বৈশ্বিক জ্বালানিসংকটের মধ্যে এবার দেশের ইতিহাসে জ্বালানি তেলের দাম সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাল। গতকাল শনিবার রাতে জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়ে সরকার প্রজ্ঞাপন জারি করেছে।
গতকাল রাতে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে জ্বালানি তেলের নতুন দাম ঘোষণা করে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ। এতে বলা হয়, প্রতি লিটার ডিজেলের দাম ১১৫ টাকা, কেরোসিন ১৩০ টাকা, অকটেন ১৪০ টাকা ও পেট্রলের দাম ১৩৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। নতুন দাম আজ রোববার থেকে কার্যকর হচ্ছে।
এদিকে বাজারে জ্বালানি তেলের সরবরাহ কমায় ফিলিং স্টেশনে ভিড় বেড়ে গেছে। এখন সরবরাহ বাড়িয়ে মানুষের ভোগান্তি কমানোর পরিকল্পনা নিয়েছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। সংস্থাটির তিনজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, বাড়তি তেল সরবরাহ করতে গতকাল রাতেই তেল বিপণন কোম্পানিগুলোকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলার মধ্য দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ে। এতে প্রভাব পড়ে বৈশ্বিক জ্বালানি তেলের সরবরাহে। বিশ্ববাজারে দামও বাড়ে জ্বালানি তেলের। একপর্যায়ে অপরিশোধিত তেলের প্রতি ব্যারেলের দাম ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যায়। যুদ্ধ শুরুর আগে যা ছিল ৮০ ডলারের আশপাশে। গত শুক্রবার জ্বালানি সরবরাহের গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার ঘোষণা দেয় ইরান। এতে প্রতি ব্যারেল জ্বালানি তেলের দাম ৯০ ডলারের আশপাশে নেমে আসে। তবে ইরান গতকাল আবার হরমুজ প্রণালি বন্ধের ঘোষণা দেওয়ায় বৈশ্বিক তেল সরবরাহ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
এরই মধ্যে গতকাল বাংলাদেশে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর ঘোষণা এল। ২০২৪ সালের মার্চ থেকে বিশ্ববাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে জ্বালানি তেলের স্বয়ংক্রিয় মূল্য নির্ধারণ শুরু করে সরকার। সে হিসাবে আগের মাসে আমদানি করা জ্বালানি তেলের খরচ বিবেচনায় নিয়ে প্রতি মাসে নতুন দাম সমন্বয় করা হয়। তবে বিশ্ববাজারে ব্যাপক বাড়লেও এবার এপ্রিলের শুরুতে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায়নি সরকার। এখন মাসের মাঝামাঝি এসে বাড়ানো হলো।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, দেশের ইতিহাসে এক লাফে সর্বোচ্চ মূল্য বৃদ্ধি হয় ২০২২ সালের আগস্টে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর ডিজেলের দাম সাড়ে ৪২ শতাংশ বাড়িয়ে ১১৪ টাকা করা হয়। যদিও সমালোচনার মুখে একই মাসে ৫ টাকা কমানো হয়েছিল দাম।
