সাতক্ষীরায় ১১ বছর ৯ মাস বয়সী এক শিশুর বিয়ের আয়োজনের খবর পেয়ে গত বৃহস্পতিবার তা বন্ধ করেছে স্থানীয় প্রশাসন। শিশুটি স্থানীয় একটি মাদ্রাসায় চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ে। প্রশাসনের কাছে বাল্যবিবাহ না দেওয়ার মুচলেকা দিয়েছেন তার মা-বাবা।
ঘটনাটি ২৪ সেপ্টেম্বর সাতক্ষীরা সদর উপজেলায়। তবে প্রথম আলোর কাছে শিশুটির মা-বাবা বিয়ের আয়োজনের কথা অস্বীকার করেছেন। তাঁদের দাবি, ছেলেপক্ষ মেয়েকে দেখেছে; কিন্তু তাঁরা বিয়ে দেবেন এমনটা বলেননি। স্থানীয় অধিকারকর্মী ও মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলেছেন, সাম্প্রতিক সময়ে এত কম বয়সী মেয়ের বাল্যবিবাহের চেষ্টার খবর তাঁরা পাননি।
এই বিয়ে ঠেকানো গেলেও সরকারি হিসাবে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধের সংখ্যা কমছে। মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে ১ হাজার ৮৪৬টি বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ করা হয়েছিল; ২০২৪ সালে ১ হাজার ৪৭৪টি এবং ২০২৫ সালে হয়েছে ৯৬৮টি। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে প্রতিরোধ করা হয়েছে ৪৭৯টি। এই হিসাব কেবল প্রশাসনের নথিভুক্ত প্রতিরোধের ঘটনা দেখায়; দেশে কত বাল্যবিবাহ হচ্ছে, তা দেখায় না।
বাল্যবিবাহের ঘটনা কত, তার নিয়মিত হিসাব রাখে না মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়। মাঠপর্যায়ের মহিলাবিষয়ক কর্মকর্তারা যেসব বাল্যবিবাহ প্রতিরোধের তথ্য নথিভুক্ত করেন, সেগুলো কেন্দ্রীয়ভাবে সংকলন করে মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তর।
বাল্যবিবাহ এখন বড় সমস্যা। আইন প্রয়োগে মাঠপর্যায়ে জনবল দরকার।আবু জাফর মো. জাহিদ হোসেন, মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রী
অধিকারকর্মীদের মতে, মাঠপর্যায়ে গত দুই বছরে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে কাজ স্তিমিত থাকা, তথ্যদাতা গোপনীয়তার আস্থা না পাওয়া, বেসরকারি পর্যায়ে তহবিলসংকটে সচেতনতার কাজ কমে যাওয়ার কারণে প্রশাসন বাল্যবিবাহ আয়োজনের খবর কম পেয়েছে।
মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রী আবু জাফর মো. জাহিদ হোসেন গত রোববার প্রথম আলোকে বলেন, বাল্যবিবাহ এখন বড় সমস্যা। আইন প্রয়োগে মাঠপর্যায়ে জনবল দরকার। তিনি জানান, এ মাসে জাতীয় থেকে তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত বাল্যবিবাহ নিরোধ কমিটিগুলো পুনর্গঠনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সচেতনতা বাড়াতে কিশোর-কিশোরী ক্লাবের সংখ্যাও বাড়ানো হচ্ছে।
মন্ত্রী আরও বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি পক্ষ বাল্যবিবাহের পক্ষে প্রচার চালায়। দূরবর্তী গ্রামগুলোতে আইন প্রয়োগ করাও কঠিন। পরিস্থিতি কীভাবে সামাল দেওয়া যায়, সরকার তা ভাবছে।
মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনা অনুযায়ী, কিশোর-কিশোরী ক্লাবের সংখ্যা ৪ হাজার ৮৮৩ থেকে বাড়িয়ে ১৪ হাজার ৭৯০ করা হবে; প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে ২০৩০ সাল পর্যন্ত। বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে সচেতনতা তৈরিসহ সাংস্কৃতিক বিকাশে নানা কর্মসূচি পালন করা হয়।
আজ জাতীয় কন্যাশিশু দিবস। এবারের প্রতিপাদ্য ‘শিশু বিয়ে আর নয়, কন্যা করবে বিশ্বজয়’।
খবর পৌঁছায় না, নজরদারিও কম
সাতক্ষীরায় ১২ বছর না হওয়া শিশুটির বিয়ে বন্ধের সময় উপস্থিত ছিলেন স্থানীয় অধিকারকর্মী সাকিবুর রহমান। তাঁর আশঙ্কা, নিয়মিত নজরদারি না থাকলে পরে গোপনে শিশুটির বিয়ে দেওয়া হতে পারে। তিনি বলেন, শুধু সাদা কাগজে মুচলেকা নেওয়ায় অভিভাবকেরা খুব একটা ভয় পান না।
সাকিবুর রহমানের দাবি, গত ৯ মাসে এলাকার ৭০টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে তিনি অন্তত ৭০০ ছাত্রীর বাল্যবিবাহের খবর পেয়েছেন, যেগুলো প্রশাসনের নজরে আসেনি। তাঁর মতে, পরিচয় গোপন থাকবে কি না, সেই আস্থা না থাকায় অনেকে খবর দেন না। আবার জনবলের ঘাটতি ও অন্য দায়িত্বের চাপে খবর পেয়েও সরকারি কর্মকর্তারা দুর্গম এলাকায় যেতে পারেন না।
অনেক বাল্যবিবাহের খবর প্রশাসন পায় না বলে স্বীকার করেন সাতক্ষীরা সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অর্ণব দত্ত। তিনি বলেন, কোনো কোনো এলাকায় বিয়েতে প্রতিবেশীদের সমর্থন থাকে; আবার পালিয়ে বিয়ের ঘটনা পরিবার সম্মানহানির আশঙ্কায় গোপন রাখে। তাঁর দাবি, আগের তুলনায় প্রশাসনকে খবর দেওয়ার হার কমেছে। সাড়ে ৯ মাস আগে উপজেলাটির দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি ৫০টির বেশি বাল্যবিবাহ ঠেকিয়েছেন। এসব ঘটনায় মেয়েদের বেশির ভাগের বয়স ছিল ১৪ থেকে ১৬ বছর; ১২ বছর বয়স না হওয়া শিশুটিই সবচেয়ে ছোট।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ও ইউনিসেফের ২০২৫ সালের মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে অনুযায়ী, জরিপের সময় ১৮ থেকে ৪৯ বছর বয়সী নারীদের ৫৫ দশমিক ৮ শতাংশের বিয়ে হয়েছিল ১৮ বছরের আগে; আর ২০ থেকে ২৪ বছর বয়সী বিবাহিত তরুণীদের মধ্যে ১৩ শতাংশের বাল্যবিবাহ হয়েছিল ১৫ বছর বয়সের আগে।
কত বাল্যবিবাহ
বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন, ২০১৭ অনুযায়ী, বিয়ের ক্ষেত্রে ১৮ বছরের কম বয়সী মেয়ে এবং ২১ বছরের কম বয়সী ছেলে অপ্রাপ্তবয়স্ক। বাল্যবিবাহ আয়োজন, সম্পাদন বা পরিচালনায় জড়িত ব্যক্তিদের জন্য আইনে শাস্তির বিধান রয়েছে। তবে বিশেষ প্রেক্ষাপটে অপ্রাপ্তবয়স্কর সর্বোত্তম স্বার্থে আদালতের নির্দেশ, অভিভাবকের সম্মতি এবং বিধিতে নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করে বিয়ে হলে তা এই আইনে অপরাধ বলে গণ্য হয় না।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ও ইউনিসেফের ২০২৫ সালের মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে অনুযায়ী, জরিপের সময় ১৮ থেকে ৪৯ বছর বয়সী নারীদের ৫৫ দশমিক ৮ শতাংশের বিয়ে হয়েছিল ১৮ বছরের আগে; আর ২০ থেকে ২৪ বছর বয়সী বিবাহিত তরুণীদের মধ্যে ১৩ শতাংশের বাল্যবিবাহ হয়েছিল ১৫ বছর বয়সের আগে।
