আমদানি করা ভারতীয় ইলিশ 'বরিশালের ইলিশ' বলে যশোরে বিক্রি হচ্ছে। গতকাল রোববার বিকেলে যশোর শহরের বড় বাজারে
আমদানি করা ভারতীয় ইলিশ 'বরিশালের ইলিশ' বলে যশোরে বিক্রি হচ্ছে। গতকাল রোববার বিকেলে যশোর শহরের বড় বাজারে

৫৭ টাকা কেজি দেখিয়ে ভারত থেকে ইলিশ আমদানি

দুর্গাপূজার সময় বাংলাদেশের ইলিশের জন্য মুখিয়ে থাকেন ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মানুষ। সরকারের বিশেষ উদ্যোগে সাত বছর ধরে পূজার আগে নির্দিষ্ট পরিমাণ ইলিশ রপ্তানি হয়েছে দেশটিতে। এখন সেই চিত্র বদলাচ্ছে। গত বছর থেকে ভারত থেকে নিয়মিত ইলিশ আমদানি শুরু হয়েছে। এবার ভরা মৌসুমেও ইলিশ আসছে ভারত থেকে।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্যে দেখা যায়, ভারত থেকে ইলিশ আমদানি শুরু হয় গত বছরের জুলাইয়ে। সে বছর ইলিশ আসে ১৭ হাজার ৮৫০ কেজি। আর চলতি বছর সাড়ে ৯ মাসে এসেছে ৪ লাখ ২৭ হাজার কেজি। ভারত থেকে আমদানি নতুন হলেও মিয়ানমার থেকে দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশে ইলিশ আসছে।

তবে ব্যবসায়ীরা বলছেন, ভারত থেকে আসা ইলিশের বড় অংশ গুজরাটের ভারুচ অঞ্চলের। আরব সাগরের সঙ্গে যুক্ত নর্মদা নদীর মোহনা এলাকায় এসব ইলিশ ধরা হয়। অনেক ক্ষেত্রেই ডিমওয়ালা ইলিশ সংগ্রহ করে মাছ ও ডিম আলাদাভাবে বিক্রি করা হয়। বাংলাদেশের ইলিশের তুলনায় এর স্বাদ কম, আকারেও ছোট। তাই দামও কম।

গত বছর থেকে ভারত থেকে নিয়মিত ইলিশ আমদানি শুরু হয়েছে। এবার ভরা মৌসুমেও ইলিশ আসছে ভারত থেকে।

খুলনার খানজাহান আলী সড়কের বিশ্বাস ইন্টারন্যাশনাল এ বছর বেনাপোল বন্দর দিয়ে ভারত থেকে ৬ হাজার ২৩১ কেজি ইলিশ আমদানি করেছে। প্রতিষ্ঠানটি আমদানি মূল্য দেখিয়েছে ৭৪ থেকে ২৪৭ টাকা কেজি পর্যন্ত। এই প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার দীপ্ত বিশ্বাস প্রথম আলোকে বলেন, গুজরাট থেকে যেসব ইলিশ আসছে, সেগুলোর মান অনুযায়ী দাম এমনই। তাঁর দাবি, এই ইলিশ এনে লোকসান হয়েছে। আর আমদানি করবেন না।

এর চেয়েও কম দরে ইলিশ এসেছে বাংলাদেশে। যেমন: ঢাকার দক্ষিণ যাত্রাবাড়ীর রুপা এন্টারপ্রাইজ ৭ হাজার ৭২৩ কেজি ইলিশ আমদানি করেছে ৫৭ টাকা কেজি ঘোষিত মূল্যে। কেজিতে প্রায় ২০০ টাকা শুল্ক–কর দিয়েছে।

বেনাপোলের মেসার্স সততা ফিশ ফিড ২৪ হাজার ৭০০ কেজি ইলিশ এনেছে ২৪৭ টাকা কেজি ঘোষিত মূল্যে। প্রতিষ্ঠানটির কর্ণধার শহিদুর রহমান বলেন, ইলিশ আমদানি করতে সব মিলিয়ে কেজিতে প্রায় ৫০০ টাকা খরচ হয়। একেকটি মাছের ওজন ৫০০ থেকে ৭০০ গ্রাম। পাইকারিতে ৫০০ থেকে ৬০০ টাকায় বিক্রি করছেন। আর দেশের খুচরা বাজারে ৫০০–৭০০ গ্রামের ইলিশ বিক্রি হচ্ছে প্রায় দেড় হাজার টাকা কেজিতে।