এবার ডিজেলের দাম ১৫ শতাংশ বাড়িয়ে ১১৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে; যা দেশের ইতিহাসের সর্বোচ্চ। অন্য জ্বালানি তেলের দামও সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। অকটেনের দাম ১২০ থেকে বেড়ে হয়েছে ১৪০ টাকা। পেট্রলের দাম ১১৬ থেকে বেড়ে হয়েছে ১৩৫ টাকা। আর কেরোসিনের দাম ১১২ থেকে বেড়ে হয়েছে ১৩০ টাকা। এর আগে ২০২২ সালের আগস্টে অকটেনের দাম সর্বোচ্চ ১৩৫ ও পেট্রলের দাম ১৩০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছিল। একই মাসে আবার দাম ৫ টাকা কমিয়ে ১৩০ ও ১২৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছিল।
জ্বালানি তেলের মধ্যে উড়োজাহাজে ব্যবহৃত জেট ফুয়েল ও বিদ্যুৎকেন্দ্রে ব্যবহৃত ফার্নেস তেলের দাম নির্ধারণ করে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। আর নির্বাহী আদেশে ডিজেল, কেরোসিন, পেট্রল ও অকটেনের দাম নির্ধারণ করে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ।
দেশে জ্বালানি তেল আমদানি ও সরবরাহের একমাত্র সরকারি সংস্থা বিপিসি। তাদের অধীনে থাকা তিন বিপণন কোম্পানি পদ্মা, মেঘনা ও যমুনার বিক্রয় প্রতিনিধিদের মাধ্যমে তেল বিক্রি করে তারা।
বিপিসির কর্মকর্তারা বলছেন, স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে পেট্রলপাম্প থেকে ৩০ শতাংশ বাড়তি চাহিদা আসছে। তবে গত বছর একই দিনে তারা যতটুকু তেল নিয়েছে, এবারও তা দেওয়ার নির্দেশনা রয়েছে। এটা মানতে গিয়ে গত বছরের চেয়েও তেলের সরবরাহ কমে গেছে। এখন গত বছরের তালিকা ধরে তার থেকে সরবরাহ বাড়িয়ে ফিলিং স্টেশনের নামে দৈনিক তেল সরবরাহের বরাদ্দপত্র তৈরি করা হবে। এ ক্ষেত্রে স্থানীয় জেলা প্রশাসনের সহায়তা নেওয়া হবে। পাম্পের বর্তমান বিক্রি, মানুষের ভিড় বিবেচনায় নিয়ে চাহিদা মূল্যায়ন করবে জেলা প্রশাসন। এর ভিত্তিতে তেল সরবরাহ বাড়ানোর সুপারিশ করবে তারা।
দেশে ব্যবহৃত জ্বালানি তেলের মধ্যে মূল হলো ডিজেল, যা মোট জ্বালানি তেলের ৬৩ শতাংশ। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরুর পর সময়মতো জাহাজ আসতে না পারায় কিছুটা টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে। গত মাসে ছয়টি ডিজেলের জাহাজ আসতে না পারায় দেড় লাখ টন ডিজেলের মজুত কমেছে। এর মধ্যে যুদ্ধ নিয়ে আতঙ্কের কারণে বাড়তি জ্বালানি কেনার প্রবণতা তৈরি হয়েছে। এরপর ডিজেলের সরবরাহ কমানো হয়। বিকল্প উৎস থেকে ডিজেল আমদানির উদ্যোগ নেয় সরকার। ইতিমধ্যে পুরোনো সরবরাহকারীরা ডিজেলের সরবরাহ বাড়িয়েছে।
জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ বলছে, এপ্রিলে ডিজেলের চাহিদা প্রায় চার লাখ টন। বর্তমানে ডিজেলের মজুত আছে প্রায় ১ লাখ ২ হাজার টন। ডিজেল নিয়ে আসা আরও চারটি জাহাজে ১ লাখ টনের বেশি মজুত যুক্ত হচ্ছে। এর বাইরে আরও ৮০ হাজার টন ডিজেল মজুত রয়েছে, যা চাইলে জরুরি প্রয়োজনে ব্যবহার করা যাবে। আরও আমদানির প্রক্রিয়া চলছে। এ মাসে ১৭ এপ্রিল পর্যন্ত গড়ে ডিজেল বিক্রি হয়েছে দিনে ১১ হাজার ১০৭ টন। গত বছরের এপ্রিলে দিনে গড়ে ডিজেল বিক্রি হয়েছে ১১ হাজার ৮৬২ টন। আজ থেকে ১০ শতাংশ সরবরাহ বেড়ে ১৩ হাজার ৪৮ টন হওয়ার কথা।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত প্রথম আলোকে বলেন, এক বছরের তুলনায় পরবর্তী বছরে ৪ থেকে ৫ শতাংশের বেশি চাহিদা বাড়ার কথা নয়। বাজারে যে অস্বাভাবিক চাহিদা দেখা যাচ্ছে, তা আসলে যৌক্তিক নয়। কিন্তু মানুষের কষ্ট, ভোগান্তি হচ্ছে। তাই জ্বালানি তেলের সরবরাহ বাড়ানোর কথা চিন্তা করা হচ্ছে।
