অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ। আজ শুক্রবার রাজধানীর বিজয়নগরের ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরাম মিলনায়তনে আয়োজিত সেমিনারে
অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ। আজ শুক্রবার রাজধানীর বিজয়নগরের ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরাম মিলনায়তনে আয়োজিত সেমিনারে

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তিতে বাংলাদেশের কোনো অগ্রাধিকার নেই: আনু মুহাম্মদ

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তিতে বাংলাদেশের কোনো অগ্রাধিকার দেখছেন না অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ। বর্তমান সরকারের কাছে তাঁর দাবি, এই চুক্তির বিরুদ্ধে যেন প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়। চুক্তি স্বাক্ষরকারীদের বিরুদ্ধে যেন প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়।

‘যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তি কেন বাংলাদেশের জন্য বিপজ্জনক’ শীর্ষক সেমিনারে সভাপ্রধানের বক্তব্যে এসব কথা বলেন আনু মুহাম্মদ। আজ শুক্রবার সকাল সাড়ে ১০টায় রাজধানীর বিজয়নগরের ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরাম মিলনায়তনে এই সেমিনারের আয়োজন করা হয়। আয়োজক গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটি।

আনু মুহাম্মদ বলেন, বিএনপির নির্বাচনী স্লোগান ‘সবার আগে বাংলাদেশ’। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যদি সত্যিই মনে করেন যে সবার আগে বাংলাদেশ, তাহলে অবশ্যই তিনি যেন এই চুক্তির বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। চুক্তি স্বাক্ষরকারীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করেন।

চুক্তিটি কার্যকর হওয়ার আগে তা নিয়ে তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার ও বর্তমান সরকারের কতিপয় ব্যক্তির তৎপরতায় হতাশা প্রকাশ করেন আনু মুহাম্মদ। তিনি বলেন, এখন পর্যন্ত বাংলাদেশে এই চুক্তি, চুক্তির সঙ্গে সম্পর্কিত তৎপরতায় তাঁরা যেটা দেখেছেন, সেটা হচ্ছে—সবার আগে যুক্তরাষ্ট্র। তাঁরা এই অবস্থার পরিবর্তন চান।

চুক্তিটি নিয়ে এই অর্থনীতিবিদ বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বাংলাদেশকে ভয়ংকর বিপদের মধ্যে ফেলা হয়েছে। এই বিপদ থেকে বাঁচার বিষয়ে উদ্বেগের মধ্যে আছেন। কারণ, সে সময়ে যাঁরা চুক্তির সঙ্গে ছিলেন, তাঁদের একজন খলিলুর রহমান। তাঁকেই বিএনপি পররাষ্ট্রমন্ত্রী বানিয়েছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী হওয়ার পর তিনি বলেছেন, যে চুক্তিটি করেছেন, সেটা খুব ভালো চুক্তি।

আনু মুহাম্মদ বলেন, ‘চিন্তা করেন, এ রকম একটা চুক্তিকে যিনি ভালো বলেন, তিনি বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। এবং তিনি আবার এটাও দাবি করছেন যে বিএনপি–জামায়াত জানত।’

চুক্তিটির বিরুদ্ধে বিএনপির কঠোর অবস্থান নেওয়া উচিত বলে মত দেন আনু মুহাম্মদ। তিনি বলেন, সরকারি দল হিসেবে বিএনপির প্রধান কাজ হচ্ছে, খলিলুর রহমানের এই বক্তব্য যে ঠিক নয়, তা প্রমাণ করা। এ জন্য চুক্তির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়া উচিত।

সংসদে জনগণের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা ও সম্মতি ছাড়া জাতীয় স্বার্থবিরোধী কোনো চুক্তিতে ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ স্লোগান অর্থহীন বাগাড়ম্বরে পরিণত হবে বলে মন্তব্য করেন আনু মুহাম্মদ।

