
খাঁচার ভেতর খুনসুটিতে মেতেছে বাঘের ছানা, একটু দূরেই হেলেদুলে হাঁটছে এশীয় হাতি। পাখির খাঁচায় দোল খাচ্ছে বর্ণিল ম্যাকাও। রাজধানীর মিরপুরে জাতীয় চিড়িয়াখানায় গেলে এমনই এক বৈচিত্র্যের দেখা মেলে। রয়েল বেঙ্গল টাইগার, কালো ভালুক, হায়েনা, হাতি, জলহস্তী, ক্যাঙ্গারু, অজগর, ঘড়িয়াল থেকে শুরু করে উটপাখিসহ এখানে রয়েছে ১৩৭ প্রজাতির পশু, পাখি ও মাছ।
প্রথম আলোকে চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত করেছে, বৃহৎ প্রাণী, মাংসাশী, ক্ষুদ্র স্তন্যপায়ী, সরীসৃপ, পাখি ও অ্যাকুয়ারিয়ামের মাছ মিলিয়ে এখানে মোট প্রাণীর সংখ্যা ৩ হাজার ৫২৩। দেশের আর কোনো চিড়িয়াখানা কিংবা সাফারি পার্কে একসঙ্গে এত প্রাণীর দেখা মেলে না।
জাতীয় চিড়িয়াখানার কিউরেটর মো. আতিকুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, এখানে বৃহৎ প্রাণী, সরীসৃপ, ক্ষুদ্র প্রাণী থেকে শুরু করে অ্যাকুয়ারিয়ামের মাছ—সব প্রদর্শন করা হয়। এত প্রজাতি দেশের অন্য কোনো সাফারি কিংবা চিড়িয়াখানায় প্রদর্শিত হয় না।
চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রজাতির দিক থেকে এখানে সবচেয়ে বেশি রয়েছে পাখি। উটপাখি, ইমু, হাড়গিলাসহ ৬১ প্রজাতির পাখি রয়েছে এখানে। এশীয় হাতি, জিরাফ, আফ্রিকান গন্ডার, জলহস্তীর মতো বৃহৎ প্রাণী আছে ১৯ প্রজাতির। আর রয়েল বেঙ্গল টাইগার, সাদা সিংহ, এশীয় কালো ভালুকের মতো মাংসাশী প্রাণী আছে ৯ প্রজাতির।
তবে সংখ্যায় সবচেয়ে বেশি রয়েছে নিশিবক বা ওয়াক, কানিবক ও চিত্রা হরিণ। এর মধ্যে নিশিবক ৫২৪টি, কানিবক ৩৮৫টি ও চিত্রা হরিণ রয়েছে ২৯৩টি।
প্রধান আকর্ষণ মাংসাশী ও তৃণভোজী প্রাণীরা
জাতীয় চিড়িয়াখানার কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্যানুসারে, এখানে ৪৮ প্রজাতির ৬৩১টি প্রাণী রয়েছে।
দর্শনার্থীদের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ মাংসাশী ও তৃণভোজী প্রাণীরা। এখানে মাংসাশী ৯টি প্রজাতির ৩৮টি প্রাণী রয়েছে। এর মধ্যে রয়েল বেঙ্গল টাইগার আছে ১৬টি। সম্প্রতি বাঘ দম্পতি বেলি ও টগর চারটি বাচ্চার জন্ম দিয়েছে, যার মধ্যে তিনটিই সাদা (অ্যালবিনো)। এ ছাড়া রয়েছে ১টি আফ্রিকান সাদা সিংহ, ৩টি আফ্রিকান সিংহ, ৬টি শেয়াল, ৪টি এশীয় কালো ভালুক, ১টি চিত্রা হায়েনা ও ২টি ডোরাকাটা হায়েনা। রয়েছে ৩টি মেছো বিড়াল এবং ১টি বনবিড়াল।
তৃণভোজী প্রাণী রয়েছে ১৯ প্রজাতির, যাদের মোট সংখ্যা ৩৮৭। এর মধ্যে এশীয় হাতি ৫টি এবং জলহস্তী আছে ১২টি। দর্শনার্থীদের অন্যতম আকর্ষণ জিরাফ রয়েছে ৭টি, যার মধ্যে সম্প্রতি একটির জন্ম হয়েছে। দেশে বিপন্নতার ঝুঁকিতে থাকা গয়াল আছে ২টি।
একটি আফ্রিকান গন্ডারের পাশাপাশি তৃণভোজী প্রাণীর তালিকায় আরও আছে ক্যাঙ্গারু, লামা, ওয়াইল্ডবিস্ট, কমন ইল্যান্ড, ওয়াটার বাক, মায়া হরিণ, চিত্রা হরিণ, গাধা, ইম্পালা, এক কুঁজওয়ালা উট, ভেড়া, দেশি ও আরবি ঘোড়া। এর মধ্যে অনেক প্রাণীই আফ্রিকান, যা চিড়িয়াখানার বাইরে দেখার সুযোগ এ দেশে নেই।
বানর, সরীসৃপ ও অন্যান্য