জ্বালানি বিভাগ ও বিপিসির তথ্য বলছে, দেশে সব মিলে অকটেন মজুত করার সক্ষমতা আছে ৪৫ হাজার ৮১৯ টন। ১৭ এপ্রিল বিক্রির পর অকটেন মজুত আছে ২৯ হাজার ৪৮৪ টন, যা বর্তমান সরবরাহ বিবেচনায় ২৫ দিনের মজুত। গত শুক্রবার ২৫ হাজার টন অকটেন নিয়ে চট্টগ্রাম বন্দরে একটি জাহাজ এসেছে। এটি খালাস করা হলে সক্ষমতার বেশি হবে মজুত। দেশীয় উৎস থেকেও প্রতিদিন অকটেন যুক্ত হচ্ছে। দেশে বর্তমানে অকটেনের কোনো ঘাটতি নেই।
পেট্রলপাম্প মালিকেরা বলছেন, অকটেন ও পেট্রলের জন্যই মূলত মানুষ ফিলিং স্টেশনে ভিড় করছে। তাই এগুলোর সরবরাহ বাড়ানো জরুরি। অধিকাংশ ফিলিং স্টেশনে তিন থেকে চার ঘণ্টার মধ্যে সব তেল বিক্রি হয়ে যায়। তবে শুধু পেট্রলপাম্পে নয়; এজেন্ট, ডিস্ট্রিবিউটর, ডিলারসহ সবাইকে তেল সরবরাহ করতে হবে। না হলে সব গ্রাহকের চাপ পেট্রলপাম্প সামলাতে পারবে না। বিশেষ করে সব বিক্রয় প্রতিনিধির কাছে ডিজেলের সরবরাহ বাড়াতে হবে।
মোটরসাইকেল, প্রাইভেট কার, মাইক্রোবাসে সাধারণত জ্বালানি তেল হিসেবে অকটেন ব্যবহৃত হয়। বছরে সরবরাহ করা মোট জ্বালানি তেলের ৬ শতাংশ অকটেন। গত অর্থবছরে দেশে ৪ লাখ ১৫ হাজার টন অকটেন বিক্রি হয়। এর মধ্যে ৫০ শতাংশ দেশেই উৎপাদিত হয়। আর বাকি ৫০ শতাংশ আমদানি করা হয়।
বিপিসি বলছে, গত বছরের মার্চে প্রতিদিন গড়ে অকটেন সরবরাহ করা হয়েছে ১ হাজার ১৯৩ টন। যুদ্ধের কারণে চাহিদা বাড়ায় এবার মার্চে দিনে সরবরাহ ২৬ টন বেড়ে হয়েছে ১ হাজার ২১৯ টন। এরপর সরবরাহ কমায় বিপিসি। গত বছরের তুলনায় এ মাসে দিনে এখন পর্যন্ত সরবরাহ কমেছে গড়ে ৫৬ টন। আর গত মাসের তুলনায় এ মাসে গড়ে দিনে সরবরাহ কমেছে ৯০ টন।
১৭ এপ্রিল পর্যন্ত প্রতিদিন ডিপো থেকে গড়ে সরবরাহ হয়েছে ১ হাজার ১২৯ টন অকটেন। গত বছরের এপ্রিলে দিনে অকটেন বিক্রি হয়েছে গড়ে ১ হাজার ১৮৫ টন। আজ থেকে এর সঙ্গে আরও ২৩৭ টন যুক্ত করে বাড়তি অকটেন সরবরাহের কথা রয়েছে।
মোটরসাইকেলে অকটেনের পাশাপাশি পেট্রল ব্যবহৃত হয়। পুরোনো ব্যক্তিগত গাড়িতেও কেউ কেউ পেট্রল ব্যবহার করেন। সিএনজি অটোরিকশা, লেগুনা, ঘাস কাটার যন্ত্র চালাতেও পেট্রল ব্যবহৃত হয়। দেশে জ্বালানি সরবরাহের প্রায় ৭ শতাংশ পেট্রল। এটি শতভাগ দেশে উৎপাদিত হয়। তবে কাঁচামাল হিসেবে কনডেনসেট আমদানি করতে হয়। বর্তমানে পেট্রলের মজুত আছে ১৮ হাজার ৮৩০ টন। এপ্রিলে গড়ে পেট্রল বিক্রি করা হয়েছে ১ হাজার ২৫৩ টন। গত বছরের এপ্রিলে দিনে গড়ে বিক্রি হয়েছে ১ হাজার ৩৭৪ টন। আজ থেকে আরও ১৩৭ টন বাড়িয়ে সরবরাহের কথা।
বুয়েটের সাবেক অধ্যাপক ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ইজাজ হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, সরবরাহ বাড়ানো ইতিবাচক। তবে শুধু এটি করে সমাধান হবে বলে মনে হয় না। মানুষের মধ্যে তেল পাওয়া নিয়ে ভীতি আছে। আরও কিছু উদ্যোগ নিতে হবে। যেমন ঢাকায় তেল সরবরাহের উৎস বাড়াতে হবে। কিউআর কোড ব্যবহার করে তেল প্রাপ্তির আওতা বাড়াতে হবে। বাড়তি চাহিদা, ব্যবস্থাপনার বিষয়গুলোও খতিয়ে দেখতে হবে।