‘বিশ্বমানের ক্যানসার চিকিৎসা এখন বাংলাদেশে’ শীর্ষক অনলাইন আলোচনা গত সোমবার অনুষ্ঠিত হয়
‘বিশ্বমানের ক্যানসার চিকিৎসা এখন বাংলাদেশে’ শীর্ষক অনলাইন আলোচনা গত সোমবার অনুষ্ঠিত হয়

অনলাইন আলোচনা

ফুসফুস ক্যানসার: সঠিক সময়ে শনাক্ত ও যথাযথ চিকিৎসায় সম্পূর্ণ নিরাময় সম্ভব

ফুসফুস ক্যানসারের কোনো লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত অভিজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। কারণ, সঠিক সময়ে শনাক্ত করা গেলে যথাযথ চিকিৎসার মাধ্যমে এটি সম্পূর্ণ নিরাময় সম্ভব।

‘বিশ্বমানের ক্যানসার চিকিৎসা এখন বাংলাদেশে’ শীর্ষক অনলাইন আলোচনা অনুষ্ঠানের অতিথি জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের মেডিকেল অনকোলজিস্ট ডা. এ টি এম কামরুল হাসান এ কথা বলেন। ক্যানসার বিষয়ে সচেতনতা তৈরিতে অনুষ্ঠানটির আয়োজন করে এসকেএফ অনকোলোজি। উপস্থাপনা করেন নাসিহা তাহসিন।

এখনো ফুসফুস ক্যানসার নিয়ে রয়েছে নানা ভ্রান্ত ধারণা ও সচেতনতার অভাব। তাই এ পর্বে ফুসফুস ক্যানসার নিয়ে বিভিন্ন সচেতনতামূলক পরামর্শ দেন ডা. এ টি এম কামরুল হাসান। পর্বটি গত সোমবার সরাসরি প্রচারিত হয় প্রথম আলো ডটকম এবং প্রথম আলো, এসকেএফ অনকোলোজি ও এসকেএফের ফেসবুক পেজে।

দূষিত বাতাসে ঝুঁকি বাড়ে

অনুষ্ঠানের শুরুতে উপস্থাপক জানতে চান, ঢাকা শহরের মতো বায়ুদূষণের মাত্রা বেশি, এমন স্থানগুলোতে মানুষ ফুসফুস ক্যানসারের ঝুঁকি থেকে কীভাবে বাঁচবে?

উত্তরে ডা. এ টি এম কামরুল হাসান বলেন, বাতাসের মানের কারণে ঢাকা বসবাসের অযোগ্য হয়ে উঠছে। দূষিত বাতাসে রেডিয়াম, অ্যাসবেস্টস, রাসায়নিক ও ধূলিকণা থাকে, যা ফুসফুস ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ায়।

ডা. কামরুল হাসানের পরামর্শ, এসব স্থানে এর ঝুঁকি থেকে বাঁচতে ব্যক্তিপর্যায়ে সুরক্ষার জন্য মাস্ক ব্যবহার, ধূমপান পরিহার এবং ধুলাবালু এড়িয়ে চলা উচিত। সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে গাছ লাগানো এবং পরিবেশ পরিষ্কার রাখা জরুরি। তবে এ সমস্যা পুরোপুরি নির্মূল করতে হলে দূষণের উৎস বন্ধ করতে হবে।

জিনগত কারণে কি ফুসফুস ক্যানসার হওয়ার আশঙ্কা আছে? উপস্থাপকের এমন প্রশ্নের উত্তরে ডা. এ টি এম কামরুল হাসান বলেন, প্রত্যক্ষভাবে জিনগত কারণে ফুসফুস ক্যানসার হয় না। তবে কিছু জেনেটিক মিউটেশন যেমন ‘ইজিএফআর পজিটিভ’ হলে ফুসফুস ক্যানসার হতে পারে। তবে যদি পরিবারে কারও ধূমপানের অভ্যাস থাকে, তাহলে পরোক্ষ ধূমপানের কারণে ফুসফুসে ক্যানসার হতে পারে।

লক্ষণগুলো কী

ফুসফুস ক্যানসারের লক্ষণ সম্পর্কে ডা. এ টি এম কামরুল হাসান বলেন, ফুসফুস ক্যানসারে সাধারণত অনবরত কাশি, কাশির সঙ্গে রক্ত যাওয়া, শ্বাসকষ্ট ও বুকব্যথার মতো সমস্যাগুলো দেখা দেয়।

ডা. কামরুল হাসান বলেন, যাঁরা ধূমপান করেন, তাঁদের কাশির ধরনে পরিবর্তন এবং স্বরভঙ্গ দেখা দিতে পারে। তবে ক্যানসার ছড়িয়ে গেলে পেটে পানি জমে, হাড়ে ব্যথা দেখা দেয় এবং ব্রেনে ছড়িয়ে গেলে মাথাব্যথা বা চোখের অসুবিধা দেখা দিতে পারে।

বাংলাদেশে ফুসফুস ক্যানসার রোগের কারণ, ঝুঁকি, চিকিৎসাসহ নানা বিষয়ে পরামর্শ দেন ডা. এ টি এম কামরুল হাসান