চিড়িয়াখানায় নানা প্রজাতির বানরও দেখতে পাবেন দর্শনার্থীরা। এর মধ্যে রয়েছে অলিভ বেবুন, হামাদ্রিয়াস বেবুন, ভারভেট বানর, উল্লুক, রেসাস বানর, হনুমান, লেঙ্গুর ও কুলু বানর। সবচেয়ে বেশি রয়েছে রেসাস বানর, যার সংখ্যা ৬৫। কুলু বানর, উল্লুক ও হামাদ্রিয়াস বেবুন রয়েছে একটি করে। এ ছাড়া সজারু, গিনিপিগ, খরগোশ, উদ বা ভোঁদড় ও ডিগলেঞ্জির দেখাও মিলবে এখানে।
সরীসৃপের মধ্যে কুমির আছে দুই প্রজাতির। মার্শ কুমির ও ইস্টুয়ারিন (লোনা পানির) কুমির। মার্শ কুমির রয়েছে ২টি এবং ইস্টুয়ারিন কুমির রয়েছে ৪টি। চিড়িয়াখানায় অজগর সাপ রয়েছে ৩১টি। আছে ২টি কোবরা বা গোখরা সাপ। আরও দেখা মিলবে ঘড়িয়াল, কচ্ছপ, দাঁড়াশ সাপ ও শঙ্খিনীর।
পাখির কলকাকলিতে মুখর
পাখির সংগ্রহে বেশ সমৃদ্ধ জাতীয় চিড়িয়াখানা। এখানে ৬১টি প্রজাতির ১ হাজার ৯১২টি পাখি রয়েছে। পাখি হলেও উড়তে পারে না এমন ৬টি উটপাখি, ২৩টি ইমু এবং ১টি কেশোয়ারি রয়েছে এখানে।
উড়তে পারা পাখিদের মধ্যে নজর কাড়ে নীল ও সাদা ময়ূর। এই দুই প্রজাতির ময়ূর রয়েছে ১৫২টি। দেখা মিলবে হাড়গিলা, কালো গলা বক, কালেম, নিশিবক, কানিবক, গো-বক, ছোট পানকৌড়ির। লেসার পেলিক্যান, গ্রেট হোয়াইট পেলিক্যান, গ্রেটার ফ্লেমিংগো, টার্কি ও ইন্ডিয়ান সারস ক্রেন প্রজাতির পাখিও রয়েছে। চার প্রজাতির কবুতরের (জালালি, ফ্রিলব্যাক, গিরিবাজ ও দেশি) পাশাপাশি তিন প্রজাতির টিয়া (লাল গলা ১১টি, হিরামন ১৬টি ও হলুদ ৫টি) রয়েছে।
জীবনানন্দ দাশের কবিতায় যে ‘শঙ্খচিল’-এর খোঁজ মেলে, সেই পাখি চিড়িয়াখানায় আছে ৪টি। ভুবনচিল, তিলাবাজ ও কুড়াবাজও দর্শনার্থীদের মন কাড়ে। এখন প্রকৃতিতে শকুন দেখা কঠিন। চিড়িয়াখানায় ২ প্রজাতির শকুন রয়েছে। এর মধ্যে বাংলা শকুন রয়েছে ২টি এবং গ্রিফন শকুন ৩টি।
এ ছাড়া সাদা কাক, রাজ ধনেশ, ময়না, সাতভায়লা, গো-শালিক, গাঙশালিক, চকোর, মুনিয়া ও মাছরাঙার দেখা মিলবে। বিদেশি পাখির মধ্যে বাজরিগার, সাদা ককাটিল, ধূসর ককাটিল, ফিশার লাভ বার্ড, পিংক লাভ বার্ড, আলেকজেন্দ্রিন প্যারাকিট, টারকুইজ প্যারাকিট, প্যারাডাইজ শেলডাক, সালফার ক্রেস্টেড কাকাতুয়া, রেড টেল ব্ল্যাক কাকাতুয়া, গোল্ডেন প্যারাকিট ও ফেস্টিভ অ্যামাজন রয়েছে। আছে নানা রঙের ম্যাকাও—স্কারলেট, রেড অ্যান্ড গ্রিন, ব্লু থ্রোটেড, রেড ফ্রন্টেড, মিলিটারি, হায়াসিন্থ ও রুবালিনা ম্যাকাও।
মাছের অ্যাকুয়ারিয়াম
জাতীয় চিড়িয়াখানায় ২৮ প্রজাতির ৯৮০টি অ্যাকুয়ারিয়াম ফিশ বা মাছ রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি আছে গাপ্পি (৩২০টি)। এ ছাড়া টাইগার শার্ক, সাকিং ক্যাটফিশ, গোল্ড ফিশ, ওরেন্ডা ফিশ, কমেট ফিশ, অ্যাঞ্জেল ফিশ, অ্যালবিনো শার্ক, রেইনবো শার্ক, টাইগার কই কার্প, কই কার্প, সিল্কি কই কার্প, সাকিং ক্যাটফিশ (সাদা), শিং মাছ, টাইগার বার্ব, কিসিং গোরামি, ব্লু গোরামি, টেলিচো, ক্যাটফিশ, রেড টেইল ক্যাটফিশ, অস্কার, কচ্ছপ, সিলভার ডলার, পিরানহা, সিলভার শার্ক, বাটারকোফেরি ফিশ, মুনরাইজ ফিশ ও বারবট রয়েছে।
চিড়িয়াখানায় থাকা এসব প্রাণী একে অপরের দীর্ঘদিনের সঙ্গী। তবে নতুন প্রাণী যুক্ত হওয়ার ক্ষেত্রে কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। কিউরেটর আতিকুর রহমান বলেন, পর্যাপ্ত বরাদ্দের অভাবে নতুন প্রজাতি এখানে যোগ করা যাচ্ছে না। যেমন স্লথ বা অরিক্সের মতো প্রাণীর প্রতি দর্শনার্থীদের ব্যাপক আগ্রহ রয়েছে।