জুন মাসে বৃষ্টি কমার পাশাপাশি দেশে মে-জুনে উষ্ণ দিনের সংখ্যা বাড়ছে। এই পরিবর্তনে কৃষিসহ অর্থনীতির ওপর বিরূপ প্রভাবের শঙ্কা তৈরি হয়েছে।

জুন মাস মানে বর্ষার শুরু আর বর্ষা মানেই বৃষ্টি। বাংলাদেশে সচরাচর এই মাসেই বৃষ্টি বাড়তে শুরু করে। তাতে ভরে ওঠে নদীনালা-খাল-বিল; মাঠে আমনের বীজ বোনা শুরু হয়। কিন্তু এবার চিত্র ছিল ভিন্ন। সদ্য বিদায়ী জুনে দেশে স্বাভাবিকের তুলনায় বৃষ্টি হয়েছে ২৯ শতাংশ কম।
পরিসংখ্যান দেখাচ্ছে, গত সাত বছরে এই জুনেই সবচেয়ে কম বৃষ্টি হয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি গবেষণাগুলো বলছে, বাংলাদেশে মে-জুনে তাপমাত্রা দ্রুত বাড়ছে, উষ্ণ দিনের সংখ্যা বাড়ছে এবং মানুষ আগের চেয়ে বেশি তাপজনিত অস্বস্তির মুখে পড়ছে। দিন দিন এভাবে জুন মাসে বৃষ্টির পরিমাণ কমতে থাকলে কৃষি ও সার্বিকভাবে অর্থনীতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন গবেষকেরা।
সাত বছরে সবচেয়ে কম বৃষ্টি
গত সাত বছরে জুনে বৃষ্টির প্রবণতা কমার চিত্র দেখা যাচ্ছে আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্যে। অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ মো. বজলুর রশীদ তাঁর এক পর্যালোচনায় ২০২০ থেকে চলতি বছরের জুনের হিসাব তুলে ধরেছেন।
পরিসংখ্যান দেখাচ্ছে, গত সাত বছরে এই জুনেই সবচেয়ে কম বৃষ্টি হয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি গবেষণাগুলো বলছে, বাংলাদেশে মে-জুনে তাপমাত্রা দ্রুত বাড়ছে, উষ্ণ দিনের সংখ্যা বাড়ছে এবং মানুষ আগের চেয়ে বেশি তাপজনিত অস্বস্তির মুখে পড়ছে।
বজলুর রশীদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, গত সাত বছরের মধ্যে জুনে সর্বোচ্চ পরিমাণ বৃষ্টি হয়েছিল ২০২১ সালে। ওই বছর স্বাভাবিকের চেয়ে ১৮ শতাংশ বেশি বৃষ্টি হয়েছিল। আগের বছর ২০২০ সালেও বৃষ্টি হয় স্বাভাবিকের চেয়ে ২ শতাংশ বেশি। কিন্তু ২০২২ সাল থেকে বৃষ্টি কমছে ক্রমাগতভাবে। গত বছর ২১ শতাংশ কম বৃষ্টি হয়েছিল, এবার তা ২৯ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। দেশে সবচেয়ে বেশি বৃষ্টি হয় জুলাই মাসে। গড়ে এর পরিমাণ ৫২৩ মিলিমিটার, দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বৃষ্টি হয় জুনে, গড়ে ৪৫৯ মিলিমিটার। সেই দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পরিমাণ বৃষ্টির মাসে এবার বৃষ্টি কম।
আবহাওয়াবিদ বজলুর রশীদ বলেন, জুনে বৃষ্টি কম হওয়ার আবহাওয়াগত নেতিবাচক প্রভাব রয়েছে। বৃষ্টি কমের অর্থ হলো গরম বাড়বে। এতে মানুষের স্বাস্থ্য ও কৃষির ওপর বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে। এ মাসে কম বৃষ্টির ফলে গরম বৃদ্ধির প্রবণতা গবেষণায় দেখা যাচ্ছে।
বৃষ্টি কম, গরম বেশি—দুটি কি একই গল্পের অংশ
