
ধর্ষণ শুধু নারীর সমস্যা নয়, এটিকে রাষ্ট্র ও সমাজের সামগ্রিক সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করতে হবে। ধর্ষণের শিকার ব্যক্তির ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে সরকারকে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। পাশাপাশি ভুক্তভোগী ও সাক্ষীর সুরক্ষা নিশ্চিত করে তিন মাসের মধ্যে ধর্ষণ মামলার বিচার শেষ করার দাবি জানিয়েছেন নারীনেত্রীরা।
আজ বৃহস্পতিবার রাজধানীর সেগুনবাগিচায় ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সাগর-রুনি মিলনায়তনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ দাবি জানানো হয়। সাম্প্রতিক সময়ে ধর্ষণের ঘটনায় ভুক্তভোগীর সুরক্ষা বিষয়ে এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে ধর্ষণ আইন সংস্কার জোট।
সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ, মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন, ব্র্যাক, ব্লাস্টসহ জোটের বিভিন্ন সংস্থার প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য উপস্থাপন করেন ব্লাস্টের লিগ্যাল এইড স্পেশালিস্ট আয়েশা আক্তার। তিনি বলেন, দেশে নারী ও শিশুদের বিরুদ্ধে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনা উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। সম্প্রতি নরসিংদীর মাধবদী, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা, পাবনার ঈশ্বরদী ও চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো তার প্রমাণ।
সংবাদ সম্মেলনে ধর্ষণ আইন সংস্কার জোট আট দফা দাবি তুলে ধরেছে। দাবিগুলোর মধ্যে আছে ধর্ষণের ঘটনায় দ্রুত অপরাধীকে আইনের আওতায় আনা; ভুক্তভোগী, পরিবার ও সাক্ষীর সুরক্ষা নিশ্চিত করা; সহিংসতার শিকার ব্যক্তিদের সরকারি সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি নিশ্চিত করা।
এ ছাড়া মানবাধিকার মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ধর্ষণবিষয়ক আইন সংস্কার; প্রতিবন্ধী ভুক্তভোগীর ন্যায়বিচার নিশ্চিত, ভুক্তভোগী ও সাক্ষী সুরক্ষা আইন প্রণয়ন এবং উচ্চ আদালতের রায়ের যথাযথ বাস্তবায়ন; ভুক্তভোগীর চরিত্রগত সাক্ষ্যের ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করে সাক্ষ্য আইন, ২০২২ এর ১৪৬ এর (৩) ও ১৫১ ধারার সুষ্ঠু প্রয়োগ নিশ্চিত করা এবং স্বাস্থ্য, বিচার ও বেসরকারি সংস্থার সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়ার পাশাপাশি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন (সংশোধন) অধ্যাদেশ-২০২৫ দ্রুত আইনে পরিণত করার দাবি জানানো হয়।
সংবাদ সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাসুদা রেহানা রোজী। তিনি বলেন, ধর্ষণের মামলায় দীর্ঘসূত্রতা, সাক্ষী সুরক্ষার অভাব এবং রাজনৈতিক প্রভাব ন্যায়বিচারের পথে বড় বাধা।
মাসুদা রেহানা রোজী বলেন, অনেক ক্ষেত্রে ধর্ষণের শিকার নারীকে অভিযুক্ত ব্যক্তির সঙ্গে বিয়ের চাপ দেওয়া হয়, যা ভুক্তভোগীর পরিস্থিতি আরও জটিল করে। এ সমস্যা সমাধান ও ধর্ষণ মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য একটি টাস্কফোর্স গঠনের দাবি জানান তিনি।
রাজনৈতিক দলগুলো ধর্ষণ সমস্যা সমাধানে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ নয় উল্লেখ করে এই নারীনেত্রী বলেন, তারা ধর্ষণকে কোনো সমস্যা মনে করছে না। ১০০ দিনের একটি প্রোগ্রাম নিয়েছে বর্তমান সরকার। কিন্তু এই প্রোগ্রামেও নারী নির্যাতনের কথা কোথাও নেই। ধর্ষণের বিচার তিন মাসের মধ্যে সম্পন্ন করার বিষয়ে সরকারের কাছে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের দাবি জানান তিনি।
সংবাদ সম্মেলন সঞ্চালনা করেন নারীপক্ষের সদস্য কামরুন নাহার। তিনি বলেন, নারীর অবস্থানকে মর্যাদাসম্পন্ন অবস্থায় ফেরত নিতে সমাজ ও রাষ্ট্রের ঐক্যবদ্ধ ভূমিকা রাখতে হবে। নারী নির্যাতন প্রতিরোধে সরকার যেসব উদ্যোগ নিয়েছে, সেগুলো কতটা কার্যকর আছে, তা–ও খতিয়ে দেখতে হবে।
ব্র্যাকের সামাজিক ক্ষমতায়ন ও আইনি সুরক্ষা কর্মসূচির সহযোগী পরিচালক শ্বাশ্বতী বিপ্লব বলেন, ধর্ষণ প্রতিরোধে আইন থাকা সত্ত্বেও ধর্ষণ থেমে নেই। তিনি দাবি করেন, নারী ও শিশু নির্যাতন ট্রাইবুনালে ৫ বছরের পুরোনো অন্তত ১০ হাজার মামলা বিচারাধীন আছে। মামলার এমন দীর্ঘসূত্রতা থাকলে ধর্ষকেরা ভয় পাবে না। অপরাধও বন্ধ হবে না।
ধর্ষণের শিকার ভুক্তভোগীর ন্যায়বিচার নিশ্চিতের ওপর জোর দিয়ে শ্বাশ্বতী বিপ্লব বলেন, যাঁরা সহিংসতার শিকার হন, তাঁরা যেন গণমাধ্যম, পুলিশ স্টেশন, বিচারালয় বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আবারও হেনস্তার শিকার না হন, সেটা নিশ্চিত করতে হবে।
ধর্ষর্ণের শিকার ভুক্তভোগীর সুরক্ষা ও পরিবারের সুরক্ষা নিশ্চিতে সরকারের আলাদা সেবামূলক তহবিল রাখার কথা বলেন বাংলাদেশ মহিলা আইনজীবী সমিতির ভাইস প্রেসিডেন্ট জাকিয়া আনারকলি।
সংবাদ সম্মেলনে আরও বক্তব্য দেন ব্লাস্টের অ্যাডভোকেসি ও কমিউনিকেশন পরিচালক মাহবুবা আক্তার, মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের প্রতিনিধি রওশন আরা প্রমুখ।