সাতক্ষীরার তালায় মাষকলাই ও চালকুমড়া দিয়ে বড়ি তৈরি
সাতক্ষীরার তালায় মাষকলাই ও চালকুমড়া দিয়ে বড়ি তৈরি

দুর্যোগ প্রস্তুতিতে অলক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছেন আলতারা

যমুনার চরে একবার মিষ্টিকুমড়ার বাম্পার ফলনের খবর শুনে আর ছবি দেখে উত্তেজিত হয়ে ছুটে গিয়েছিলাম সেখানে। ঘটনাটি গত বছরের। পথে বগুড়ার মোকামতলা হাটে বিশাল বিশাল কুমড়া দেখে ভালো লাগে। মনটা ভরে গিয়েছিল।

হোঁচট খেলাম চরে গিয়ে আলতাবুর সঙ্গে দেখা হওয়ার পর। তিনি ‘মোটা’ কুমড়ার চাষে মাতেননি। আলতাবুকে চরের সবাই ‘বীজ বুড়ি’ হিসেবেই চেনে। তাঁর কথা, ‘মোটা কুমড়া টেকবি না।’ মানে এটা টেকসই নয়। এই কুমড়া বেশি দিনও থাকে না। বললেন, ‘ছাতা পড়ে পচি যায়।’

আমাদের সঙ্গে থাকা কৃষিবিদ হালিম শেখও জানালেন, বিশাল আকারের এই কুমড়া সংরক্ষণযোগ্য নয়। সেখানে আলতাবুরা দেশি কুমড়ার বীজ ব্যবহার করেন। গহিন চরের মানুষ শীতের সবজি হিসেবে বন্যার পানির পর জমিতে সেই মিষ্টিকুমড়ার বীজ বুনে দেন। চৈত্র–বৈশাখ মাসে পাকলে উঠিয়ে রাখেন বর্ষার জন্য। দুই বছরেও এসব কুমড়ার কিছু হয় না।

দীর্ঘদিন ধরে চাষ করা স্থানীয় ধান, ডাল ও শাকসবজির জাত সংরক্ষণের মাধ্যমে কৃষির বৈচিত্র্য বজায় রাখতে সহায়তা করা যায়। তবে সব স্থানীয় জাত সব ধরনের দুর্যোগ সহ্য করতে পারে না; উপযুক্ত জাত নির্বাচন জরুরি।

আলতাবুরা কেন বীজ সংরক্ষণ করেন

বাংলাদেশে বন্যা, নদীভাঙন, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও লবণাক্ততার কারণে কৃষকের ফসল এবং পরবর্তী মৌসুমের বীজ নষ্ট হতে পারে। এ পরিস্থিতিতে নারীদের সংরক্ষিত বীজ কৃষি পুনরুদ্ধারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বন্যায় ফসল নষ্ট হলেও নিরাপদে সংরক্ষিত বীজ থাকলে পরবর্তী উপযুক্ত মৌসুমে নতুন করে চাষ শুরু করা সহজ হয়। এতে বাইরের উৎস থেকে বীজ সংগ্রহের ওপর নির্ভরতা কিছুটা কমে।

দীর্ঘদিন ধরে চাষ করা স্থানীয় ধান, ডাল ও শাকসবজির জাত সংরক্ষণের মাধ্যমে কৃষির বৈচিত্র্য বজায় রাখতে সহায়তা করা যায়। তবে সব স্থানীয় জাত সব ধরনের দুর্যোগ সহ্য করতে পারে না; উপযুক্ত জাত নির্বাচন জরুরি।

গওহার নঈম ওয়ারা

নিজেদের সংরক্ষিত বীজ ব্যবহার করতে পারলে প্রতিটি মৌসুমে বীজ কেনার খরচ কমতে পারে। তবে সংরক্ষিত বীজের অঙ্কুরোদ্গম ও গুণমান ভালো থাকা প্রয়োজন। বীজ বিনিময়, ভাগাভাগি এবং প্রতিবেশীদের সহায়তার মাধ্যমে দুর্যোগের পর কৃষি পুনরুদ্ধারের একটি স্থানীয় নেটওয়ার্কও গড়ে উঠতে পারে।

আমরা জানি, বীজ সংরক্ষণ নিজে থেকেই দুর্যোগের ক্ষতি ঠেকাতে পারে না। বীজ নিরাপদে রাখা, উপযুক্ত জাত নির্বাচন, আবহাওয়ার পূর্বাভাস এবং সঠিক সময়ে বপনের সুযোগ—সবকিছু একসঙ্গে বিবেচনা করতে হয়। মনে রাখা দরকার, বাণিজ্যিক বীজের ওপর নির্ভরতা বাড়লে কিছু স্থানীয় জাতের চাষ কমে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। তাই বীজ সংরক্ষণে নারীর অবদানকে স্বীকৃতি দেওয়ার পাশাপাশি কৃষি উপকরণ, প্রশিক্ষণ, বাজার এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাঁদের প্রবেশাধিকারও নিশ্চিত করা দরকার।