একটি মাসের বৃষ্টির ঘাটতি দিয়ে জলবায়ু পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত টানা যায় না। তবে যখন দীর্ঘমেয়াদি গবেষণার সঙ্গে সাম্প্রতিক পর্যবেক্ষণ মিলতে শুরু করে, তখন একটি বড় প্রবণতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বাংলাদেশের ৩৪টি আবহাওয়া কেন্দ্রের ১৯৭৬ থেকে ২০০৮ সালের তথ্য বিশ্লেষণ করে পরিবেশবিষয়ক সাময়িকী জার্নাল অব এনভায়রনমেন্ট–এ প্রকাশিত ‘ক্লাইমেট চেঞ্জ ইন বাংলাদেশ: এ হিস্ট্রিক্যাল অ্যানালাইসিস অব টেম্পারেচার অ্যান্ড রেইনফল ডেটা’ শীর্ষক এক গবেষণাপত্রে দেখা যায়, দেশে বার্ষিক গড় সর্বোচ্চ তাপমাত্রা প্রতিবছর প্রায় ০.০১৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস করে বাড়ছে।
শুধু তা–ই নয়, সর্বোচ্চ তাপমাত্রা বৃদ্ধির হার সবচেয়ে বেশি মে থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। এর মধ্যে জুনে গড় সর্বোচ্চ তাপমাত্রা প্রতিবছর প্রায় ০.০৩৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস করে বেড়েছে। অর্থাৎ বর্ষা শুরু হওয়ার কথা যে সময়ে, সেই সময়টিই ধীরে ধীরে আরও উষ্ণ হয়ে উঠছে।
আমনের বীজতলা তৈরির সময় বৃষ্টি কম হলে সেচের প্রয়োজন হয়। এবারও হয়েছে। এতে কৃষকের খরচ বেড়েছে। এই কম বৃষ্টির প্রবণতা জুলাই পর্যন্ত বিস্তৃত হলে আমনের উৎপাদনে বড় প্রভাব পড়তে পারে।মৃত্যুঞ্জয় রায়, কৃষিবিদ
উষ্ণ দিনের সংখ্যা বাড়ছে দ্রুত
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) গবেষকদের আরেকটি বিশ্লেষণ এই প্রবণতাকে আরও স্পষ্ট করে। ১৯৮১ থেকে ২০১০ সালের ২৬টি আবহাওয়া কেন্দ্রের তথ্য বিশ্লেষণ করে তাঁরা দেখেছেন, দেশে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা প্রতি দশকে প্রায় ০.৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস ও সর্বনিম্ন তাপমাত্রা প্রায় ০.৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস করে বেড়েছে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, উষ্ণ দিনের সংখ্যা প্রতি দশকে প্রায় ১২ দিন করে বেড়েছে। একই সঙ্গে টানা শুষ্ক দিনের সংখ্যা বাড়ার প্রবণতাও দেখা গেছে। এর মধ্য দিয়ে শুষ্ক সময় দীর্ঘ হওয়ার প্রবণতা স্পষ্ট। এর অর্থ হলো শুধু গড় তাপমাত্রা নয়, গরমের স্থায়িত্ব বাড়ছে।
জুন থেকেই শুরু বেশি তাপজনিত অস্বস্তি
তাপমাত্রা কত, সেটিই সব নয়। বাতাসে আর্দ্রতা বেশি থাকলে মানুষের শরীরের ওপর চাপ আরও বেড়ে যায়। তাই এখন গবেষকেরা শুধু তাপমাত্রা নয়, ডিসকমফোর্ট ইনডেক্স বা তাপজনিত অস্বস্তির সূচকও বিশ্লেষণ করছেন। চলতি বছরের মার্চে প্লস ওয়ান-এ প্রকাশিত ‘অ্যাপ্লিকেশন অব সিজনাল-অ্যাডজাস্টেড হাইব্রিড মডেলস ফর ফোরকাস্টিং ডিসকমফোর্ট ইনডেক্স ইন এ হিট-প্রন রিজিয়ন অব বাংলাদেশ’ শীর্ষক এক গবেষণায় রাজশাহীর ১৯৮৫ থেকে ২০২৪ সালের ৪০ বছরের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, জুন থেকে আগস্ট পর্যন্ত মানুষের তাপজনিত অস্বস্তি সবচেয়ে বেশি থাকে।
