
আওয়ামী লীগ আমলে ২০১৪ সালের একতরফা, ২০১৮ সালের রাতের ভোট ও ২০২৪ সালের ডামি ভোট নামে পরিচিত তিনটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অনিয়ম করে জেতার ‘অভিনব’ পরিকল্পনা শুরু হয়েছিল ২০০৮ সালের ভোটের পর থেকেই। এই পরিকল্পনা হয় রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ের সিদ্ধান্তে। আর তা বাস্তবায়নে প্রশাসন, পুলিশ, নির্বাচন কমিশন এবং গোয়েন্দা সংস্থার একটি অংশকে রাষ্ট্রীয়ভাবে ব্যবহার করা হয়েছে।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে অনুষ্ঠিত ওই বিতর্কিত তিনটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের বিষয়ে ওঠা অভিযোগ তদন্তে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদনে এসব কথা বলা হয়েছে।
কমিশন বলেছে, নির্বাচনী অনিয়মে কয়েক হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারী জড়িত ছিলেন। তদন্ত কমিশনের জন্য বরাদ্দ করা সময় অপ্রতুল ছিল। ফলে সুনির্দিষ্টভাবে অনিয়মে জড়িতদের নাম এবং কার কী ভূমিকা ছিল, তা বের করা সম্ভব হয়নি। সময় স্বল্পতার কারণে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত সম্পন্ন করা সম্ভব হয়নি। কমিশনের সদস্যরা ২০০৮ সালের নির্বাচনকে সন্দেহজনক উল্লেখ করে ওই নির্বাচন নিয়েও তদন্ত করার সুপারিশ করেছেন।
রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে আজ সোমবার সন্ধ্যায় কমিশন তাদের প্রতিবেদন জমা দেয়। পরে যমুনার সামনে সংবাদ সম্মেলন করে প্রতিবেদনের সারসংক্ষেপ ও সুপারিশগুলো তুলে ধরেন পাঁচ সদস্যের কমিশনের সভাপতি হাইকোর্টের সাবেক বিচারপতি শামীম হাসনাইন, সাবেক অতিরিক্ত সচিব শামীম আল মামুন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক কাজী মাহফুজুল হক, আইনজীবী তাজরিয়ান আকরাম হোসাইন এবং নির্বাচন বিশেষজ্ঞ মো. আবদুল আলীম। এ সময় আরও বক্তব্য দেন প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম।
এর আগে গত জুন মাসে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের এক প্রজ্ঞাপনে প্রথমে তদন্ত কমিটি গঠনের কথা জানানো হয়েছিল। কমিটিকে ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছিল। পরের মাসে সেটি কমিশনে রূপান্তর করা হয়। সময় দেওয়া হয় ৩০ অক্টোবর। অবশ্য পরে এক মাস সময় বাড়ানো হয়।
কমিশনের দায়িত্ব ছিল ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচনে সংঘটিত বিভিন্ন অনিয়ম সম্পর্কে তদন্ত করা।
তদন্ত প্রতিবেদনের সারসংক্ষেপ
সংবাদ সম্মেলনের পর গতকাল তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদনের সারসংক্ষেপ সাংবাদিকদের দেওয়া হয়। তাতে ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালে অনুষ্ঠিত বিতর্কিত নির্বাচনের নানা অনিয়ম ও কৌশলের কথা তুলে ধরা হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৪ সালে ১৫৩টি আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় এবং বাকি ১৪৭ টিতে ‘প্রতিদ্বন্দ্বিতা’র নির্বাচন ছিল সম্পূর্ণ সাজানো ও সুপরিকল্পিত। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় রাখতে এ বন্দোবস্ত করা হয়েছিল।
কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৪ সালের নির্বাচন সারা বিশ্বে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতার ভোট হিসেবে সমালোচিত হওয়ায় শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ ২০১৮ সালের নির্বাচনকে 'প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক' করার মিশন গ্রহণ করে। বিএনপিসহ অন্যান্য বিরোধী দল তাদের এ সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা বুঝতে না পেরে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে।
তদন্ত কমিশনের প্রাক্কলন অনুযায়ী, ২০১৮ সালে ৮০ শতাংশ কেন্দ্রে রাতের বেলায় ব্যালট পেপারে সিল মেরে আওয়ামী লীগের বিজয় নিশ্চিত করে রাখা হয়। আওয়ামী লীগকে জেতাতে প্রশাসনের মধ্যে এক ধরনের অসৎ প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল। ফলে কোনো কোনো কেন্দ্রে ভোট পড়ার হার ১০০ শতাংশের বেশি হয়ে যায়। ২০২৪ সালে বিএনপিসহ বিরোধী দল নির্বাচনে অংশ না দেওয়ায় 'ডামি' প্রার্থী দিয়ে নির্বাচনকে 'প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক' করার অপকৌশল গ্রহণ করা হয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়, তিনটি নির্বাচনের অভিনব পরিকল্পনা বাস্তবায়নে কিছু কর্মকর্তার সমন্বয়ে বিশেষ সেল গঠন করা হয়, যা ‘নির্বাচন সেল’ নামে পরিচিত লাভ করে। ২০১৪ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত সময়কালে নির্বাচনব্যবস্থাকে নির্বাচন কমিশনের কাছ থেকে মূলত প্রশাসনের হাতে নিয়ে যাওয়া হয়। এ সময়ে কমিশনের পরিবর্তে প্রশাসনই হয়ে উঠে নির্বাচন পরিচালনার মূল শক্তি।
