
রাজধানীর মিরপুরের জাতীয় চিড়িয়াখানায় রাখা আলোচিত মহিষ ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প’ প্রতিদিন ২৫ কেজি নেপিয়ার জাতের ঘাস খাচ্ছে। সেই সঙ্গে প্রাণীটিকে খেতে দেওয়া হচ্ছে পাঁচ কেজি ছোলা-ভুসি। মহিষটির দিনে পানি লাগছে আধা মণ।
জাতীয় চিড়িয়াখানার কিউরেটর আতিকুর রহমান আজ শুক্রবার প্রথম আলোকে এসব তথ্য জানান। তিনি বলেন, বৃহস্পতিবার অ্যালবিনো জাতের মহিষটি ২৫ কেজি নেপিয়ার জাতের ঘাস ও ৫ কেজি ছোলা-ভুসি খেয়েছে। পানি খেয়েছে আধা মণ। আজও (শুক্রবার) প্রাণীটিকে একই ধরনের, একই পরিমাণে খাবার দেওয়া হয়েছে। প্রয়োজন হলে আরও বেশি খাবার দেওয়া হবে।
গত বুধবার রাতে ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প’ নামের মহিষটিকে মিরপুরের জাতীয় চিড়িয়াখানায় নেওয়া হয়। তার পর থেকে মহিষটির দেখভাল করছে জাতীয় চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষ।
চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষ সূত্রে জানা গেছে, মহিষটিকে সকাল ৯টার দিকে ছোলা-ভুসিজাতীয় খাবার দেওয়া হয়। এরপর বেলা ১১টার দিকে দেওয়া হয় ঘাস। বেলা ২টার পর আবার ঘাস খেতে দেওয়া হয়। ৩টার দিকে ছোলা-ভুসি খায় প্রাণীটি। এরপর আর প্রাণীটিকে ভারী খাবার খেতে দেওয়া হয় না।
মহিষটিকে জাতীয় চিড়িয়াখানার ‘এল-০৭’ খাঁচায় রাখা হয়েছে। খাঁচার সামনে এ মহিষের একটি পরিচয় ঝুলিয়েছে চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষ। তাতে লেখা রয়েছে, ‘সাদা মহিষ (ডোনাল্ড ট্রাম্প)’। সেখানে ইংরেজি হরফে ‘অ্যালবিনো বাফেলো’ লেখা রয়েছে।
‘ডোনাল্ড ট্রাম্প’ নামের মহিষটিকে যে খাঁচায় রাখা হয়েছে, সেটির পাশের খাঁচায় রয়েছে একটি গয়াল। সেটি উন্মুক্ত। পুরো খাঁচা ঘুরে বেড়ায় গয়ালটি। মহিষটিকে বেঁধে রাখা হয়েছে।
চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, মহিষটি গৃহপালিত। সে কারণে এটিকে বেঁধে রাখা হবে। এটি এভাবেই অভ্যস্ত।
আজ দুপুরে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, মহিষটিকে যেখানে বেঁধে রাখা হয়েছে, সেই অংশটি পাকা করা। ওপরে টিনের ছাউনি। কিছুটা দূরে একটি গাছ রয়েছে। তবে সেই গাছের ছায়া মহিষকে রাখার ঘরের ওপর পড়ে না।
তপ্ত দুপুরে মহিষটিকে গোসল করিয়ে দিচ্ছিলেন চিড়িয়াখানার একজন কর্মী। পাইপ দিয়ে মহিষের গায়ে পানি ছিটিয়ে গোসল করানো হচ্ছিল।
কিউরেটর আতিকুর রহমান বলেন, যাতে গরম না লাগে সে কারণে তাঁরা দিনে দুই থেকে তিনবার মহিষটিকে গোসল করিয়ে দিচ্ছেন। মহিষটির জন্য একটি স্ট্যান্ডফ্যানের ব্যবস্থা করা হবে।
মহিষটিকে যে খাঁচায় রাখা হয়েছে, সেটি বেশ বড়। খাঁচার প্রাথমিক বেষ্টনী থেকে ২০ থেকে ২৫ ফুট দূরে প্রাণীটিকে রাখা হয়েছে। ফলে দর্শনার্থীদের অনেকেই মহিষটিকে কাছ থেকে দেখার সুযোগ পাচ্ছেন না।
স্ত্রী, মেয়ে ও স্ত্রীর বোনকে নিয়ে নারায়ণগঞ্জ থেকে মিরপুরের জাতীয় চিড়িয়াখানায় ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প’ নামের মহিষটিকে দেখতে এসেছেন মো. সুমন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, মহিষটিকে আরেকটু কাছে রাখলে ভালো হতো। তাহলে দেখতে সুবিধা হতো।
