বাংলাদেশভিত্তিক তথ্য যাচাইকারী পাঁচটি প্রতিষ্ঠান গত সপ্তাহে (৩০ মে–৫ জুন পর্যন্ত) তাদের ওয়েবসাইটে মোট ৮৯টি ফ্যাক্ট চেক প্রতিবেদন প্রকাশ করে।
এগুলো পর্যালোচনা করে দেখা যায়, পুরোনো ভিডিওকে নতুন ঘটনার সঙ্গে যুক্ত করে ছড়ানো হচ্ছে অপতথ্য। এআই-নির্মিত ভুয়া ছবি ব্যবহার এবং জনপরিচিত ব্যক্তিদের নামে ভুয়া মন্তব্য প্রচারও কমেনি।
তার মধ্যে রিউমর স্ক্যানার ৬০টি প্রতিবেদন প্রকাশ করে তাদের ওয়েবসাইটে। এ ছাড়া ডিসমিসল্যাব ৯টি, দ্য ডিসেন্ট ৮টি, ফ্যাক্ট ওয়াচ ৬টি এবং বাংলা ফ্যাক্ট ৬টি প্রতিবেদন প্রকাশ করে।
ঈদুল আজহাকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন ভুয়া ও বিভ্রান্তিকর তথ্য শনাক্ত করে দেশের তথ্য-যাচাইকারী প্রতিষ্ঠানগুলো অন্তত ১৩টি ফ্যাক্ট চেক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। এসব প্রতিবেদনের মধ্যে কয়েকটি বিশেষভাবে আলোচিত হয়েছে।
এর একটি হলো ‘গুরুদাসপুর উপজেলা যুবলীগ’ নামের একটি ফেসবুক প্রোফাইল থেকে ছড়িয়ে দেওয়া ভিডিও, যেখানে দাবি করা হয়—‘এই মুহূর্তে রাজধানীর প্রধান ঈদগাহে ঈদের নামাজকে কেন্দ্র করে দুপক্ষের ভয়াবহ সংঘর্ষ হয়েছে।’ তবে যাচাই করে দেখা যায়, ভিডিওটির সঙ্গে সাম্প্রতিক ঈদের কোনো সম্পর্ক নেই। ভিডিওটি অন্তত গত বছরের ২৭ ডিসেম্বর থেকেই অনলাইনে প্রচারিত হচ্ছে। তথ্য-যাচাইকারী প্রতিষ্ঠান রিউমর স্ক্যানার জানায়, ভিডিওটির মূল উৎস শনাক্ত না হলেও এটি যে পুরোনো ভিডিও, তা নিশ্চিত হওয়া গেছে।
একই প্রোফাইল থেকে আরেকটি ভিডিও প্রচার করে দাবি করা হয়, কক্সবাজারে ঈদের দ্বিতীয় দিনে ঘুরতে যাওয়া নারী পর্যটকদের ওপর সন্ত্রাসীরা হামলা চালিয়েছে। কিন্তু অনুসন্ধানে জানা যায়, ভিডিওটি সাম্প্রতিক নয়; বরং এটি নোয়াখালীর সোনাইমুড়ী উপজেলার বজরা বাজার এলাকার একটি পুরোনো ঘটনার ভিডিও।
‘গুরুদাসপুর উপজেলা যুবলীগ’ নামের একটি প্রোফাইল থেকে ঈদ, ধর্ষণ ও সামাজিক অস্থিরতা–সম্পর্কিত একাধিক পুরোনো ভিডিও নতুন ঘটনা দাবি করে প্রচার করা হয়। পরে প্রোফাইলটি আর খুঁজে পাওয়া না গেলেও প্রকাশিত ফ্যাক্ট চেকগুলোতে দেখা যায়, একই উৎস থেকে ধারাবাহিকভাবে অপতথ্য ছড়ানোর প্রবণতা ছিল।
ঈদ ঘিরে আলোচনায় থাকা ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প’ নামের মহিষকেও কেন্দ্র করে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানো হয়। এ ছাড়া ঈদুল আজহাকে কেন্দ্র করে আরেকটি ফটোকার্ডে দাবি করা হয়, ‘পশুর হাটে চাঁদাবাজি করেছে বিএনপি’—এমন মন্তব্য করেছেন রুহুল কবির রিজভী। ডিজিটাল প্রযুক্তির সহায়তায় সংবাদমাধ্যম ‘এশিয়া পোস্ট’-এর একটি ভিন্ন ফটোকার্ড সম্পাদনা করে আলোচিত ফটোকার্ডটি তৈরি করা হয়েছে।
সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন স্থানে নারী ও শিশু ধর্ষণ, ধর্ষণের পর হত্যা এবং যৌন সহিংসতার একাধিক ঘটনা উদ্বেগ ও ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে। এসব ঘটনার অনেকগুলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচিত। এর মধ্যেই অনলাইনে ছড়িয়ে পড়েছে অসংখ্য পুরোনো, ভিন্ন প্রেক্ষাপটের কিংবা সম্পূর্ণ অসত্য ছবি ও ভিডিও।
তথ্য যাচাইকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রকাশিত প্রতিবেদন পর্যালোচনায় ধর্ষণ কিংবা ধর্ষণের পর হত্যার দাবি করে ছড়ানো অপতথ্যের ১৩টি প্রতিবেদন পাওয়া যায়।
এর মধ্যে একটি ছিল ‘ঈদের ছুটি শেষে মাগুরা থেকে ঢাকায় ফেরার পথে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের এক ছাত্রীকে ধর্ষণের পর হত্যা করে রাস্তার পাশে লাশ ফেলে রাখা হয়েছে’ দাবি করা একটি ভিডিও। অথচ ভিডিওটির সঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো শিক্ষার্থীর সম্পর্ক নেই। এটি ঠাকুরগাঁওয়ে এক গৃহবধূকে হত্যার পুরোনো ঘটনার ভিডিও।
‘এই মুহূর্তে রাজধানীর উত্তরায় স্বামীর সঙ্গে ঈদের কেনাকাটা করতে এসে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছেন এক নারী’—এমন দাবিতে একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়। প্রকৃতপক্ষে ভিডিওটি গত ফেব্রুয়ারিতে ভারতের দিল্লিতে ধারণ করা। সেখানে এক ব্যক্তি ছেলেকে বাঁচাতে গিয়ে গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হলে তাঁর স্ত্রী অসুস্থ হয়ে পড়েন।
ফরিদপুরে এক তরুণীকে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে পাটখেতে গণধর্ষণের পর জবাই করে হত্যা করা হয়েছে—এমন দাবিতেও একটি ছবি ছড়িয়ে পড়ে। যাচাইয়ে দেখা যায়, ছবিটি ২০২১ সালে লালমনিরহাটে পাটখেত থেকে এক গৃহবধূর মরদেহ উদ্ধারের ঘটনার।
গত সপ্তাহে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপতথ্য ছড়ানোর ক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির ব্যবহারও ছিল উল্লেখযোগ্য। বিভিন্ন তথ্য যাচাইকারী প্রতিষ্ঠানের প্রকাশিত প্রতিবেদন পর্যালোচনায় দেখা যায়, এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে তৈরি করা অন্তত ১২টি ভুয়া ছবি ও ভিডিও শনাক্ত করে ফ্যাক্ট চেক প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়েছে।
ঈদুল আজহা নিয়ে এআই প্রযুক্তিতে তৈরি একাধিক ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। এর মধ্যে রাজধানীর উত্তরা দিয়াবাড়ি এলাকায় মেট্রোরেল স্টেশনের নিচে কোরবানির পশুর হাট বসানো নিয়ে চলমান আলোচনা ও সমালোচনাকে কেন্দ্র করে একটি ছবি প্রচার করা হয়। ছবিটির ক্যাপশনে দাবি করা হয়, ‘মেট্রোরেলে গরুর হাট বসেছে, তাই পদ্মা সেতু বাদ যাবে কেন? তাই বিএনপির যুবদল বসিয়েছে পদ্মা সেতুর গরুর হাট।’ তবে যাচাই করে দেখা যায়, পদ্মা সেতুর ওপর গরুর হাট বসানোর প্রচারিত ছবিটি বাস্তব নয়; কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তির সহায়তায় এটি তৈরি করা হয়েছে।