ভাবতে হবে কীভাবে নারীদের বীজ সংরক্ষণ কার্যক্রমকে আরও শক্তিশালী করা যায়? পারিবারিক বীজভান্ডারকে কীভাবে আরও বিজ্ঞানভিত্তিক করা যায়? গ্রামভিত্তিক বীজ ব্যাংক কি গড়ে তোলা সম্ভব? বীজের গুণমান পরীক্ষা (অঙ্কুরোদ্গম ক্ষমতা, আর্দ্রতা এবং রোগাক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি যাচাই) এসবের কি কোনো সহজ প্রশিক্ষণ দেওয়া যায়?

বছর পাঁচেক আগে ২০২১ সালের ডিসেম্বরে সাতক্ষীরার তালায় গিয়ে দেখি এক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের খোলা মাঠে গ্রামের নারীরা মাষকলাই আর চালকুমড়া দিয়ে বড়ি বানাচ্ছেন। এই বড়ি হবে তাঁদের নিদানকাল মানে বর্ষার খাবার। সাদা চোখে এসব চলমান গৃহস্থালির কাজ বলেই মনে হবে। কিন্তু এগুলো তুচ্ছতাচ্ছিল্য বিষয় নয়, সামান্য কোনো কাজও নয়। বরং বন্যা মোকাবিলায় নারীদের পারিবারিক প্রস্তুতি। এগুলোই দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাসের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে, কিন্তু আমাদের চোখের আড়ালেই থেকে যায়। থাকে অস্বীকৃত।

দুর্যোগ-সহনশীল সংরক্ষণ

বন্যাপ্রবণ এলাকায় বীজ উঁচু স্থানে রাখা, জলরোধী পাত্র ব্যবহার করা এবং সম্ভব হলে বিকল্প নিরাপদ স্থানে কিছু বীজ রাখার কোনো ব্যবস্থা করা যায় কি? পরিবেশ বিবেচনায় স্থানীয় জাতের নথিভুক্তকরণ কি সম্ভব? নারীর মালিকানা ও নেতৃত্বে বীজ ব্যাংক, বীজ বিতরণ কীভাবে সম্ভব? কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, স্থানীয় কৃষি সংগঠন ও গবেষণাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে নারী কৃষকদের সংযোগ তৈরিতে আগ্রহী কি না?

বছর পাঁচেক আগে ২০২১ সালের ডিসেম্বরে সাতক্ষীরার তালায় গিয়ে দেখি এক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের খোলা মাঠে গ্রামের নারীরা মাষকলাই আর চালকুমড়া দিয়ে বড়ি বানাচ্ছেন। এই বড়ি হবে তাঁদের নিদানকাল মানে বর্ষার খাবার। সাদা চোখে এসব চলমান গৃহস্থালির কাজ বলেই মনে হবে। কিন্তু এগুলো তুচ্ছতাচ্ছিল্য বিষয় নয়, সামান্য কোনো কাজও নয়। বরং বন্যা মোকাবিলায় নারীদের পারিবারিক প্রস্তুতি। এগুলোই দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাসের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে, কিন্তু আমাদের চোখের আড়ালেই থেকে যায়। থাকে অস্বীকৃত।

সেবার তালার মহান্দী গ্রামের দীপালি রানি এবং হাজরাকাটী গ্রামের ফাতেমা বেগম বলেছিলেন, ‘বড়ি কেবল আমরা খাই না, নিজেদের আত্মীয়স্বজনের বাড়িতেও পাঠানো হয়।’ দুর্যোগের সময় খাবার ভাগ করে খাওয়ার এই চর্চা এখনো নারীরা ধরে রেখেছেন।

আজ ১৩ অক্টোবর আন্তর্জাতিক দুর্যোগ প্রশমন দিবস। জাতিসংঘের দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাসবিষয়ক দপ্তর এ বছর দিবসটির প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করেছে, রেজিলিয়েন্স স্টার্টস অ্যাট হোম, যার আক্ষরিক সাদামাটা বাংলা ‘সহনশীলতার শুরু ঘর থেকে’। অনুবাদ যা–ই হোক, প্রজ্ঞাপিত প্রতিপাদ্যের মধ্যে এক পরম সত্য লুকিয়ে আছে। দুর্যোগের তাপ সবচেয়ে বেশি লাগে মানুষের ঘরে। দুর্যোগ মোকাবিলার সক্ষমতা গড়ে তোলার কাজও শুরু হয় ঘর থেকেই।

শুধু খাদ্য আর বীজ নিরাপত্তা নয়, নিদানকালের জ্বালানি নিরাপত্তার জন্যও নারীরা কাজ করেন। জ্বালানি কাঠ সংরক্ষণ, বহনযোগ্য চুলা, গোবর শুকিয়ে রাখার কৌশল দিয়ে নারীরা ঘরের কোণ থেকেই জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করেন। তাঁরা খেয়াল রাখেন মানুষের পাশাপাশি গবাদিপ্রাণীর খাদ্য নিরাপত্তার প্রতিও।

