
ঘুম থেকে উঠে মুঠোফোনে নোটিফিকেশন দেখা, ক্লাসের ফাঁকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সময় কাটানো, অনলাইন গেম খেলা কিংবা ডিজিটাল লেনদেন—আজকের শিক্ষার্থীদের দৈনন্দিন জীবনের বড় একটি অংশই প্রযুক্তিনির্ভর। তবে এই ডিজিটাল সুবিধার পাশাপাশি বাড়ছে সাইবার প্রতারণা, অনলাইন হয়রানি ও তথ্য ফাঁসের ঝুঁকি। এ ধরনের অপরাধ প্রতিরোধে সচেতনতাই সবচেয়ে কার্যকর অস্ত্র।
সাইবার নিরাপত্তা সম্পর্কে সচেতন করতে আজ বৃহস্পতিবার রাজধানীর ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজে আয়োজন করা হয় বিশেষ সচেতনতামূলক কর্মসূচি। সেখানেই বক্তারা এ বাস্তবতা তুলে ধরেন।
পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) পরিচালিত সাইবার পুলিশ সেন্টার (সিপিসি) এবং মোবাইল ব্যাংকিং সেবা—বিকাশ লিমিটেডের যৌথ উদ্যোগে ‘সাইবার অ্যাওয়ারনেস এনহ্যান্সমেন্ট প্রোগ্রাম’ অনুষ্ঠিত হয়। এতে প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন শ্রেণির প্রায় ৬০০ শিক্ষার্থী অংশ নেয়।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন সাইবার পুলিশ সেন্টারের (সিপিসি-ডিআইজি) উপমহাপরিদর্শক সানা শামিনুর রহমান। তিনি বলেন, বর্তমান প্রজন্ম একই সঙ্গে বাস্তব ও ডিজিটাল—দুই জগতেই বসবাস করছে। প্রযুক্তির বিস্তার যেমন নতুন সুযোগ তৈরি করেছে, তেমনি নতুন ধরনের অপরাধ ও ঝুঁকির ক্ষেত্রও তৈরি করেছে। তাই প্রযুক্তির নিরাপদ ব্যবহার সম্পর্কে সচেতন হওয়া জরুরি।
শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে সানা শামিনুর রহমান শক্তিশালী পাসওয়ার্ড ব্যবহার, ওটিপি ও পিন নম্বর গোপন রাখা, অপরিচিত লিংকে ক্লিক না করা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেন। তাঁর ভাষ্য, সাইবার অপরাধীরা সাধারণত মানুষের অসতর্কতাকেই সবচেয়ে বড় সুযোগ হিসেবে কাজে লাগায়। এ ধরনের অপরাধ প্রতিরোধে সচেতনতাই সবচেয়ে কার্যকর অস্ত্র।
ডিআইজি সানা শামিনুর রহমান বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপতথ্য ও গুজব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। কোনো তথ্য যাচাই না করে শেয়ার করা ব্যক্তি ও সমাজ—উভয়ের জন্য ক্ষতির কারণ হতে পারে। তাই দায়িত্বশীল ডিজিটাল নাগরিক হিসেবে তথ্যের সত্যতা যাচাই করা প্রয়োজন। পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহমর্মিতা ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করতে হবে।
প্রধান বক্তা ছিলেন সিআইডির অতিরিক্ত ডিআইজি মো. জাহিদুল ইসলাম। তিনি বলেন, সাইবার নিরাপত্তা আর শুধু প্রযুক্তিবিদদের বিষয় নয়, এ বিষয়ক সচেতনতা প্রত্যেক শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও নাগরিকের জন্য অপরিহার্য। তিনি বলেন, সাইবার অপরাধীরা প্রযুক্তিগত দুর্বলতার চেয়ে মানুষের অসতর্কতাকেই বেশি কাজে লাগায়। একটি ওটিপি শেয়ার করা, অপরিচিত লিংকে ক্লিক করা বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অতিরিক্ত ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশ করা বড় ধরনের আর্থিক ও সামাজিক ক্ষতির কারণ হতে পারে। তাই আত্মনিয়ন্ত্রণ, সচেতনতা ও তথ্য যাচাইয়ের অভ্যাস গড়ে তোলা জরুরি।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সিপিসির বিশেষ পুলিশ সুপার মীর আবু তৌহিদ। তিনি বলেন, আজকের শিক্ষার্থীদের মধ্য থেকেই ভবিষ্যতের চিকিৎসক, প্রকৌশলী, উদ্যোক্তা, সরকারি কর্মকর্তা ও রাজনৈতিক নেতৃত্ব তৈরি হবে। তাই প্রযুক্তি ব্যবহারের পাশাপাশি সাইবার সচেতনতা অর্জন এবং অন্যদের সচেতন করার দায়িত্বও তাদের নিতে হবে।
বিকাশ লিমিটেডের ইভিপি ও হেড অব এক্সটার্নাল অ্যাফেয়ার্স এ কে এম মনিরুল করিম বলেন, ডিজিটাল আর্থিক সেবা মানুষের জীবনকে সহজ করেছে। তবে প্রতারকদের নানা কৌশলের কারণে অনেকেই ঝুঁকির মুখে পড়ছে। সচেতনতা বৃদ্ধির ফলে এখন মানুষ আগের তুলনায় এসব প্রতারণা সহজে শনাক্ত করতে পারছে। অনুষ্ঠানে তিনি মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সেবাকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন প্রতারণার কৌশল তুলে ধরেন।
অনুষ্ঠানের সভাপতিত্ব করেন ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মাজেদা বেগম। তিনি বলেন, এ ধরনের সচেতনতামূলক কর্মসূচি শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি তাদের পরিবার ও স্বজনদেরও নিরাপদ রাখতে সহায়ক হবে।
অনুষ্ঠানে শিক্ষক, শিক্ষার্থী, সিপিসির কর্মকর্তা ও বিকাশের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। বক্তারা বলেন, প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তারের এই সময়ে সাইবার নিরাপত্তা সম্পর্কে সচেতনতা গড়ে তোলা ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে নিরাপদ ও দায়িত্বশীল ডিজিটাল নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার অন্যতম পূর্বশর্ত।
‘থিঙ্ক টোয়াইস বিফোর ইউ ক্লিক, সাইবার নলেজ ইজ ইয়োর বেস্ট ফায়ারওয়াল’ প্রতিপাদ্যে আয়োজিত এই কর্মসূচি শিক্ষার্থীদের মধ্যে নিরাপদ ও সচেতন ডিজিটাল আচরণ গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা প্রকাশ করেন আয়োজকেরা।