সুমনের ৬ বছর বয়সী মেয়ে সোবাহার এত দূর থেকে মহিষটিকে দেখে মন ভরেনি। সে বলছিল, ‘যদি আমাকে খাঁচার ভেতরে একটু ঢুকতে দিত, তাহলে ভালো করে দেখতে পেতাম। তারপরও দেখেছি। ওর চুলটা সুন্দর।’
চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষ বলছে, মহিষটিকে দূরে রাখাই যথাযথ হয়েছে। কেননা, কাছাকাছি রাখলে একদিকে প্রাণীর কাছ থেকে মানুষের মধ্যে রোগজীবাণু ছড়াতে পারে। আবার মানুষের কাছ থেকেও প্রাণীর শরীরে জীবাণু প্রবেশের আশঙ্কা রয়ে যায়।
‘ওই যে ডোনাল্ড ট্রাম্প’—চিড়িয়াখানায় মহিষটিকে দেখে এভাবেই অনুভূতি প্রকাশ করেন এক তরুণ। পরে মুঠোফোন বের করে মহিষটির ছবি তোলেন তিনি।
গতকালের মতো আজও মহিষটিকে দেখতে চিড়িয়াখানায় দর্শনার্থীর ভিড় ছিল। পবিত্র ঈদুল আজহার দ্বিতীয় দিনে আজ জাতীয় চিড়িয়াখানায় যাঁরা এসেছেন, তাঁরা একবারের জন্য হলেও মহিষটিকে দেখার চেষ্টা করেছেন।
দুপুরে খাঁচার সামনে গিয়ে দেখা যায়, দর্শনার্থীদের থেকে উল্টো দিকে মুখ করে মহিষটি শুয়ে আছে। এর ফলে মুখ দেখতে পারছিলেন না দর্শনার্থীরা। মহিষটির কাছে তখন চিড়িয়াখানার একজন কর্মী ছিলেন। তাঁর কাছে অনেকেই মহিষটিকে তুলে মুখ দেখার ব্যবস্থা করে দেওয়ার আবদার করেন। তবে সেই চাওয়া পূরণ করেননি ওই কর্মী।
সেখানে ছিলেন নাজমুল হুদা নামের এক দর্শনার্থী। চিড়িয়াখানার ওই কর্মীর উদ্দেশে উচ্চ স্বরে তিনি বলেন, ‘বড় ভাই, ট্রাম্পকে একটু দেখান না। অনেক দূর থেকে আসছি।’
পরে নাজমুল হুদা প্রথম আলোকে বলেন, রাজধানীর রামপুরা থেকে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে আজ চিড়িয়াখানায় আসার একমাত্র উদ্দেশ্য ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প’ নামের মহিষটিকে দেখা। মহিষটির মুখ দেখতে পারেননি। অনেকবার বলার পরও দেখাচ্ছে না।
মহিষটিকে নারায়ণগঞ্জ শহরের পাইকপাড়ায় জিয়া উদ্দিন মৃধার ‘রাবেয়া অ্যাগ্রো ফার্মে’ লালন-পালন করা হচ্ছিল। জিয়া উদ্দিন সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, মহিষটির ‘অসাধারণ চুল’ দেখে তাঁর ভাই নাম রেখেছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নামে।
মহিষটিকে নিয়ে ১২ মে প্রথম আলো খবর প্রকাশ করে। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে এ নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। এরপর মহিষটিকে নিয়ে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে প্রতিবেদন-ভিডিও প্রকাশিত হয়।
জিয়া উদ্দিন মৃধা মহিষটি বিক্রি করেছিলেন কেরানীগঞ্জের জিনজিরার মনিরুজ্জামানের কাছে। কোরবানির ঈদ সামনে রেখে গত সোমবার বিকেলে নারায়ণগঞ্জের খামার থেকে মহিষটিকে কেরানীগঞ্জে নিজের বাড়িতে আনেন মনিরুজ্জামান।
ঈদের আগের দিন (বুধবার) বিকেলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হস্তক্ষেপে মহিষটিকে মনিরুজ্জামানের বাড়ি থেকে নিয়ে আসে পুলিশ। শুরুতে কেরানীগঞ্জ থানায় নেওয়া হয়। পরে মহিষটির ঠাঁই হয় মিরপুরের জাতীয় চিড়িয়াখানায়।