ঠাকুরগাঁওয়ে ইকো-সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশনের (ইএসডিও) অতিথি নিবাসে সকালেই ঘুম ভাঙে। বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াই। দূরে কয়েকটি বুদ্ধনারকেল চোখে পড়ে। মনে পড়ে রংপুর শহরের কথা। প্রায় দুই দশক আগে কাইজেলিয়া দেখতে এসে রংপুর শহরে প্রচুর বুদ্ধনারকেল দেখেছিলাম। বারান্দায় আরও অনেক সুসজ্জিত উদ্ভিদের সমারোহ। বিচিত্র ও বহুবর্ণিল ফুলের উপস্থিতি জানান দিল কেউ একজন বৃক্ষপ্রেমী আছেন এখানে। কিন্তু কে এই মহানুভব পুষ্পপ্রেমী?
আমাদের উদ্ভিদবিষয়ক এই ঝটিকা সফরের প্রধান উদ্যোক্তা অধ্যাপক তুহিন ওয়াদুদ জানালেন স্বয়ং এই প্রাঙ্গণের অধিপতি ড. মুহম্মদ শহীদ উজ জামান একজন বৃক্ষদরদি মানুষ। তাঁর অনুমতি ছাড়া এখানে একটি গাছের পাতাও স্পর্শ করা নিষেধ। তিনি আরও জানালেন, এই পরিপাটি ভবনের প্রতি তলায় সুপরিসর বারান্দায় বিচিত্র পুষ্প-উদ্ভিদের সমাবেশ ঘটানো হয়েছে। ভবনের চারপাশেও অনেক অপ্রচলিত বৃক্ষ রয়েছে। এ তথ্য যে অমূলক নয়, তা রাতেই গাড়িবারান্দার কাছে একটি মুচকুন্দগাছ দেখে বেশ বুঝতে পেরেছিলাম। হাতে খুব বেশি সময় নেই, দ্রুত রেডি হয়ে নিচে নামতে হবে। কিন্তু সময় যত কমই থাকুক বারান্দাগুলো তো একঝলক দেখতেই হবে। আরেক তলা নিচের বারান্দায় উঁকি দিতেই চোখ আটকে গেল একটি ফুলে। ফুলটি চেনা মনে হচ্ছে, দেখতে অনেকটা টাইগার লিলি বা সুখদর্শনের মতো; কিন্তু পাতার রং আর গড়ন তো ভিন্ন! ধাঁধায় পড়লাম। পরে অবশ্য পরিচয় শনাক্ত করেছি। ইংরেজি নাম রেড বগ লিলি। বৈজ্ঞানিক নাম Crinum menehune। আগে কোথাও চোখে পড়েনি।
ঝটপট নিচে নেমে এলাম। গাড়িতে উঠব। ঠিক তখনই দেখতে পেলাম দেয়াল ঘেঁষে লাগানো ভিন্ন রঙের এক সারি কলাবতীর ফুল। সচরাচর এই রঙের কলাবতী চোখে পড়ে না। কলাবতীর এই রকমফের অ্যাপ্রিকট ড্রিম নামে পরিচিত। অপ্রচলিত এই দুই ফুল দেখে বেশ চমৎকৃত হলাম। পাশেই পাওয়া গেল পিনাট বাটারগাছ। গাছে ফুল-ফল দুটোই আছে। এই ফুল-ফলের ছবি তোলায় মনোযোগ দিলেন কথাসাহিত্যিক, ভ্রমণলেখক ও অনুবাদক ফারুক মঈনউদ্দীন। আমাদের উদ্ভিদবিষয়ক এসব পাগলামিতে অংশ নিতে তিনিও ঢাকা থেকে এসেছেন। এসব বিশেষ উদ্ভিদের সঙ্গে বেশিক্ষণ থাকা গেল না। যেতে হবে টাঙ্গন নদীর পারে। সেখানে মুহম্মদ শহীদ উজ জামানের পৃষ্ঠপোষকতায় লোকায়ন উদ্ভিদ জাদুঘরে বিপন্ন প্রজাতির বৃক্ষরোপণের বিপুল এক কর্মযজ্ঞ শুরু হয়েছে। গত বছর এখানে প্রথম দুর্লভ ও বিপন্ন প্রজাতির ২০০ উদ্ভিদ রোপণ করা হয়। তারই ধারাবাহিকতায় এ বছর আরও গাছ রোপণ করা হবে। তবে টাঙ্গনপারের বৃক্ষবৃত্তান্ত শোনানোর আগে আপনাদের দুই চমৎকার ফুলের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি জানিয়ে রাখি।
