অধ্যাপক হুমায়ুন আখতার
অধ্যাপক হুমায়ুন আখতার

অভিমত

নেপালের ঘটনা বাংলাদেশের জন্য সতর্কবার্তা

নেপালের আকস্মিক বন্যার পেছনে কয়েকটি কারণ থাকতে পারে। উজানের এলাকায় অতিরিক্ত বৃষ্টি একটি কারণ হতে পারে, তবে এখন পর্যন্ত পাওয়া রেকর্ডে সে রকম বৃষ্টির তথ্য নেই। আরেকটি কারণ হতে পারে হিমবাহ হ্রদে অতিরিক্ত পানি জমে পানির চাপ বেড়ে যাওয়া। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে হিমবাহ গলে এ ধরনের ঝুঁকি বাড়ছে। পাশাপাশি পাহাড়ি নদীতে জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের বাঁধ যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ না হলে পানির চাপে তা ভেঙে যেতে পারে। তখন পানির সঙ্গে কাদা ও বড় পাথর নেমে এসে প্রবাহের ধ্বংসক্ষমতা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, বাংলাদেশে এ ধরনের কোনো আশঙ্কা বা ঝুঁকি আছে কি না। এ ধরনের ঝুঁকি আমাদের একেবারে নেই—এটা বলা যাবে না; বরং আমাদের এখানে অন্য একটা দিক থেকে এ ধরনের বিপর্যয়ের ঝুঁকি রয়েছে।

বাংলাদেশে সিলেট থেকে একেবারে টেকনাফ পর্যন্ত যে অঞ্চল, বিশেষ করে পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চল, সেখানে ৮ দশমিক ২ থেকে ৯ মাত্রার ভূমিকম্প ঘটাতে পারে—এমন শক্তি জমা হয়ে আছে। অর্থাৎ ওই অঞ্চলে বড় মাত্রার ভূমিকম্পের ঝুঁকিকে একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

ভয়াবহ দুর্যোগে নেপালের নুয়াকোট জেলার ত্রিশূলী এলাকার একটি সড়ক ও বাড়িঘর কাদায় ঢেকে গেছে। ২৬ আগস্ট ২০২৬

এখন এই ভূমিকম্প যদি হয়, তখন আমাদের সবচেয়ে বড় চিন্তার জায়গাগুলোর একটি হচ্ছে কাপ্তাই লেক এবং কাপ্তাইয়ের জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের বাঁধ। বাঁধটি যদি কোনো কারণে ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, বিশেষ করে বাঁধের কোনো দুর্বল জায়গা থাকে এবং সেই জায়গা যদি ভূমিকম্পের ধাক্কায় ভেঙে যায়, তাহলে বিপুল পরিমাণ পানি খুব দ্রুত নিচের দিকে নেমে আসতে পারে।

বিশেষ করে বর্ষাকালে যদি এ ধরনের ভূমিকম্প হয়, তখন পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে। কারণ, তখন কাপ্তাই লেকে পানির পরিমাণ অনেক বেশি থাকে। ওই বিপুল পরিমাণ পানি যদি বাঁধ ভেঙে একসঙ্গে বের হয়ে আসে, তাহলে যে বেগে পানি নিচের দিকে যাবে, সেটা কাপ্তাই শহরসহ আশপাশের এলাকার জন্য বড় ধরনের বিপর্যয় তৈরি করতে পারে। কাজেই নেপালে যে ধরনের আকস্মিক পানির প্রবাহ আমরা দেখলাম, আমাদের এখানেও ভিন্ন প্রেক্ষাপটে তেমন একটা ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

ভয়াবহ দুর্যোগে নেপালের নুয়াকোট জেলার ত্রিশূলীতে কাদায় ঢেকে যাওয়া একটি ভবন। ২৬ আগস্ট ২০২৬

১৯৬২ সালে বাঁধটি যখন চালু হয়, তখন থেকে এ ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগের কথা মাথায় রেখে নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ও ঝুঁকি মূল্যায়ন করা হচ্ছে কি না—সেটি যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে দেখা হয়নি।

তাই কাপ্তাই বাঁধের রক্ষণাবেক্ষণের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত। বাঁধটি অনেক পুরোনো। এত দীর্ঘ সময় ধরে একটি বাঁধ কাজ করছে। তাই এর কাঠামোগত সক্ষমতা, কোথাও কোনো ফাটল হয়েছে কি না, কোথাও কোনো দুর্বলতা তৈরি হয়েছে কি না—এগুলো নিয়মিত পরীক্ষা করা দরকার।

বৈজ্ঞানিকভাবে পরীক্ষা করে দেখতে হবে, বাঁধের কাঠামো কতটা শক্তিশালী আছে। পানির চাপ কতটা, সেই চাপ কীভাবে বাঁধের ওপর প্রবাহিত হচ্ছে, বাঁধ সেই চাপ কতটা নিতে পারছে—এসব বিষয় নিয়মিত পরিমাপ করতে হবে।

নেপালের ঘটনাকে আমাদের জন্য একটা সতর্কবার্তা হিসেবে দেখা যেতে পারে। নেপালের সঙ্গে বাংলাদেশের ভৌগোলিক পরিস্থিতি এক নয়। সেখানে যে কারণে ঘটনা ঘটেছে, আমাদের এখানেও ঠিক একই কারণে ঘটবে—এমন কথা আমি বলছি না। কিন্তু পাহাড়ি এলাকায় পানি জমে থাকা, বাঁধ, ভূমিকম্প এবং বাঁধের দুর্বলতার কারণে হঠাৎ বিপুল পরিমাণ পানি নিচের দিকে নেমে আসার যে ঝুঁকি, সেটা আমাদেরও বিবেচনায় রাখতে হবে।