এর মধ্যে জুনেই গড় ডিসকমফোর্ট ইনডেক্স প্রায় ২৮ দশমিক ১, যা ‘উচ্চ অস্বস্তি’ পর্যায়ে পড়ে। অর্থাৎ জুনে শুধু তাপমাত্রা বেশি নয়, বাতাসের আর্দ্রতার কারণে মানুষের শরীরের ওপর গরমের প্রভাব সবচেয়ে তীব্র হতে পারে। ২০২৭ সাল নাগাদ তাপজনিত চাপ আরও বাড়তে পারে বলে গবেষকেরা সতর্ক করেছেন।
কৃষি, পানি ও নগরজীবনে বাড়বে চাপ
জুনে বৃষ্টি কম হওয়ার প্রভাব শুধু আবহাওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। এই সময়ই আমন ধানের বীজতলা তৈরি ও রোপণের প্রস্তুতি চলে। বৃষ্টি কম হলে সেচের প্রয়োজন বাড়ে, উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যায়। কারণ, জলাধার, খাল-বিল ও ছোট নদীগুলোও প্রত্যাশিত হারে পানি পায় না।
কৃষিবিদ মৃত্যুঞ্জয় রায় প্রথম আলোকে বলেন, আমনের বীজতলা তৈরির সময় বৃষ্টি কম হলে সেচের প্রয়োজন হয়। এবারও হয়েছে। এতে কৃষকের খরচ বেড়েছে। এই কম বৃষ্টির প্রবণতা জুলাই পর্যন্ত বিস্তৃত হলে আমনের উৎপাদনে বড় প্রভাব পড়তে পারে। অন্যদিকে শহরে দিনের পর দিন গরম ও আর্দ্র আবহাওয়া বিদ্যুৎ ব্যবহারের চাপ বাড়ায়, কর্মঘণ্টায় প্রভাব ফেলে এবং শিশু, বয়স্ক ও শ্রমজীবী মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়িয়ে তোলে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার বিভিন্ন গবেষণাও দেখিয়েছে, দীর্ঘ সময়ের তাপপ্রবাহ ও উচ্চ আর্দ্রতা শ্রমের উৎপাদনশীলতা কমিয়ে দেয় এবং তাপজনিত অসুস্থতার ঝুঁকি বাড়ায়।
রাজশাহীর ১৯৮৫ থেকে ২০২৪ সালের ৪০ বছরের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, জুন থেকে আগস্ট পর্যন্ত মানুষের তাপজনিত অস্বস্তি সবচেয়ে বেশি থাকে।
একটি মাস নয়, নজর রাখতে হবে দীর্ঘমেয়াদি প্রবণতায়
আবহাওয়াবিদেরা বলছেন, কোনো একটি মাসে বৃষ্টি কম হওয়া মানেই জলবায়ু পরিবর্তনের সরাসরি প্রমাণ নয়। প্রাকৃতিকভাবেও কোনো কোনো বছর বৃষ্টি কম বা বেশি হতেই পারে। তবে যখন দেখা যায়, একদিকে জুন মাসে বৃষ্টির ঘাটতি টানা কয়েক বছর ধরে বাড়ছে, অন্যদিকে দীর্ঘমেয়াদি গবেষণায় মে-জুনে তাপমাত্রা ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে, উষ্ণ দিনের সংখ্যা বাড়ছে, তখন সেটি কেবল একটি আবহাওয়ার বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং পরিবর্তিত জলবায়ুর একটি গুরুত্বপূর্ণ সংকেত হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
সদ্য বিদায়ী জুনে স্বাভাবিকের তুলনায় ২৯ শতাংশ কম বৃষ্টি সেই দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তনের সঙ্গে মিল পাওয়ার একটি সূত্র দেখাচ্ছে। তবে গত এপ্রিলে দেশে স্বাভাবিকের চেয়ে ৭৫ শতাংশ বেশি বৃষ্টি হয়েছে। এখন দেখার বিষয়, জুনের ঘাটতি বাকি মাসগুলো কতটা পূরণ করতে পারে। নাকি ২০২৬ সাল বাংলাদেশের জলবায়ুর পরিবর্তিত চরিত্রের আরেকটি মাইলফলক হয়ে দাঁড়াবে।