জ্বালানি তেল
জ্বালানি তেল

ডিজেলের আরও জাহাজ আসছে

  • এপ্রিলে ডিজেলের চাহিদা চার লাখ টন।

  • বর্তমানে জরুরি ব্যবহারযোগ্যসহ মজুত দুই লাখ টন।

  • ১ লাখ ৬৫ হাজার টন ডিজেল নিয়ে জাহাজ আসার নিশ্চয়তা।

  • ভারত থেকে পাইপলাইনে আসছে ২০ হাজার টন।

  • এর বাইরে ৪ লাখ ৬০ হাজার টন কেনার প্রস্তাব অনুমোদন।

জ্বালানি তেল নিয়ে আরও জাহাজ আসছে। আগামীকাল শুক্রবার ৬০ হাজার টন ডিজেল নিয়ে চট্টগ্রামে দুটি জাহাজ পৌঁছার কথা রয়েছে। এ মাসে ডিজেল নিয়ে আরও অন্তত চারটি জাহাজ আসার নিশ্চয়তা পেয়েছে সরকার। তাই ডিজেলের মজুত কমে এলেও সরবরাহ ধরে রাখা নিয়ে আপাতত শঙ্কা দেখছে না জ্বালানি বিভাগ।

জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ বলছে, এপ্রিলে ডিজেলের চাহিদা চার লাখ টন। বর্তমানে চলমান মজুত আছে প্রায় সোয়া লাখ টন। এর বাইরে আরও ৮০ হাজার টন ডিজেল মজুত রয়েছে, যা চাইলে জরুরি প্রয়োজনে ব্যবহার করা যাবে। এ মাসে আরও সোয়া তিন লাখ টন ডিজেল আমদানির পরিকল্পনা আছে। ইতিমধ্যে ১ লাখ ৬৫ থেকে ৬৮ হাজার টন ডিজেল আসার নিশ্চয়তা পাওয়া গেছে।

জ্বালানি তেল আমদানি ও সরবরাহের কাজটি করে সরকারি সংস্থা বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)।

বিপিসির সূত্র বলছে, নিয়মিত তেল সরবরাহকারী চীনের কোম্পানি ইউনিপ্যাক সিঙ্গাপুর থেকে ৩ এপ্রিল (শুক্রবার) দুটি জাহাজে ৬০ হাজার টন ডিজেল আসছে। একই কোম্পানি এ মাসেই আরও দুটি জাহাজ জ্বালানি তেল সরবরাহ করবে।

এর মধ্যে একটিতে ৩০ হাজার টন ডিজেল ও আরেকটিতে ১৫ থেকে ১৮ হাজার টন ডিজেলের সঙ্গে ১০ হাজার টন জেট ফুয়েল আসার কথা। এ ছাড়া ইন্দোনেশিয়ার কোম্পানি বিএসপি থেকে এ মাসেই ৩০ হাজার টন করে দুটি জাহাজে ৬০ হাজার টন ডিজেল আসার কথা রয়েছে। এর বাইরে চুক্তি অনুযায়ী ভারত থেকে পাইপলাইনে ২০ হাজার টন ডিজেল আসবে এ মাসে।

চাহিদার চেয়ে বাড়তি ডিজেল কেনা হয়েছে। নতুন নতুন উৎস থেকে ডিজেল আসছে। জ্বালানি তেলের কোনো সংকট হবে না
ইকবাল হাসান মাহমুদ, জ্বালানিমন্ত্রী

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু প্রথম আলোকে বলেন, চাহিদার চেয়ে বাড়তি ডিজেল কেনা হয়েছে। নতুন নতুন উৎস থেকে ডিজেল আসছে। পর্যাপ্ত অকটেন সরবরাহ নিশ্চিত করা হয়েছে। চাহিদার অতিরিক্ত তিন মাসের মজুত তৈরির পরিকল্পনা নিয়ে এগোনো হচ্ছে। তাই জ্বালানি তেলের কোনো সংকট হবে না।

নতুন উৎস থেকে আসবে ডিজেল

বিপিসি সূত্র বলছে, চাহিদা অনুসারে আগামী জুন পর্যন্ত জ্বালানি তেল আগে থেকেই কেনা আছে। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরুর পর সময়মতো জাহাজ আসতে না পারায় কিছুটা টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে। গত মাসে ৬টি ডিজেলের জাহাজ আসতে না পারায় দেড় লাখ টন ডিজেলের মজুত কমেছে। এর মধ্যে যুদ্ধ নিয়ে আতঙ্কের কারণে বাড়তি জ্বালানি কেনার প্রবণতা তৈরি হয়েছে। গত বছরের মার্চের তুলনায় এবার মার্চে ডিজেল ও পেট্রল সরবরাহ কিছুটা কমানো হলেও অকটেনের সরবরাহ হয়েছে আগের চেয়ে বেশি।

জ্বালানি বিভাগ বলছে, এ অ্যান্ড এ এনার্জি অয়েল অ্যান্ড গ্যাস এলএলসি থেকে ২ লাখ টন ডিজেল, পেট্রোগ্যাস ইন্টারন্যাশনাল থেকে ১ লাখ টন ডিজেল কেনার প্রস্তাব অনুমোদন করেছে ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিপরিষদ কমিটি। এক্সন মোবিল কাজাখস্তান ইনকরপোরেটেড (ইএমকেআই) থেকে এক লাখ টন ডিজেল ও ইন্দোনেশিয়ার পিটি বুমি সিয়াক পুসাকো জাপিন নামের কোম্পানি থেকে ৬০ হাজার টন ডিজেল কেনার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া ‘আবীর ট্রেড অ্যান্ড গ্লোবাল মার্কেটসের’ কাছ থেকে ১ লাখ টন অপরিশোধিত তেল কেনার প্রস্তাব অনুমোদন হয়েছে। এগুলো সবই নতুন উৎস। জরুরি পরিস্থিতি বিবেচনায় সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে তাদের কাছ থেকে তেল কেনা হচ্ছে। তবে তারা এখনো তেল সরবরাহের সময়সূচি নিশ্চিত করেনি। দ্রুত সরবরাহে তাগাদা দেওয়া হচ্ছে।

