিগ্রেটেড হেলথ কেয়ার ফর দ্য আরবান পপুলেশনের প্রকল্প পরিচালক অধ্যাপক ডা. সৈয়দ জাকির হোসেন, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের (ডিপিএইচই) নির্বাহী প্রকৌশলী (গবেষণা ও উন্নয়ন বিভাগ) সুশান্ত রায় এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তর (ডিজিএইচএস) ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেমের (এমআইএস) সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডা. শাহ আলী আকবর আশরাফী। এ অধিবেশন পরিচালনা করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক কাজী মতিন উদ্দিন আহমেদ।