
মেলা মানে বারো রকম ঘটনা। গতকাল বুধবারের মেলা ছিল বইয়ের চেয়ে বেশি আলোচনা আর তথ্য আদান-প্রদানের। গণমাধ্যমকর্মী, ক্রেতা–প্রকাশকেরা কথা বলছিলেন আদর্শ প্রকাশনীর স্টল বরাদ্দের রায় নিয়ে। তিনটি বই বিক্রি না করার শর্তে আদর্শ প্রকাশনীকে স্টল বরাদ্দ দিতে রায় দিয়েছেন উচ্চ আদালত। তাঁদের কথায় আসে গ্রন্থ প্রকাশ ও রাবেয়া বুক হাউসের প্রসঙ্গও, নিয়ম লঙ্ঘন করে বই বিক্রির অভিযোগে মঙ্গলবার রাতে বন্ধ করে দেওয়া হয় এই দুই স্টল। গ্রন্থ প্রকাশের বিক্রয়কর্মী নাসির হোসেন জানালেন, বিকেলের মধ্যে তাঁরা অধিকাংশ বই সরিয়ে নিয়েছেন। আর রাবেয়া বুক হাউস পুরোটাই বন্ধ দেখা গেল।
এবার নবান্ন প্রকাশনীর স্টলের সজ্জা নিয়ে অনেকের আগ্রহ দেখা যাচ্ছে। প্রদর্শনী টেবিলে অনেক বইয়ের ভেতর শোভা পাচ্ছিল খয়েরি রঙের একটা বই। কথোপকথন বিষয় লালন নামের বইটি সম্পাদনা করেছেন আবুল আহসান চৌধুরী।
তবে মেলার বই নিয়ে বিশেষ মাথাব্যথা ছিল না ৭৫ বছরের সৈয়দ গোলাম সারওয়ার কাদেরীর। আমুদে মানুষটি নিজেকে হক চাচা পরিচয় দিয়ে খুশি হন। যাচ্ছিলেন ফুডকোর্টের দিকে। তাঁর সঙ্গে থাকা পাতা প্রকাশনীর স্বত্বাধিকারী আলেয়া বেগম বললেন, ‘মেলার ফুডকোর্টে খাবারের যা দাম, তাতে অনেক পাঠকের বই কেনার টাকা ফুরিয়ে যায় আগে সেখানে গেলে।’ কথাটি অমূলক নয়। এক পিস চিকেন চাপের দাম ১৮০ টাকা আর ৮ পিসের ফুচকার প্লেট ৮০ টাকা। প্রমাদ গুনে ফুডকোর্ট থেকে বের হতেই হাতের বাঁয়ে ‘লেখক বলছি’ মঞ্চ। সামনে বসে আলোচনা শুনছিলেন লেখক নাসিমা আনিস। তাঁর পায়ের ব্যথা পরাজিত হয়েছে মেলায় আসার আনন্দে। শখ করে ফুলের মুকুট মাথায় দিয়েছিলেন। মঞ্চে তখন কথা বলছেন লেখক গাজী আজিজুর রহমান। মঞ্চ থেকে নামতেই যেন স্মৃতিকাতরতা পেয়ে বসল তাঁকে। সত্তরের দশকে তাঁর দেখা বইমেলার স্মৃতি বলতে গিয়ে জানালেন সূর্যতপা নামের একটি একুশে সংকলনের কথা। বইমেলাকে কেন্দ্র করে একুশে সংকলন প্রকাশের ইতিহাস জানালেন তিনি। আর তথ্যকেন্দ্র জানাল, গতকাল মেলায় নতুন বইয়ের সংখ্যা ১১৪।
নালন্দা প্রকাশনীর স্বত্বাধিকারী রেদোয়ান জুয়েল কলকাতা আন্তর্জাতিক বইমেলা শেষ করে সদ্য ফিরেছেন দেশের মেলায়। জানালেন, কলকাতা বইমেলায় ১০টি প্রবেশপথের প্রতিটিতে পৃথক নির্দেশিকা আছে। কোন ফটক দিয়ে প্রবেশ করলে কতগুলো স্টল আছে জানা যায়। অমর একুশে বইমেলার এই দিকটিতে এখনো শৃঙ্খলা আসেনি বলে তাঁর মত। তবে মেলার জমজমাট ভাবটি আমাদের বেশি বলে মন্তব্য করলেন তিনি। প্রমাণ পাওয়া গেল পাশের প্রথমা প্রকাশনের প্যাভিলিয়নে। গতকাল রাজধানীর উত্তরখান সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের এক শিক্ষক এসে প্রথমা প্যাভিলিয়ন থেকে একসঙ্গে কিনে নিয়েছেন ৫১টি বই। কোন ধরনের বই শিক্ষক কিনলেন দেখতে চাইলে বিপণনকর্মীরা দেখালেন মহিউদ্দিন আহমদের একাত্তরের মুজিব, আনিসুল হকের লেখক–সঙ্গ স্মৃতি আনন্দ, এমনকি গুলজারের দুজনসহ অনেকগুলো বই।
সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে মেলার বাইরে তখন অনেক ভিড়। এর ভেতর ভেসে এল ‘মাটিরও পিঞ্জিরার মাঝে বন্দী হইয়া রে’ গানের সুর। বাঁশিতে কেউ বাজিয়ে শোনাচ্ছেন এ সুর। বংশীবাদক মীর মাহাবুব বাংলাদেশ বেতারের অনিয়মিত শিল্পী। অবসরে আরেকটু উপার্জন করতে এসেছিলেন মেলায় বাঁশি বিক্রি করতে। কয়েক হাত দূরেই দাঁড়িয়ে হাতে বানানো বেহালা বাজাচ্ছিলেন মো. সালাউদ্দীন। মেলা ভাঙার সময়ে দুই সুরওয়ালা আলাপ করে জেনে নিলেন, বৃহস্পতিবারের মেলায় কে কোথায় থাকবেন। মেলাফেরতা এক পাঠক সেই দৃশ্য দেখে মন্তব্য ছুড়ে দিলেন, এই না হলে মেলা!