একই সময়ে কুমিল্লা-৪ (দেবীদ্বার) আসনের সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ আরাফাতের ময়দানে অবস্থান করছেন—এমন দাবিতে একটি ছবিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। অনুসন্ধানে জানা যায়, এটিও এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে তৈরি করা হয়েছে।
বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে সাম্প্রতিক হত্যাকাণ্ড ও পুশ ইনের ঘটনাকে কেন্দ্র করেও বিভ্রান্তিকর কনটেন্ট ছড়ানো হয়। একটি ছবিতে দাবি করা হয়, ধানখেতে কাজ করার সময় এক বাংলাদেশি কৃষককে ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) ধরে নিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু যাচাইয়ে দেখা যায়, ছবিটি এআই দিয়ে তৈরি।
এ ছাড়া সেন্ট মার্টিনে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি নির্মাণের দাবিতে প্রচারিত ছবি, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচয়পত্র দাবিতে প্রচারিত ছবি এবং সংসদ ভবনে মানসুরা আলমের সঙ্গে নাহিদ ইসলাম ও মাহমুদা মিতুর কথোপকথনের দৃশ্য দাবিতে ছড়িয়ে পড়া ছবিগুলোও এআই প্রযুক্তির মাধ্যমে তৈরি বলে শনাক্ত করা হয়েছে।
গত সপ্তাহে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন আলোচিত ইস্যুকে কেন্দ্র করে ভুয়া মন্তব্যের বিস্তারও ছিল উল্লেখযোগ্য। দেশের বিভিন্ন তথ্য যাচাইকারী প্রতিষ্ঠান এসব দাবি যাচাই করে অন্তত ১১টি ফ্যাক্ট চেক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। প্রতিবেদনগুলো পর্যালোচনা করে দেখা যায়, যেসব বিষয় জাতীয় গণমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দিয়েছে, সেসব ইস্যুকেই কেন্দ্র করে রাজনৈতিক নেতা, ব্যাংকার, পেশাজীবী এবং জনপরিচিত ব্যক্তিদের নামে মনগড়া মন্তব্য ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।
উল্লেখযোগ্য একটি দাবি ছিল ইসলামী ব্যাংককে ঘিরে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মাসরুর আরেফিনের নামে প্রচার করা হয়, ‘জামায়াত-শিবির চক্র একাই ইসলামী ব্যাংক ধ্বংস করে দিয়েছে।’ যাচাইয়ে এই বক্তব্যের কোনো সত্যতা পাওয়া যায়নি।
একইভাবে ধর্মমন্ত্রী কাজী শাহ মোফাজ্জাল হোসাইন কায়কোবাদকে উদ্ধৃতি করে ছড়ানো হয়, ‘প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কোরবানি আদায় হবে না।’ যাচাইয়ে এর কোনো সত্যতা পাওয়া যায়নি।
এদিকে দেশে হামের টিকার সংকট এবং শিশুমৃত্যুর ঘটনা নিয়ে যখন উদ্বেগ ও শোকের পরিবেশ তৈরি হয়েছে, তখন সেই সংবেদনশীল বিষয়টিকেও অপতথ্য ছড়ানোর হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলামের ছবি ব্যবহার করে একটি ফটোকার্ড প্রচার করা হয়।