কলঙ্কজনক অধ্যায়ের সূচনা
তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালে অনুষ্ঠিত যথাক্রমে দশম, একাদশ ও দ্বাদশ জাতীয় নির্বাচন দেশে ও বিদেশে ব্যাপক বিতর্ক ও সমালোচনার জন্ম দেয় এবং প্রকারান্তরে নির্বাচনের এক কলঙ্কজনক অধ্যায়ের ইতিহাস রচনা করে। এ নির্বাচনগুলো ছিল একতরফা এবং এসব অনিয়মের নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার গঠিত হয়েছে। জনগণের অর্থ অপচয় করে অনুষ্ঠিত এসব নির্বাচনে জনগণের ভোটের অধিকার ভীষণভাবে খর্ব করা হয়েছে। রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় এসব নির্বাচনের মাধ্যমে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলো কলুষিত ও দুর্বল হয়েছে, গণতন্ত্র আক্রান্ত হয়ে ধীরে ধীরে ফ্যাসিবাদ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
কমিশনের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, তিনটি কলুষিত নির্বাচনের ভিত রচিত হয়েছিল ২০১১ সালে তৎকালীন প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হকের একটি বিতর্কিত রায়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা অসাংবিধানিক ঘোষণার মাধ্যমে।
যেসব কর্মকাণ্ড নির্বাচন ব্যবস্থাকে কলুষিত করেছে
প্রতিবেদনে যেসব কর্মকাণ্ড নির্বাচন ব্যবস্থাকে কলুষিত করেছে তারও একটি তালিকা তুলে ধরা হয়। সেগুলো হলো তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল, নির্বাচনী কৌশল নির্ধারণ ও নির্বাচনে রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা এবং সশস্ত্র বাহিনীর মনোনীত একটি অংশকে ব্যবহার, বিরোধী প্রার্থী ও কর্মীদের নামে মিথ্যা ও হয়রানিমূলক মামলা দায়ের, বিরোধী দলের নেতা-কর্মীদের অজামিনযোগ্য মিথ্যা মামলায় গ্রেপ্তার ও গুম, জাল ভোট প্রদান, নির্বাচনী কারচুপিতে নির্বাহী বিভাগকে ব্যবহার, অনিয়মতান্ত্রিকভাবে সংসদীয় সীমানা নির্ধারণ, আগে থেকেই ব্যালট বাক্সে ভোট ভরে রাখা, ভোট প্রদানের হারে পরিবর্তন, একতরফাভাবে সরকারের আজ্ঞাবহ প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও অন্যান্য কমিশনার নিয়োগ, নির্বাচনে ‘ডামি’ প্রার্থী দাঁড় করানো ইত্যাদি।
সুপারিশ
তদন্ত কমিশন নির্বাচনী ব্যবস্থা নিয়ে বেশ কিছু সুপারিশ করেছে। এসব সুপারিশের মধ্যে রয়েছে নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী প্রস্তাবিত আইন প্রণয়ন এবং সে অনুযায়ী নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ করতে হবে। এ ছাড়াও সীমানা নির্ধারণ কমিশন গঠন, প্রশাসন ক্যাডার থেকে কোনো কর্মকর্তাকে নির্বাচন কমিশনে প্রেষণে নিয়োগ না দেওয়া, প্রশাসনের বাইরে থেকে নির্বাচন কমিশনে সচিব নিয়োগের জন্য বিধিমালা প্রণয়ন করা, নির্বাচন কমিশনের নিজস্ব কর্মকর্তাদের মধ্য থেকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে রিটার্নিং ও সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা নিয়োগ এবং এ দায়িত্ব পালনের জন্য পর্যাপ্ত সংখ্যক কমিশনের কর্মকর্তা পাওয়া না গেলে প্রশাসনসহ অন্য ক্যাডার থেকে নিয়োগের কথা রয়েছে সুপারিশের মধ্যে।
জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটদের নির্বাচনী দায়িত্ব পালনের সময় নির্বাহী ও রাজনৈতিক চাপ থেকে সুরক্ষিত রাখতে ‘প্রোটেকশন ফ্রেমওয়ার্ক’ করা, ডিজিএফআই, এনএসআইসহ সব গোয়েন্দা সংস্থার কাজে স্বচ্ছতা আনার সুপারিশ করেছে তদন্ত কমিশন।
সংবাদ সম্মেলনে তদন্ত কমিশনের প্রেক্ষাপট তুলে ধরে কমিশন প্রধান সাবেক বিচারপতি শামীম হাসনাইন বলেন, ২০১৪, ২০১৮ আর ২০২৪ সালের নির্বাচন হয়েছে বটে। কিন্তু এর ‘মাস্টারপ্ল্যান’ হয়েছে ২০০৮ সালের পরে। ওই নির্বাচনের পরই কৌশল ছিল কীভাবে তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে বাতিল করা যায়। ২০১১ সালে তা বাতিল করা হয়। এটি বাতিল করার পেছনে একটি দীর্ঘমেয়াদি কৌশল ছিল। তিনি আরও বলেন, তিনটি নির্বাচন ছিল প্রতারণাপূর্ণ। এতে জোর করে ফলাফল ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে এবং তা ছিল বাংলাদেশের গণতন্ত্রের মৃত্যু।