লালমনিরহাট জেলার হাতীবান্ধা উপজেলা সদরে ভারত সীমান্তের কাছে খর্প নদ
লালমনিরহাট জেলার হাতীবান্ধা উপজেলা সদরে ভারত সীমান্তের কাছে খর্প নদ

বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত নদী তালিকার চেয়ে বেশি

যৌথ নদী কমিশন বাংলাদেশের তালিকা অনুযায়ী আন্তসীমান্ত নদী ৫৭টি। এর মধ্যে ভারতের সঙ্গে অভিন্ন নদী ৫৪টি, বাকি ৩টি মিয়ানমারের সঙ্গে। কিন্তু বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত নদী বাস্তবে আরও বেশি। মোট কতটি, তা নিশ্চিত করে কেউ বলতে পারেন না।

সরেজমিন নদীর তথ্য সংগ্রহ করে দেখেছি, বাংলাদেশ ও ভারত—উভয় দেশ দিয়ে প্রবাহিত অনেক নদীর নাম আন্তসীমান্ত নদীর তালিকায় নেই। রংপুর বিভাগে তালিকাভুক্ত নদীর বাইরে আর কত নদী আছে, তা জানার চেষ্টা করেছি। প্রচলিত ৫৪টির তালিকা অনুযায়ী ১৮টি নদী রংপুর বিভাগ দিয়ে প্রবাহিত। অথচ এখনো এই বিভাগে আমি ৬৩টি আন্তসীমান্ত নদীর খোঁজ পেয়েছি।

তালিকার দেওনাই-চাড়ালকাটা-যমুনেশ্বরী নদীর তথ্য নিয়েও প্রশ্ন আছে। খেড়ুয়া ও পাঙ্ঘা নামের দুটি নদী ভারত থেকে বাংলাদেশে এসে মিলেছে; মিলিত প্রবাহের নাম দেওনাই; কিন্তু খেড়ুয়া ও পাঙ্ঘার নাম প্রচলিত তালিকায় নেই। আমার হিসাবে, রংপুর বিভাগেই স্বীকৃতির বাইরে রয়েছে ৪৬টি নদী। জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন কিংবা পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের তালিকাতেও নেই—এমন আরও ১০টি নদী এই বিভাগে পেয়েছি।

বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত নদী বাস্তবে আরও বেশি। মোট কতটি, তা নিশ্চিত করে কেউ বলতে পারেন না।

আন্তসীমান্ত নদীর বিষয়ে কথা হলো ইতিহাস ও নদী-গবেষক মাহবুব সিদ্দিকীর সঙ্গে। তিনি জানান, সারা দেশে তিনি এখন পর্যন্ত ২২৩টি আন্তসীমান্ত নদীর সন্ধান পেয়েছেন। নদী-গবেষক ম ইনামুল হক ২০১৭ সালে প্রকাশিত তাঁর বাংলাদেশের নদনদী বইয়ে ১৬৭টি আন্তসীমান্ত নদীর কথা উল্লেখ করেছেন। নদী রক্ষাবিষয়ক সংগঠন রিভারাইন পিপলের মহাসচিব শেখ রোকন বলেন, ২০১৬ সালে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ভারত সরকারের কাছে আরও ১৬টি নদীকে দুই দেশের আন্তসীমান্ত নদী হিসেবে তালিকাভুক্ত করার প্রস্তাব দিয়েছিল; ভারত তা আমলে নেয়নি।

তিস্তার শাখা নদী মানাস, কাউনিয়া, রংপুর

তালিকায় শুধু ভারত থেকে বাংলাদেশে আসা নদীই বাদ পড়েনি, বাংলাদেশে উৎপন্ন হয়ে ভারতে গেছে, এমন নদীও আছে। প্রচলিত তালিকায় শুধু কুলিক নদের ক্ষেত্রে বাংলাদেশে উৎপন্ন হয়ে ভারতে যাওয়ার কথা উল্লেখ আছে। অথচ রংপুর বিভাগেই কুলিকের বাইরে এ রকম আরও ১১টি নদী পেয়েছি। এগুলোর মধ্যে আছে ঠাকুরগাঁওয়ের কাহালাই, জলই ও টাঙন; দিনাজপুরের তেঁতুলিয়া, নোনা, ভেলামতী ও ছোট যমুনা; পঞ্চগড়ের বেরং ও ডাহুক এবং লালমনিরহাটের চেনাকাটা ও খর্প। সারা দেশে খুঁজলে এমন নদী আরও পাওয়া যাবে বলে ধারণা করা যায়।

আমার হিসাবে, রংপুর বিভাগেই স্বীকৃতির বাইরে রয়েছে ৪৬টি নদী। জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন কিংবা পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের তালিকাতেও নেই—এমন আরও ১০টি নদী এই বিভাগে পেয়েছি।

তালিকায় বড় গরমিল

জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন ২০২৩ সালে বাংলাদেশের নদ-নদী: সংজ্ঞা ও সংখ্যা নামের একটি বই প্রকাশ করে। এতে সারা দেশে ১ হাজার ৮টি নদীর নাম উল্লেখ আছে। দুঃখজনকভাবে বইটি ভীষণ অবহেলায় প্রকাশ করা হয়েছে। এখানে আন্তসীমান্ত নদীর সংখ্যা ৬৮ উল্লেখ করা হয়েছে। এখানে যৌথ নদী কমিশন স্বীকৃত ৫৪টি নদীর মধ্যে ৪৪টি তালিকায় দেখা যায়। যৌথ নদী কমিশনের বাকি ১০টির নাম নদী কমিশনের তালিকায় থাকলেও সেগুলোকে আন্তসীমান্ত নদী বলা হয়নি। নদী কমিশনের তালিকায় আন্তসীমান্ত নদী হিসেবে আরও ২৪টি নদী দেখা যাচ্ছে। এর মধ্যে ১৭টি নদী পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের তালিকায় আছে।

