মাগুরার রিপন মোল্লা রাজধানীর একটি বাসায় নিরাপত্তা প্রহরীর কাজ করতেন; কিন্তু সেই চাকরির আয়ে সংসার চলত না। মাসের শেষে প্রায়ই আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে ধার করে সংসার চালাতে হতো। পরে চাকরি ছেড়ে ভ্যানগাড়িতে আলু, পেঁয়াজ, আদা, রসুনসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য বিক্রি শুরু করেন। কিন্তু সেই ব্যবসায়ও তেমন লাভ হচ্ছিল না। শেষ পর্যন্ত চকবাজার থেকে প্লাস্টিকের খেলনা, পুতুল ও গৃহসজ্জার বিভিন্ন সামগ্রী এনে ফেরি করে বিক্রি শুরু করেন।
রাজধানীর জিয়া উদ্যান (চন্দ্রিমা উদ্যান) সংলগ্ন লেকপাড়ের ফুটপাতে গতকাল শুক্রবার বিকেলে রিপনের সঙ্গে কথা হয়। তিনি বলেন, নতুন ব্যবসার আয়েও সংসারের অভাব কাটছে না। বাধ্য হয়ে বড় ছেলে সজীবকে গ্রামে নানার বাড়িতে পাঠিয়ে দিয়েছেন। ঢাকার কল্যাণপুরে স্ত্রী শাহনাজ বেগম, পাঁচ বছর বয়সী ছেলে ফাহাদ ও দেড় বছর বয়সী মেয়ে রাফসাকে নিয়ে এক কক্ষের ভাড়া বাসায় থাকেন তিনি।
রিপন মোল্লা প্রথম আলোকে বলেন, ‘প্রতিদিন ব্যবসা হয় না। প্রায় সময় উঠাইয়া দেয়। বেচাকেনা ভালো হইলে তিন-সাড়ে তিন হাজার টাকার খেলনা বিক্রি হয়। তহন লাভ থাকে ৮০০-৯০০ টাকা। কিন্তু সংসারে খরচার যে চাপ, এই টাকায় চলা কঠিন হইয়া যায়।’ তিনি আরও বলেন, ‘সংসার খরচা অনেক বাইড়া গেছে। যেসব মাল আইনা বেচি, এগুলার দামও বাইড়া গেছে। বেইচা বেশি লাভও থাকে না। তাই ইনকাম বাড়ে নাই; কিন্তু খরচা বাইরা গেছে। এহনো ধারকর্জ কইরা চলা লাগে।’
সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে জানিয়ে রিপন বলেন, ‘আমগোর আর ভালোমন্দ খাওয়া কী? কোনোমতে তিন বেলা খাওন জুটে।’
‘বেতনের টাকা সব খরচা হইয়া যায়’
রাজধানীর মোহাম্মদপুরের মানসুরাবাদ এলাকার একটি পোশাক কারখানায় চাকরি করেন মোহাম্মদ মাইদুল। অবিবাহিত মাইদুলের সংসারে রয়েছেন তাঁর মা আলেহা বেগম, ছোট ভাই শাহাদাৎ ও ভাগনি জান্নাত। ভাগনির মা-বাবা নেই।
পোশাক কারখানার চাকরিতে মাইদুলের বেতন মাসে ২০ হাজার টাকা। তিনি বলেন, সপ্তাহে এক দিন শুক্রবার ছুটি পান। তবে সেদিন ঘরে বসে না থেকে বাড়তি আয়ের জন্য বেলুন বিক্রি করেন তিনি।
রাজধানীর জিয়া উদ্যানে গতকাল পাওয়া যায় মাইদুলকে। তিনি জানান, একটি কারখানা থেকে ৫০-৬০টি গ্যাস ভরা বেলুন এনে প্রতিটি ১০০ টাকায় বিক্রি করেন। প্রতিটি বেলুনে প্রায় ৪০ টাকা লাভ থাকে। একেক শুক্রবার ২০-৩০টি বেলুন বিক্রি হয়।
মাইদুল বলেন, ‘বেতনের টাকা সব খরচা হইয়া যায়। তাই ছুটির দিনে বেলুন বেচি।’
‘আগেই হিসাব-নিকাশ করে নিচ্ছি’
একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ইমরান হোসেন। পড়াশোনার পাশাপাশি নিজ হাতে তৈরি জিপসামের গৃহসজ্জার শোপিস ও মোমদানি বিক্রি করেন তিনি। মিরপুর ১২-এর ডি-ব্লকে বোনের বাসায় থাকেন। প্রতি শুক্রবার বিকেলে জিয়া উদ্যানে এবং অন্যান্য দিন ক্লাস শেষে ডি-ব্লকের ঈদগাহ মাঠে বসেন তিনি। শোপিস তৈরির জিপসাম ও ফ্রেম কেনেন চকবাজার থেকে।
ইমরান প্রথম আলোকে বলেন, ‘বাড়ি থেকে নেওয়া তিন হাজার টাকা দিয়ে ব্যবসা শুরু করি। এর মধ্যে ২ হাজার ৬০০ টাকায় মালপত্র কিনেছিলাম। এখন এই ব্যবসার আয় দিয়েই পড়াশোনার খরচ চালাই।’