খুলনার খানজাহান আলী সড়কের বিশ্বাস ইন্টারন্যাশনাল এ বছর বেনাপোল বন্দর দিয়ে ভারত থেকে ৬ হাজার ২৩১ কেজি ইলিশ আমদানি করেছে। প্রতিষ্ঠানটি আমদানি মূল্য দেখিয়েছে ৭৪ থেকে ২৪৭ টাকা কেজি পর্যন্ত।

বাংলাদেশের ইলিশই চায় পশ্চিমবঙ্গ

দাম নাগালের বাইরে যাওয়ায় ইলিশের দোকানে ক্রেতা কম। গতকাল বিকেলে রাজধানীর কারওয়ান বাজারে

বাংলাদেশের রপ্তানি নীতি অনুযায়ী, ইলিশ শর্ত সাপেক্ষে রপ্তানিযোগ্য পণ্য। সরকারের অনুমতি নিয়ে এটি রপ্তানি করা যায়। ২০১৯ সাল থেকে প্রতিবছর দুর্গাপূজার আগে নির্দিষ্ট পরিমাণ ইলিশ ভারতে রপ্তানির অনুমতি দিয়ে আসছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়।

এবারও পূজার আগে বাংলাদেশ থেকে ইলিশ আমদানির সুযোগ চেয়েছেন পশ্চিমবঙ্গের মাছ ব্যবসায়ীরা। কলকাতাভিত্তিক ফিশ ইমপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন বাংলাদেশের বাণিজ্যমন্ত্রীর কাছে রপ্তানি আবার চালুর অনুমতি চেয়ে চিঠি দিয়েছে। তবে বাংলাদেশের ইলিশের আহরণ কম থাকায় এবার রপ্তানি নিয়ে সংশয় রয়েছে ব্যবসায়ীদের মধ্যে।

ইলিশ রপ্তানি হয়েছিল প্রায় সোয়া লাখ কেজি, আর আমদানি হয়েছিল ১০ লাখ ৬২ হাজার কেজি। চলতি অর্থবছরে এখনো ইলিশ রপ্তানি হয়নি। এর মধ্যে আমদানি হয়েছে ৫ লাখ ৯১ হাজার কেজি।

মিয়ানমার থেকে নিয়মিতই আসছে

ভারত থেকে আমদানি তুলনামূলক নতুন হলেও মিয়ানমার থেকে প্রায় প্রতিবছরই ইলিশ আমদানি হচ্ছে। এনবিআরের গত এক দশকের তথ্যে দেখা যায়, দেশটি থেকে নিয়মিত কমবেশি ইলিশ এসেছে বাংলাদেশে। সবচেয়ে বেশি এসেছে গত অর্থবছরে, মোট ১০ লাখ ২৫ হাজার কেজি। ২০১৯–২০ অর্থবছর থেকে এখন পর্যন্ত মিয়ানমার থেকে মোট ৩০ লাখ ৬২ হাজার কেজি ইলিশ আমদানি হয়েছে।

‘আগে আমরা ইলিশ রপ্তানি করেছি। এখন আহরণ যেভাবে কমছে, তাতে আমরা নিজেরাই ইলিশ খেতে পারব কি না, তা নিয়ে সংশয় আছে। এখন ইলিশ উৎপাদন বাড়াতে সরকারের কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া দরকার।
চট্টগ্রামের পটিয়ার মাসুদ ফিশ প্রসেসিং অ্যান্ড আইস কমপ্লেক্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আশরাফ হোসেন মাসুদ

২০১৯–২০ অর্থবছর থেকে ইলিশ রপ্তানি শুরু হওয়ার পর কয়েক বছর রপ্তানির পরিমাণই বেশি ছিল। ২০২৪–২৫ অর্থবছরেও আমদানির চেয়ে প্রায় ৪ হাজার কেজি বেশি ইলিশ রপ্তানি হয়েছিল। কিন্তু ২০২৫–২৬ অর্থবছরে চিত্র উল্টে যায়। ওই সময় ইলিশ রপ্তানি হয়েছিল প্রায় সোয়া লাখ কেজি, আর আমদানি হয়েছিল ১০ লাখ ৬২ হাজার কেজি। চলতি অর্থবছরে এখনো ইলিশ রপ্তানি হয়নি। এর মধ্যে আমদানি হয়েছে ৫ লাখ ৯১ হাজার কেজি।

চট্টগ্রামের পটিয়ার মাসুদ ফিশ প্রসেসিং অ্যান্ড আইস কমপ্লেক্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আশরাফ হোসেন মাসুদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘আগে আমরা ইলিশ রপ্তানি করেছি। এখন আহরণ যেভাবে কমছে, তাতে আমরা নিজেরাই ইলিশ খেতে পারব কি না, তা নিয়ে সংশয় আছে। এখন ইলিশ উৎপাদন বাড়াতে সরকারের কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া দরকার।’