রোগ নির্ণয়

প্রসঙ্গক্রমে উপস্থাপক ফুসফুস ক্যানসার শনাক্তের অপটিমাল মেথড সম্পর্কে জানতে চাইলে ডা. এ টি এম কামরুল হাসান বলেন, ক্যানসার হয়েছে কি না, এমন সন্দেহ হলে প্রাথমিকভাবে একটি সাধারণ বুকের এক্স-রে যথেষ্ট। তবে নিশ্চিত নির্ণয়ের জন্য চেস্ট সিটি স্ক্যান এবং কোর বায়োপসি (সিটি গাইডেড কোর নিডল বায়োপসি) করা জরুরি। কারণ, এ পরীক্ষাগুলো রোগের ধরন নির্ধারণ ও মলিকুলার টেস্টের মাধ্যমে সঠিক চিকিৎসা-পরিকল্পনা তৈরিতে অপরিহার্য ভূমিকা রাখে।

ডা. কামরুল হাসান বলেন, বর্তমানে বিশ্বজুড়ে এফএনএসি আর সুপারিশ করা হয় না। পাশাপাশি ফুসফুসের মাঝখানের টিউমারের ক্ষেত্রে ব্রঙ্কোস্কোপি আর রোগ শরীরের অন্য অংশে ছড়িয়েছে কি না, তা জানতে বোন স্ক্যান, এমআরআই বা আলট্রাসনোগ্রাম বা সিটি স্ক্যান করা হয়ে থাকে।

লো ডোজ সিটি স্ক্যান প্রসঙ্গে ডা. কামরুল হাসান বলেন, এটি এখনো সুপ্রতিষ্ঠিত কোনো প্রোটোকল নয়। ফুসফুস ক্যানসারের জন্য এখনো কোনো নিয়মিত স্ক্রিনিং প্রোগ্রাম নেই, যেমনটি স্তন বা জরায়ুমুখের ক্যানসারের ক্ষেত্রে রয়েছে। কিন্তু কিছু দেশে এটি স্ক্রিনিংয়ের উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হয় শুধু সেই ব্যক্তিদের জন্য, যাঁরা দীর্ঘদিন ধরে ধূমপায়ী, অন্তত ১৫ বছর বা তার বেশি সময় ধরে ধূমপান করেছেন এবং প্রতিদিন ২০–৩০টি সিগারেট সেবন করেন। তবে যেহেতু সিটি স্ক্যানে রেডিয়েশন ব্যবহার করা হয়, তাই এটি এখনো ব্যাপকভাবে প্রচলিত নয়।

ক্যানসারের স্টেজিং সম্পর্কে ডা. এ টি এম কামরুল হাসান বলেন, ফুসফুস ক্যানসারে স্টেজিংয়ের মাধ্যমে রোগীর চিকিৎসাপদ্ধতি, সুস্থতার হার এবং নিরাময়যোগ্যতা নির্ধারিত হয়। স্টেজ-১-এ শনাক্ত হলে রোগীর সাধারণত ৫ বছর বেঁচে থাকার সম্ভাবনা থাকে ৬৫ থেকে ৮০ শতাংশ পর্যন্ত এবং এ পর্যায়ে রোগটি সম্পূর্ণ নিরাময়যোগ্য। অন্যদিকে স্টেজ-৪-এ বেঁচে থাকার সম্ভাবনা ১ শতাংশের কম।

স্টেজ ও চিকিৎসা

ডা. এ টি এম কামরুল হাসান আরও বলেন, স্টেজ-৪-এ চিকিৎসা নিলেও গড় আয়ু থাকে প্রায় চার থেকে পাঁচ মাস। ফুসফুস ক্যানসারের চিকিৎসার প্রধান ধরনগুলোর মধ্যে রয়েছে সার্জারি, বিশেষত স্টেজ-১-এর ক্ষেত্রে সবচেয়ে কার্যকর ও কিউরেটিভ, কেমোথেরাপি, রেডিওথেরাপি, টার্গেট থেরাপি এবং ইমিউনোথেরাপি—যা তুলনামূলকভাবে নতুন ও কার্যকর পদ্ধতি হিসেবে উন্নত পর্যায়ে এবং এখন প্রাথমিক পর্যায়েও ব্যবহৃত হচ্ছে। স্টেজ-১-এ এসব চিকিৎসা একসঙ্গে প্রয়োগ করলে সম্পূর্ণ নিরাময়ের সম্ভাবনা থাকে।

আলোচনার শেষ পর্যায়ে ডা. এ টি এম কামরুল হাসান বলেন, সম্পূর্ণভাবে ভালো হয়ে গেলেও সাধারণত রোগীকে অন্তত পাঁচ বছর নিয়মিত ফলোআপে থাকা উচিত। প্রথম তিন বছর প্রতি তিন মাস পর চেকআপ করা উচিত, পরবর্তী দুই বছর অন্তর ছয় মাস পরপর চেকআপ যথেষ্ট। পাঁচ বছর পর থেকে প্রতিবছর একবার চেকআপ করতে সুপারিশ করা হয়।

ডা. কামরুল হাসান বলেন, যেহেতু ক্যানসার অনেক সময় ১৫ বছর পরও ফিরে আসতে পারে, তাই আজীবন ফলোআপে থাকা সবচেয়ে নিরাপদ। ঘন ঘন চেকআপের মূল উদ্দেশ্য হলো রোগ যদি ফিরে আসে, তা যেন দ্রুত শনাক্ত করা যায় এবং চিকিৎসা তৎক্ষণাৎ শুরু করা সম্ভব হয়।