পরিশোধিত জ্বালানি হিসেবে ডিজেল, অকটেন, ফার্নেস তেল ও জেট ফুয়েল কেনা হয় বিভিন্ন দেশ থেকে। আর অপরিশোধিত জ্বালানি তেল আনা হয় সৌদি আরব ও আরব আমিরাত থেকে। এসব তেল দেশের একমাত্র সরকারি পরিশোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডে (ইআরএল) শোধন করে ডিজেল, পেট্রল, ফার্নেস তেলসহ বিভিন্ন জ্বালানি পাওয়া যায়।

হরমুজ পার হতে ইরানের সম্মতি

যুদ্ধ শুরুর পর কার্যত বন্ধ থাকা হরমুজ প্রণালি ব্যবহারের অনুমতি পাচ্ছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশের জ্বালানিবাহী ছয়টি জাহাজকে হরমুজ প্রণালি পার হওয়ার অনুমতি দিয়েছে ইরান। এই পথ দিয়ে বাংলাদেশের জ্বালানিবাহী জাহাজ চলাচলের কোনো সমস্যা নেই। গতকাল বুধবার ঢাকায় ইরান দূতাবাসে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে এ তথ্য জানান ঢাকায় নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূত জলিল রহিমি জাহানাবাদি।

জলিল রহিমি জাহানাবাদি বলেন, ‘আমরা বাংলাদেশ সরকারের কাছে জাহাজগুলোর স্পেসিফিকেশন (বিস্তারিত তথ্য) পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে দিতে বলেছিলাম। সেগুলো গত সপ্তাহে আমরা পেয়েছি। এটা নিয়ে কাজ চলছে। বাংলাদেশের জাহাজ চলাচলের ক্ষেত্রে কোনো সমস্যা নেই। এ ব্যাপারে আমরা সর্বাত্মক সহযোগিতা করব।’ ভ্রাতৃপ্রতিম দেশ হিসেবে বাংলাদেশ যেন জ্বালানিসংকটে না পড়ে, সেদিকে ইরানের নজর রয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র বলছে, হরমুজ প্রণালি পার হওয়ার অনুমতি পাওয়া ৬টি জাহাজের মধ্যে বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের একটি ও বাকি পাঁচটি ভাড়া করা জাহাজ। এসব জাহাজের দুটিতে জ্বালানি তেল ও বাকি চারটিতে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আসার কথা রয়েছে।

পরিশোধিত জ্বালানি হিসেবে ডিজেল, অকটেন, ফার্নেস তেল ও জেট ফুয়েল কেনা হয় বিভিন্ন দেশ থেকে। আর অপরিশোধিত জ্বালানি তেল আনা হয় সৌদি আরব ও আরব আমিরাত থেকে। এসব তেল দেশের একমাত্র সরকারি পরিশোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডে (ইআরএল) শোধন করে ডিজেল, পেট্রল, ফার্নেস তেলসহ বিভিন্ন জ্বালানি পাওয়া যায়।

মাসে গড়ে ইআরএল থেকে ৬০ হাজার টন ডিজেল পাওয়া যায়। তবে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরুর পর সৌদি আরব ও আরব আমিরাত থেকে অপরিশোধিত জ্বালানি আসা বন্ধ রয়েছে। বর্তমান মজুত দিয়ে আর এক সপ্তাহ উৎপাদন ধরে রাখতে পারবে ইআরএল। তাই জরুরি ভিত্তিতে সৌদি আরব থেকে এক লাখ টন অপরিশোধিত জ্বালানি তেল আনা হচ্ছে বলে জানিয়েছে বিপিসি।

এপ্রিলে পেট্রলের চাহিদা ৪৪ হাজার টন। এর মধ্যে স্থানীয় উৎস থেকে ৩৫ হাজার টন আসার কথা রয়েছে। বাকি ঘাটতি মেটাতে কিছু অকটেন পেট্রলে রূপান্তর করা হবে।

নিয়মিত সরবরাহকারী চীন, ভারত, সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়ার পাশাপাশি নাইজেরিয়া, আজারবাইজান, কাজাখস্তান, অ্যাঙ্গোলা, অস্ট্রেলিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে অপরিশোধিত বা পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানির বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা ৩০ দিনের জন্য শিথিল করায় আগামী দুই মাসে রাশিয়া থেকে ৬ লাখ টন ডিজেল আমদানির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

বিপিসি বলছে, এপ্রিলে পেট্রল ও অকটেন নিয়ে দুশ্চিন্তা নেই। এ মাসে অকটেনের চাহিদা ৩৭ হাজার টন। এর মধ্যে দেশের বেসরকারি শোধনাগার থেকে ৩০ হাজার টন অকটেন আসার কথা। এ ছাড়া ৫০ হাজার টন আমদানি হচ্ছে এ মাসেই। ৬ এপ্রিল ২৫ হাজার টন নিয়ে সিঙ্গাপুর থেকে একটি জাহাজ আসার কথা।

এপ্রিলে পেট্রলের চাহিদা ৪৪ হাজার টন। এর মধ্যে স্থানীয় উৎস থেকে ৩৫ হাজার টন আসার কথা রয়েছে। বাকি ঘাটতি মেটাতে কিছু অকটেন পেট্রলে রূপান্তর করা হবে।