লম্বাটে পাতার ঝোপালো এই গাছের নামকরণ করা হয়েছে হাওয়াইয়ের গভীর জঙ্গলে বসবাসকারী ক্ষুদ্র জাতি মেনেহুনদের নামে। এ গাছের পাতা গাঢ় মেরুন-লাল রঙের। এক থেকে দুই ইঞ্চি চওড়া এবং ২৪ ইঞ্চি লম্বা হতে পারে। পাতা সাধারণত বিবর্ণ হয় না এবং গাঢ় লালই থাকে। পাতার কোল থেকে গাঢ় লাল ডাঁটায় গোলাপি-লাল রঙের ফুল ফোটে। ফুল লম্বা, দলনলের আগায় ছড়ানো ছয়টি পাপড়ির ওপরটা সাদাটে, নিচের দিক গাঢ় লাল। গ্রীষ্মের শুরু থেকে শরৎকাল পর্যন্ত ফুল ফোটার মৌসুম। গাছটির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো এটি ছয় ইঞ্চি গভীর পানিতেও জন্মাতে পারে। আবার আশ্চর্যজনকভাবে শুষ্ক অবস্থাও সহ্য করতে পারে। তবে পর্যাপ্ত আর্দ্রতা থাকলে উঁচু জমিতেও দিব্যি বেঁচে থাকতে পারে। লাল পাতার গোলাপি রঙের এই লিলি মূলত একটি আবাদিত জাত। হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জের বিগ আইল্যান্ডের ‘হাওয়াই ট্রপিক্যাল বোটানিক্যাল গার্ডেনের’ শ্যান ক্যালাহান গাছটি প্রবর্তন করেন। এই উদ্ভিদ প্রজাতির নামের উৎস হাওয়াইয়ান পৌরাণিক কাহিনিতে পাওয়া যায়, যেখানে মেনেহুনদের হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জের গভীর জঙ্গলে বসবাসকারী একটি ক্ষুদ্র জাতি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। পাতা ও ফুলের সর্বোত্তম রং এবং বেশিসংখ্যক ফুল উৎপাদনের জন্য গাছটির পূর্ণ সূর্যালোক প্রয়োজন।
ক্যানা বা কলাবতী এমন একটি ফুল, যা বর্ণবৈচিত্র্যের জন্য বেশ সমাদৃত। এই ফুলের বাহারি রঙের শেষ নেই। বহুবর্ণিল অসংখ্য কলাবতীর ভিড়ে যদি নতুন কোনো রং বাগানকে আরও উজ্জ্বল করে তোলে তাহলে তো অনেক আনন্দ! কলাবতীর এই অ্যাপ্রিকট ড্রিম রকমফের দেখে তেমন আনন্দই অনুভব করেছি। ফুলটির গোলাপি আভার রেশমি পাপড়িগুলো উষ্ণ অ্যাপ্রিকট রঙে আবৃত থাকে। ফুলের মাঝখানে একটি লালচে ছোপ থাকে। এটি পাপড়ির রঙের সঙ্গে বৈপরীত্য তৈরি করে। প্রায় এক মিটার লম্বা নলাকার ডাঁটার শীর্ষে প্রায় পাঁচটি ফুলের গুচ্ছে বড় বড় ফুলগুলো ফোটে। চওড়া আলংকারিক পাতাগুলো গাছটিতে একটি আভিজাত্যপূর্ণ আবহ যোগ করে। অ্যাপ্রিকট ড্রিম উন্মুক্ত সবুজ চত্বর এবং টবে লাগানোর জন্য উপযুক্ত। চমৎকার এই ফুল জুন থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ফোটে।
কলাবতী মূলত (Canna spp.) কন্দজ গাছ। শীতকালে গাছ শুকিয়ে গেলেও মাটির নিচে কন্দ সতেজ থাকে। গাছ দেড় থেকে দুই মিটার পর্যন্ত উঁচু হয়। নতুন জাতের গাছ ৪৫ থেকে ১৮০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত উঁচু হতে পারে। ছোট জাতের গাছ ৩০ সেন্টিমিটারের বেশি উঁচু হয় না।
টাঙ্গনপারে লোকায়ন উদ্ভিদ জাদুঘর প্রাঙ্গণে গিয়ে দেখি সেখানে রীতিমতো উৎসব আমেজ বিরাজ করছে। কেউ কেউ টুকরিতে করে গাছ নিয়ে আসছে, কেউ গর্ত করছে, কেউ গাছগুলো গর্তের পাশে সাজিয়ে রাখছে। আবার এই স্মরণীয় মুহূর্তের অংশী হতেও অনেকে উপস্থিত হয়েছেন। কয়েকজন সাংবাদিক এসেছেন। গত বছরের গাছগুলো বেশ তরতাজা হয়ে উঠেছে। কোনো কোনো গাছে ফুলও ফুটতে শুরু করেছে। দেখে মন ভরে গেল। আমরা প্রথমেই একটি দুর্লভ পাহাড়ি কদমগাছ রোপণ করি। শান্ত নদীর শীতল হাওয়ায় দুলছে কচি গাছগুলো। গাছের এই মিছিলে যোগ হচ্ছে আরও অনেক নতুন প্রাণ।