
করিডরজুড়ে গড়ে উঠেছে নানা ধরনের স্থাপনা, সড়ক, রেললাইন। এতে সংকুচিত হয়েছে হাতির চলাচলের পথ; বাড়ছে হাতি ও মানুষের সংঘাতও।
খাদ্য ও পানির সন্ধানে হাতিকে এক বন থেকে অন্য বনে চলাচল করতে হয়। যে পথ ধরে হাতি চলাচল করে, সেগুলো ‘করিডর’ নামে পরিচিত। তিন দশক আগেও হাতির দল এসব করিডর দিয়ে নির্বিঘ্নে চলাচল করতে পারত। সে চিত্র পাল্টে গেছে এখন। করিডরজুড়ে গড়ে উঠেছে নানা ধরনের স্থাপনা, সড়ক, রেললাইন। এতে সংকুচিত হয়েছে হাতির চলাচলের পথ; বাড়ছে হাতি ও মানুষের সংঘাতও।
প্রকৃতি সংরক্ষণের আন্তর্জাতিক জোট আইইউসিএন ২০১৬ সালে ‘এটলাস: এলিফ্যান্ট রুটস অ্যান্ড করিডরস ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক এক গবেষণায় চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে হাতির চলাচলের ১২টি করিডর শনাক্ত করে। এর মধ্যে আটটিই পড়েছে কক্সবাজার অঞ্চলে। বাকি চারটির মধ্যে চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া উপজেলায় দুটি এবং লোহাগাড়া উপজেলায় দুটি। এর মধ্যে রোহিঙ্গা ক্যাম্পের কারণে উখিয়া উপজেলার উখিয়া–ঘুমধুম করিডর সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেছে। রেললাইন ও সেনানিবাসের কারণে বন্ধ হয়ে গেছে রামু উপজেলার তুলাবাগান–পানেরছড়া করিডর। এসব করিডর দেড় কিলোমিটার থেকে সাড়ে চার কিলোমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত।
হাতি সংরক্ষণে সরকার একটি নতুন প্রকল্প অনুমোদন দিয়েছে। এ প্রকল্পের আওতায় হাতির করিডরগুলো নতুন করে জরিপ ও পর্যালোচনা করা হবে। হাতির বিদ্যমান করিডরগুলো বিভিন্ন কারণে সংকুচিত হয়ে এসেছে। সেগুলোকে কীভাবে পুনরুদ্ধার করা যায়, সেটার একটা কর্মপরিকল্পনা নেওয়া হবে।ছানাউল্যা পাটোয়ারি, বন অধিদপ্তরের বন্য প্রাণী ও প্রকৃতি সংরক্ষণ অঞ্চলের বন সংরক্ষক (কনজার্ভেটর অব ফরেস্ট)
এলিফ্যান্ট এটলাস উল্লেখ করেছে, সীমান্তে কাঁটাতারের কারণে খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটিসংলগ্ন দুটি আন্তর্জাতিক করিডরও বন্ধ হয়ে গেছে। শেরপুর, জামালপুর, ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা, মৌলভীবাজারসংলগ্ন মেঘালয় সীমান্ত এখনো আন্তসীমান্ত হাতির (যেসব হাতি ভারত ও বাংলাদেশে চলাচল করে) যাতায়াত আছে।
বন্য প্রাণী বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্ষায় চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের বনাঞ্চলে নানা ধরনের উদ্ভিদের প্রাচুর্য বাড়ে। বনের মধ্যেই খাদ্যের সংস্থান হয় হাতির। গ্রীষ্মকালে বনাঞ্চল শুকিয়ে এলে খাদ্যের সন্ধানে বন থেকে বেরিয়ে পড়ে বিশালদেহী এসব প্রাণী। এ সময় এক বন থেকে অন্য বনে যেতে হাতি করিডর ব্যবহার করে। করিডরজুড়ে গড়ে ওঠা অবকাঠামোর কারণে হাতি ও মানুষের সংঘাত তৈরি হচ্ছে।
আইইউসিএনের এলিফ্যান্ট এটলাস গবেষণায় সারা দেশে বন বিভাগের ৯ বিভাগীয় বন এলাকার ৪৪টি রেঞ্জে হাতির উপস্থিতি পাওয়া গিয়েছিল।
জানতে চাইলে বন অধিদপ্তরের বন্য প্রাণী ও প্রকৃতি সংরক্ষণ অঞ্চলের বন সংরক্ষক (কনজার্ভেটর অব ফরেস্ট) ছানাউল্যা পাটোয়ারি প্রথম আলোকে বলেন, হাতি সংরক্ষণে সরকার একটি নতুন প্রকল্প অনুমোদন দিয়েছে। এ প্রকল্পের আওতায় হাতির করিডরগুলো নতুন করে জরিপ ও পর্যালোচনা করা হবে। হাতির বিদ্যমান করিডরগুলো বিভিন্ন কারণে সংকুচিত হয়ে এসেছে। সেগুলোকে কীভাবে পুনরুদ্ধার করা যায়, সেটার একটা কর্মপরিকল্পনা নেওয়া হবে।
করিডর বন্ধ হলে কী হয়
আইইউসিএনের ‘এলিফ্যান্ট এটলাস: এলিফ্যান্টস রুটস অ্যান্ড করিডোরস ইন বাংলাদেশ’ গবেষণা বলছে, হাতির অস্তিত্ব রক্ষায় জিনগত বৈচিত্র্য টিকিয়ে রাখা জরুরি। জিনগত বৈচিত্র্য কমে এলে হাতি প্রজাতি হিসেবে প্রতিকূল পরিবেশে টিকে থাকতে পারবে না। করিডর হয়ে হাতি এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে যাতায়াত করে। করিডর সংকুচিত হলে হাতি একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলে আবদ্ধ হয়ে পড়বে। এতে তার জিনগত বৈচিত্র্য কমে আসবে। ফলে প্রতিকূল পরিবেশে হাতির টিকে থাকার সক্ষমতা কমতে থাকবে।