কতটি নদী ভারত থেকে বাংলাদেশে এসেছে আর কতটি বাংলাদেশ থেকে ভারতে গেছে, তা সরকারের জানা জরুরি। ভারত উজানের দেশ। তাই এই হিসাব বাংলাদেশের জন্য আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ২০২৫ সালে বাংলাদেশের ১ হাজার ৪১৫টি নদ-নদীর একটি তালিকা প্রকাশ করে। এতে ১২৬টিকে বাংলাদেশ-ভারত আন্তসীমান্ত নদী বলা হয়েছে। প্রচলিত ৫৪টি নদীর মধ্যে ৪৩টি এই তালিকায় আন্তসীমান্ত হিসেবে চিহ্নিত; বাকি ১১টিকে তা বলা হয়নি। অর্থাৎ মন্ত্রণালয়ের তালিকাতেই প্রচলিত ৫৪টির বাইরে আরও ৮৩টি আন্তসীমান্ত নদীর উল্লেখ আছে।

দেশ স্বাধীন হওয়ার ৫৫ বছরেও আন্তসীমান্ত নদীর সংখ্যা চিহ্নিত করতে না পারার বিষয়টি বড় প্রশ্ন তৈরি করে। মূলত ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পরই এ কাজ করা প্রয়োজন ছিল। কতটি নদী ভারত থেকে বাংলাদেশে এসেছে আর কতটি বাংলাদেশ থেকে ভারতে গেছে, তা সরকারের জানা জরুরি। ভারত উজানের দেশ। তাই এই হিসাব বাংলাদেশের জন্য আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

লালমনিরহাটের পাটগ্রাম উপজেলায় জগৎবেড় ইউনিয়নে শালমারা নদী

আন্তসীমান্ত নদীর তালিকা স্পষ্ট না হলে ভারতের দিক থেকে নদীর পানি ইচ্ছেমতো প্রত্যাহার করার সুযোগ থাকে। কুড়িগ্রামের কালজানি, গদাধর ও গঙ্গাধর—তিনটিই বড় নদী। এগুলো যৌথ নদী কমিশনের তালিকায় না থাকলে পানি প্রত্যাহারের সময় ভারত বলতে পারে, নদীগুলো তো আন্তসীমান্ত নদীর তালিকাতেই নেই। এমন কথা বলার সুযোগ যাতে না থাকে, সে জন্য এসব নদীর স্বীকৃতি প্রয়োজন।

এ বিষয়ে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান ড. মুজিবুর রহমান হাওলাদারের সঙ্গে কথা হয়। তাঁর মতেও সব আন্তসীমান্ত নদীগুলো যৌথ নদী কমিশনের স্বীকৃতি থাকা প্রয়োজন। সরকারের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের অনেকে বিষয়টি এড়িয়ে যান। তাই যাঁরা নদী নিয়ে কাজ করেন, স্বীকৃতির দাবি তোলার দায়িত্ব তাঁদেরও আছে।

কুড়িগ্রামের কালজানি, গদাধর ও গঙ্গাধর—তিনটিই বড় নদী। এগুলো যৌথ নদী কমিশনের তালিকায় না থাকলে পানি প্রত্যাহারের সময় ভারত বলতে পারে, নদীগুলো তো আন্তসীমান্ত নদীর তালিকাতেই নেই। এমন কথা বলার সুযোগ যাতে না থাকে, সে জন্য এসব নদীর স্বীকৃতি প্রয়োজন।

সরকার চাইলে অল্প সময়েই দেশের আন্তসীমান্ত নদীগুলোর নির্ভুল তালিকা তৈরি করতে পারে। এ জন্য সীমান্তবর্তী প্রতিটি মৌজা সরেজমিন পরিদর্শন করে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত নদীগুলো চিহ্নিত করতে হবে। সংশ্লিষ্ট মৌজার সিএস, এসএ ও বিএস রেকর্ডও দেখতে হবে। তাতে অতীতে কোনো নদী ছিল, যা এখন মরে গেছে, সেটিও জানা যাবে।

বাংলাদেশ-ভারত যৌথ নদী কমিশন গঠিত হয় ১৯৭২ সালে। পরিবেশ ও পানিসম্পদ বিশেষজ্ঞ আইনুন নিশাত ১৯৮১ সালের ডিসেম্বর থেকে ১৯৯৯ সাল পর্যন্ত কমিশনের অনারারি সদস্য ছিলেন। আন্তসীমান্ত নদীর হিসাবের গরমিল নিয়ে এই নদীবিশেষজ্ঞ বলেন, বাংলাদেশ ও ভারতের অভিন্ন নদীর সংখ্যা ৫৪ নির্ধারণের সময় সরেজমিন পরিদর্শন করা হয়নি; হয়ে থাকলেও তা যথাযথ ছিল না। তাঁর মতে, বিষয়টি বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ভারতের কাছে উপস্থাপন করা প্রয়োজন। কিন্তু সরকারের দীর্ঘদিনের অবহেলায় সব আন্তসীমান্ত নদীকে দুই দেশের যৌথ তালিকায় আনা যায়নি। অথচ প্রতিটি আন্তসীমান্ত নদীর স্বীকৃতি জরুরি।

তুহিন ওয়াদুদ: বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ও নদী রক্ষাবিষয়ক সংগঠন রিভারাইন পিপলের পরিচালক

wadudtuhin@gmail.com