বইয়ের মেলা প্রাণের মেলা

‘বই পড়তেই হবে’

একুশে বইমেলা
ফাইল ছবি

বিকেলে মেলার মাঠে প্রবেশের সময় মাঝবয়সী একজনের সাদা শার্টের বুকপকেটে রাখা মুঠোফোনে বেজে উঠল রিংটোন। চায়নিজ সেটের কিনকিনে আওয়াজে ‘ও আমার দেশের মাটি তোমার পরে ঠেকাই মাথা’ শুনে কেউ বিরক্ত হয়েছেন। কেউ ঠিকই একবার ঘুরে তাকিয়েছেন। দেখতে সরল মানুষটি একাই এসেছিলেন মেলায়। এমন মানুষ আরও একজনকে পাওয়া গেল মেলার মাঠে।

গেরুয়া রঙের পোশাকে, হাতে নিজের বানানো পাঁচ তারের সরাজ নিয়ে এসেছিলেন নেত্রকোনার আবদুর রহমান বয়াতী। বাজিয়ে শোনালেন ‘এই পদ্মা, এই মেঘনা’ গানের সুর। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের শেষ মাথায় শিশুচত্বরের কাছে তখন কথাসাহিত্যিক জাফর ইকবালকে ঘিরে ফেলেছে অনেকে। অটোগ্রাফ আর ছবি তুলতে চাইছে সবাই। প্রথম আলোকে জাফর ইকবাল বলেন, শিশু–কিশোরেরা প্রযুক্তির মাধ্যমে বই পড়লে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। তবে খেয়াল রাখতে হবে—সেই ডিভাইসে সে বই পড়ছে, নাকি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করছে। যে মাধ্যমেই পড়ুক, বই পড়তেই হবে। ওরাই তো ভবিষ্যৎ।

প্রথমা প্রকাশনে তখন কিশোর পাঠক খুঁজেছেন দীপেন ভট্টাচার্যের লেখা সায়েন্স ফিকশন নিওলিথ স্বপ্ন

গতকাল সোমবার তুলনামূলক ভিড় একটু কমই ছিল। স্টলে দাঁড়িয়ে শান্তিতে বই খুঁজতে পেরেছে পাঠক। গতকাল বইমেলায় নতুন বই এসেছে ১০০টি। প্রথমা প্রকাশনের ব্যবস্থাপক জাকির হোসেন আনন্দমুখ নিয়ে জানান, দিল্লির একটি এজেন্সি এসে ৩০টি শিরোনামের বইয়ের অর্ডার করে গেছে। এর মধ্যে প্রথমা থেকে প্রকাশিত অধ্যাপক আলী রীয়াজের লেখা সবকটি বই আছে। ডি কে নামের এ এজেন্সির অনিল কুমার প্রথমাকে জানান, দিল্লিতে বসবাসরত বাংলা ভাষার মানুষেরা প্রথমার এই বইগুলো পড়তে চেয়েছেন।

বাংলাভাষী মানুষের বইয়ের পছন্দের প্রসঙ্গে আসে এবারের মেলায় আগামী প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত আহমদ শরীফ স্মারক বক্তৃতা সমগ্র বইটির কথা। আগামী প্রকাশনীর প্যাভিলিয়নে দাঁড়িয়ে কমলা রঙের বইটি খুলতেই মাঝামাঝি দেখা গেল ‘সংস্কৃতি’ নিয়ে একটি বক্তৃতা। সেখানে লেখক দেখিয়েছেন , কত রকমভাবে ইতিহাসের বিভিন্ন পর্বে এই শব্দের অর্থগত পরিবর্তন হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ এই বই দেখতে দেখতে কানে এলো, একজন পাঠক এসে খুঁজছেন আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরীর লেখা ‘বাংলাদেশের জাতীয় মুক্তির পথ’ বইটি। ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’ গানটির সঙ্গে পরিচয় নেই এমন মানুষ তো এদেশে খুঁজে পাওয়া যাবে না। বিশ্ববাসীও জানে এ গানের সুর।

কিশোর–কিশোরীরা বাংলা ভাষার সাহিত্য পাঠে আগ্রহী নয় এমন অভিযোগ প্রায়ই শোনা যায়। সোমবারের মেলায় অল্প মানুষের ভিড়েও ছোট্ট একটি ঘটনায় অমূলক মনে হয় এমন অভিযোগ। রাজধানীর বিএএফ শাহীন কলেজ থেকে এসেছিলেন একাদশ বর্ষের দুই ছাত্রী নুসরাত জাহান আর তাসনিম হোসেন (ঐশী)। প্রযুক্তি দিয়ে বই পড়ার ব্যবস্থা আছে মেলার মাঠের একটি স্টলে। কৌতুহল নিয়ে দুই বন্ধু দাঁড়ালেন সেখানে। বইয়ের বাংলা লেখা শব্দের ওপর একটা কলম (ডিজিটাল লার্নিং পেন) ধরলে সে বলে দিচ্ছে কী লেখা আছে। জীবনে প্রথমবারের মতো মেলায় আসা নুসরাত বললেন, বই হাতে নিয়ে উল্টেপাল্টে না পড়লে পড়া হয়? পাশ থেকে তাসনীম মন্তব্য করলেন, ঠিক বলেছিস দোস্ত বইয়ের একটা ঘ্রাণ আছে। দেখা গেল এই দুই শিক্ষার্থীর ব্যাগে তখন সদ্য কেনা ৫টি বই।

সন্ধ্যার মুখে ক্লান্ত এক শিক্ষার্থীর মুখে এ কথা শুনে তরুণদের বই পড়া নিয়ে প্রত্যাশা বাড়ে বহুগুণ।