জানতে চাইলে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও আইইউসিএনের এলিফ্যান্ট স্পেশালিস্ট গ্রুপের সদস্য এম এ আজিজ প্রথম আলোকে বলেন, ‘পাশাপাশি দুটি বনের মধ্যে সংযোগকারী পথ হলো করিডর। এই করিডর হাতির চলাচলের ঐতিহাসিক রাস্তা। একই রাস্তায় তাদের পূর্বসুরিরাও চলাচল করেছে। তিনি বলেন, হাতি খুবই স্মৃতিশক্তিসম্পন্ন প্রাণী। ফলে তারা এই করিডর ধরে চলাচল করতে চায়। তা ছাড়া আমাদের হাতির বিচরণকৃত বনাঞ্চল খণ্ডবিখণ্ড হয়ে পড়েছে। এ কারণে করিডর হাতির জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ।’
বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬ সাল থেকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ১৪৬টি হাতির মৃত্যু হয়েছে। প্রকৃতি সংরক্ষণের আন্তর্জাতিক জোট আইইউসিএন হাতিকে ক্রিটিক্যালি এনডেঞ্জারড বা মহাবিপদাপন্ন হিসেবে তালিকভুক্ত করেছে। এর মানে হলো, হাতি আগামী কয়েক দশকের মধ্যে বিলুপ্তির ঝুঁকিতে আছে।
আমাদের যে কয়েকটি হাতির করিডর আছে, তার অধিকাংশই কমবেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে জানিয়ে অধ্যাপক এম এ আজিজ বলেন, বেশ কয়েকটি করিডর পুরোপুরি ধ্বংস হয়েছে। এর ফলে হাতি–মানুষের দ্বন্দ্ব বাড়ছে। দ্বিতীয়ত, করিডর ক্ষতিগ্রস্ত হলে পাশাপাশি বনাঞ্চলের হাতির দলের মধ্যে আন্তপ্রজনন বাধাগ্রস্ত হবে। এতে দীর্ঘ মেয়াদে হাতির টিকে থাকার ক্ষমতা হ্রাস পাবে।
বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬ সাল থেকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ১৪৬টি হাতির মৃত্যু হয়েছে। প্রকৃতি সংরক্ষণের আন্তর্জাতিক জোট আইইউসিএন হাতিকে ক্রিটিক্যালি এনডেঞ্জারড বা মহাবিপদাপন্ন হিসেবে তালিকভুক্ত করেছে। এর মানে হলো, হাতি আগামী কয়েক দশকের মধ্যে বিলুপ্তির ঝুঁকিতে আছে।
হাতির করিডরের মধ্যে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক দুই ধরনের করিডর আছে। সবগুলো করিডরই নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। ময়মনসিংহ এলাকায় ভারত সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া দিয়েছে। ফলে হাতির স্বাভাবিক চলাচল বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।ড. রেজা খান, বন্য প্রাণী বিশেষজ্ঞ
‘সরকারকে আগ্রহী হতে হবে’
২০১৬ সালে আইইউসিএন আরেকটি গবেষণা চালায়, নাম ‘এলিফ্যান্ট স্ট্যাটাস ইন বাংলাদেশ’। সেখানে বাংলাদেশে মোট ২৬৮টি হাতির সন্ধান পায় প্রকৃতি সংরক্ষণের এ আন্তর্জাতিক জোট। এর মধ্যে চট্টগ্রাম দক্ষিণ বন বিভাগে ৬৫টি, কক্সবাজার উত্তর বন বিভাগে ৫৪টি, কক্সবাজার দক্ষিণ বন বিভাগে ৬৩টি, লামা বন বিভাগে ৩০টি, বান্দরবান বন বিভাগে ১১টি, পার্বত্য চট্টগ্রাম দক্ষিণ বন বিভাগে ২৮টি এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম উত্তর বন বিভাগে ১৭টি। ২৬৮টি হাতির মধ্যে পুরুষ হাতি ৬৭টি ও স্ত্রী হাতি ১৭২টি। বাচ্চা হাতির সংখ্যা ২৯টি।
বন্য প্রাণী বিশেষজ্ঞ ড. রেজা খান প্রথম আলোকে বলেন, হাতির করিডরের মধ্যে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক দুই ধরনের করিডর আছে। সবগুলো করিডরই নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। ময়মনসিংহ এলাকায় ভারত সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া দিয়েছে। ফলে হাতির স্বাভাবিক চলাচল বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
হাতির মতো বিশালদেহী প্রাণী একটা নির্দিষ্ট অঞ্চলে আটকে পড়লে সেটা তার দৈনন্দিন খাবারের চাহিদা মেটানোর ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জ তৈরি করে জানিয়ে রেজা খান বলেন, ‘আমাদের দেশের অভ্যন্তরীণ করিডরগুলোতেও নানামুখী চাপ আছে। আফ্রিকার অনেক দেশ, আমাদের প্রতিবেশী দেশ নেপালও বন্য প্রাণীর করিডর পুনরুদ্ধার করে বন্য প্রাণীর সংখ্যা বাড়িয়েছে।’ তিনি বলেন, এখন প্রশ্ন হলো সরকারের অগ্রাধিকার তালিকায় বন্য প্রাণীর সুরক্ষার বিষয়টি আছে কি না। সরকারকে আগ্রহী হতে হবে। তাহলে করিডরগুলো পুনরুদ্ধার করা সম্ভব।