চুক্তির ব্যাপারে তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের ভূমিকার সমালোচনা করেন আনু মুহাম্মদ। তিনি বলেন, গত বছর বাজেট নিয়ে আলোচনার সময়ই তাঁরা কিছু কিছু বিষয়ে আপত্তি তুলেছিলেন। সরকারের দিক থেকে বলা হয়েছিল, যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি বাড়াতে হবে। যুক্তরাষ্ট্র থেকে মাছ, মাংস, অস্ত্র আমদানি করতে হবে। গত বছর এসব কথা যখন বলা হয়েছিল, তখন চুক্তি স্বাক্ষর হয়নি। তখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বাণিজ্য–সংক্রান্ত উন্মাদনা শুরু হয়েছে মাত্র। অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্র থেকে চাপ যতটা ছিল, চুক্তির বিষয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের উৎসাহ ছিল তার চেয়ে বেশি।

আনু মুহাম্মদ অভিযোগ করেন, চুক্তি স্বাক্ষর হওয়ার আগেই অন্তর্বর্তী সরকার সেটি কার্যকর করেছিল। অন্তর্বর্তী সরকারের আগ্রহ এই পর্যায়ে চলে যায় যে জাতীয় নির্বাচনের মাত্র তিন দিন আগে তারা চুক্তি স্বাক্ষর করে।

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তি বাংলাদেশের অর্থনীতিসহ জাতীয় স্বার্থের জন্য উদ্বেগজনক হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন এই অর্থনীতিবিদ। তিনি বলেন, চুক্তির বিভিন্ন শর্ত দেশের আমদানি–রপ্তানিনীতি, শিল্প খাত ও কর্মসংস্থানের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে। চুক্তির মাধ্যমে বাংলাদেশকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রয়োজন অনুযায়ী নির্দিষ্ট কিছু পণ্য আমদানি ও রপ্তানির শর্তে বাধ্য করা হতে পারে। এতে দেশের অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারণের স্বাধীনতা কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

আনু মুহাম্মদ বলেন, বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানির বড় বাজার যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু সেখানে দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশকে তুলনামূলক বেশি শুল্ক দিতে হয়। যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের জন্য স্বল্পোন্নত দেশের বাণিজ্যসুবিধা দেয়নি। বাংলাদেশকে সেখানে প্রবেশের জন্য বর্তমানে গড়ে প্রায় ১৬ শতাংশ শুল্ক দিতে হয়।

বাণিজ্যচুক্তির ফলে দেশের কৃষি, গ্রামীণ অর্থনীতি বিশেষ করে পোলট্রি, মৎস্য, দুগ্ধসহ বিভিন্ন খাতে বর্তমানে দেশে যে কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে, তা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেন আনু মুহাম্মদ। জাতীয় স্বার্থ, অর্থনৈতিক বাস্তবতা ও সংশ্লিষ্ট সব খাতের মতামত বিবেচনায় নিয়ে চুক্তির বিষয়ে সংসদে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

আনু মুহাম্মদ বলেন, বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময় চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল নিয়ে চুক্তির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। এ ব্যাপারে কতিপয় লোকের উন্মাদনা, উন্মাদনার মতো অস্থিরতা ছিল।

এ ব্যাপারে তৎকালীন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমান, বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী, তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ দূত লুৎফে সিদ্দিকী ও তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের ভূমিকার প্রসঙ্গ তুলে আনু মুহাম্মদ বলেন, চুক্তির ব্যাপারে তাঁদের সবার আগ্রহ ছিল। তবে চুক্তি তাঁরা করতে পারেননি শুধু শ্রমিকদের আন্দোলনের কারণে।

সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব বিজনেস অ্যাগ্রিকালচার অ্যান্ড টেকনোলজির অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক গোলাম রসুল।

সেমিনারে আরও বক্তব্য দেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী জ্যোতির্ময় বড়ুয়া, উন্নয়ন অর্থনীতিবিষয়ক গবেষক মাহা মির্জা ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাউন্টিং বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মোশাহিদা সুলতানা।