সেখানে দাবি করা হয়, তিনি বলেছেন, ‘যারা সামান্য ৩/৪০০ হামে শিশুমৃত্যু নিয়ে গলাবাজি করছেন, তাদেরকে বলি, ৫ আগস্ট দেশ স্বাধীন না করলে ফ্যাসিস্ট হাসিনা এর হাজার গুণ বেশি মানুষ হত্যা, গুম করত।’ তবে যাচাইয়ে জানা যায়, ‘ডেইলি মোল্লার দেশ’ নামের একটি স্যাটায়ারধর্মী ফেসবুক পেজে প্রকাশিত ব্যঙ্গাত্মক পোস্ট থেকে এ দাবিটির সূত্রপাত।
প্রবীণ রাজনীতিবিদ ও সাবেক মন্ত্রী তোফায়েল আহমেদের মৃত্যু ও জানাজাকে কেন্দ্র করে পুরোনো ভিডিও, ভিন্ন ঘটনার ফুটেজ, স্যাটায়ার পোস্ট এবং এআই নির্মিত ছবি ব্যবহার করে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানো হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন তথ্য যাচাইকারী প্রতিষ্ঠান অন্তত ছয়টি ফ্যাক্ট চেক প্রতিবেদন প্রকাশ করে।
সবচেয়ে বেশি আলোচিত দাবিগুলোর একটি ছিল, ভোলায় তোফায়েল আহমেদের জানাজায় অংশ নিতে আসা মানুষকে সেনাবাহিনী বাধা দিয়েছে এবং এ সময় সেনাবাহিনীর একটি গাড়িতে জনতা হামলা চালিয়েছে। তবে যাচাইয়ে দেখা যায়, এটি খাগড়াছড়িতে ধর্ষণবিরোধী আন্দোলনের সময় ধারণ করা একটি পুরোনো ভিডিও।
একইভাবে ‘তোফায়েল আহমেদের জানাজা ঘিরে আওয়ামী লীগের নেতা–কর্মীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ’ দাবিতে আরেকটি ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়া হয়। যাচাই করে দেখা যায়, সেটি ২০২৫ সালে ছাত্রলীগ-যুবলীগের একটি ঝটিকা মিছিলকে কেন্দ্র করে পুলিশের ধাওয়ার পুরোনো ভিডিও।
এ ছাড়া ধানমন্ডিতে তোফায়েল আহমেদের জানাজা ঘিরে পুলিশ ও আওয়ামী লীগের সংঘর্ষের দৃশ্য দাবিতে যে ভিডিও প্রচার করা হয়েছে, সেটিও সাম্প্রতিক কোনো ঘটনার নয়। ২০২৫ সালে হবিগঞ্জে দুই পক্ষের সংঘর্ষের একটি ভিডিও।
‘তোফায়েল আহমেদের জানাজায় অংশ নিতে আসা জনতাকে জামায়াত বাধা দিয়েছে’ শিরোনামে ছড়ানো আরেকটি ভিডিওর ক্ষেত্রেও একই ধরনের তথ্য বিকৃতি পাওয়া যায়। ভিডিওটি গত বছরের ৩০ সেপ্টেম্বর ঢাকায় বিএনপির অঙ্গসংগঠন ওলামা দলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী অনুষ্ঠানে দুই পক্ষের হাতাহাতির ঘটনা থেকে নেওয়া।
অপতথ্য শুধু ভিডিওতেই সীমাবদ্ধ ছিল না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব আব্দুন নূর তুষারের নামে একটি বক্তব্য প্রচার করা হয়। সেখানে দাবি করা হয়, তিনি বলেছেন, ‘তারেক রহমানের যদি আসলেই ইচ্ছা থাকত, তাহলে তোফায়েল আহমেদের জানাজায় বাধা দিতেন না। তোফায়েল আহমেদ কেবলমাত্র আওয়ামী লীগের নেতা না, উনি বাংলাদেশ সৃষ্টির অন্যতম কারিগর।’ প্রকৃত পক্ষে এ বক্তব্যের উৎস একটি স্যাটায়ারধর্মী ফেসবুক পেজ।