আজ ১৩ অক্টোবর আন্তর্জাতিক দুর্যোগ প্রশমন দিবস। জাতিসংঘের দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাসবিষয়ক দপ্তর এ বছর দিবসটির প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করেছে, রেজিলিয়েন্স স্টার্টস অ্যাট হোম, যার আক্ষরিক সাদামাটা বাংলা ‘সহনশীলতার শুরু ঘর থেকে’। অনুবাদ যা–ই হোক, প্রজ্ঞাপিত প্রতিপাদ্যের মধ্যে এক পরম সত্য লুকিয়ে আছে। দুর্যোগের তাপ সবচেয়ে বেশি লাগে মানুষের ঘরে। দুর্যোগ মোকাবিলার সক্ষমতা গড়ে তোলার কাজও শুরু হয় ঘর থেকেই।

ঘরের কথা উঠলেই ‘হোম মেকার’ নারীদের কথা আসে। এই কাজ মূলত তাঁরাই করেন। আশ্বিন আর বৈশাখ তাঁকে বিচলিত করে। ঝড়ের এই মাসগুলোর জন্য তিনি প্রস্তুত হন। ঘরটাকে শক্ত করে বেঁধে খুঁটি বদলান। তাঁরা জানেন কীভাবে বর্ষা ‘পার’ করতে হবে। শ্রাবণ–ভাদ্রের কথা তাঁদের ভাবতে হয় চৈত্র-বৈশাখ থেকেই। অভাবের ভাদ্র থেকে কার্তিকের মোকাবিলার জন্য নারীরা প্রস্তুত হন শুকনা খাবার সবজি (ডাল–কুমড়ার বড়ি, শুকিয়ে রাখা পাটশাক, শুঁটকি, আচার ইত্যাদি) সংরক্ষণের মাধ্যমে।

বীজ নিরাপত্তা, খাদ্য/জ্বালানি নিরাপত্তা গবাদিপ্রাণী সুরক্ষায় গ্রাম পর্যায়ে নারীদের ভূমিকা কেবল দুর্যোগ–পরবর্তী সময়ের জন্য সঞ্চয় নয়। বরং এগুলো কৃষিজ্ঞান সংরক্ষণ, স্থানীয় জাতের বৈচিত্র্য বজায় রাখা, দুর্যোগের পর কৃষি পুনরুদ্ধার এবং পরিবারের খাদ্যনিরাপত্তা রক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপায়।

শুধু খাবার নয়, বীজ বাছাই আর সংরক্ষণের কাজটাও নারীরা করেন যথেষ্ট জ্ঞানবুদ্ধি আর পেশাদারত্বের সঙ্গে। অদিন বা নিদানকালের জন্য এসব সংগ্রহের সুফল পাড়া–প্রতিবেশীরাও পান। এটাই আমাদের গৃহভিত্তিক দুর্যোগ প্রস্তুতি। আমাদের সামাজিক মূলধন। এই সামাজিক মূলধনকে প্রসারিত করে নাগরিক ও রাষ্ট্রীয় চর্চার আস্তিনের মধ্যে আনাটা খুবই জরুরি। এবারের প্রতিপাদ্যে তাই সরকার, বেসরকারি খাত, নাগরিক সমাজ, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সংগঠন, নারী সংগঠন, যুব নেটওয়ার্ক, বিভিন্ন সম্প্রদায়ের নেতা এবং প্রতিটি পরিবারকে যেখানে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন, সেই গৃহকোণ থেকে দুর্যোগের ঝুঁকি কমাতে গৃহভিত্তিক বাস্তব পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।

বীজ নিরাপত্তা, খাদ্য/জ্বালানি নিরাপত্তা গবাদিপ্রাণী সুরক্ষায় গ্রাম পর্যায়ে নারীদের ভূমিকা কেবল দুর্যোগ–পরবর্তী সময়ের জন্য সঞ্চয় নয়। বরং এগুলো কৃষিজ্ঞান সংরক্ষণ, স্থানীয় জাতের বৈচিত্র্য বজায় রাখা, দুর্যোগের পর কৃষি পুনরুদ্ধার এবং পরিবারের খাদ্যনিরাপত্তা রক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপায়। এই কাজকে স্বীকৃতি দিয়ে নারীদের দক্ষতা, সম্পদ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা বাড়ানো গেলে গ্রামীণ কৃষি ও দুর্যোগ মোকাবিলার সক্ষমতা আরও শক্তিশালী হতে পারে।

  • গওহার নঈম ওয়ারা: স্বাধীনতার ৫০ বছর: দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশের অর্জন গ্রন্থের লেখক। wahragawher@gmail.com