থেমে নেই বাল্যবিবাহ
বগুড়ার শিবগঞ্জ পৌরসভায় ১৪ বছর বয়সী মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন একজন অভিভাবক। কারণ জানতে চাইলে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, তিনি দরিদ্র ও বিধবা। মেয়ের নিরাপত্তা এবং অভাবের কথা ভেবেই বিয়ে দিয়েছেন।
শিবগঞ্জে বেসরকারি সংস্থা টিএমএসএসের একটি প্রকল্পে কর্মসূচি কর্মকর্তা ছিলেন শামীমা আক্তার। প্রকল্পটির ২৩৪টি ক্লাবের মাধ্যমে কিশোর-কিশোরীদের নিয়ে বাল্যবিবাহ, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা বিষয়ে সচেতনতামূলক কাজ হতো। গত এপ্রিলে প্রকল্পটি শেষ হয়েছে। গত মঙ্গলবার শামীমা আক্তার প্রথম আলোকে বলেন, তিনি দায়িত্বে থাকা অবস্থায় গত বছরের জুন থেকে এ বছরের এপ্রিল পর্যন্ত ১০ মাসে সেখানে ১৩ থেকে ১৫ বছর বয়সী প্রায় এক ডজন মেয়ের বাল্যবিবাহ হয়েছে। এসব বিয়ে সবার চোখ ফাঁকি দিয়ে গোপনে দেওয়া হয়। প্রকল্প চলার সময়েই এতগুলো বিয়ে হয়েছে; প্রকল্প বন্ধ হওয়ার পর সংখ্যা আরও বেড়ে থাকতে পারে।
মাঠপর্যায়ের সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ভাষ্য, অনেক ক্ষেত্রে মেয়েপক্ষ, ছেলেপক্ষ ও প্রতিবেশীরা বিয়ের বিষয়ে একমত থাকেন; কোথাও কোথাও জনপ্রতিনিধি ও শিক্ষকেরাও যুক্ত হন। অন্যদিকে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে সরকারি কার্যক্রম সীমিত। মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ওয়ান-স্টপ ক্রাইসিস সেলের (ওসিসি) কর্মীরাও উপজেলা পর্যায়ে এ কাজে যুক্ত। সাতক্ষীরায় ১২ বছর না হওয়া শিশুটির বিয়ে বন্ধ করতেও ওসিসির একজন কর্মী গিয়েছিলেন; কিন্তু সেলটির কর্মকর্তা-কর্মচারীরা দীর্ঘদিন ধরে চাকরির অনিশ্চয়তায় আছেন এবং গত ৯ মাস বেতন পাননি। মাঠের কাজেও এর প্রভাব পড়ছে।
ক্ষতিকর প্রভাব জানার পরও অভিভাবকেরা মেয়েদের বাল্যবিবাহ দিচ্ছেন। কারণ, মেয়ের নিরাপত্তা, ধর্ষণ-অপহরণ থেকে সুরক্ষা কিংবা পড়াশোনা শেষে ভালো ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা তাঁরা পাচ্ছেন না। বাল্যবিবাহ ঠেকাতে এসব চ্যালেঞ্জ শনাক্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।শাশ্বতী বিপ্লব, পরিচালক, সেলপ এবং জেন্ডার, জাস্টিস ও ডাইভারসিটি বিভাগ, ব্র্যাক
চ্যালেঞ্জ শনাক্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি
দেশের ২৭ জেলার ৫০ হাজার পরিবারের ওপর জরিপের ভিত্তিতে ব্র্যাকের সোশ্যাল এমপাওয়ারমেন্ট অ্যান্ড লিগ্যাল প্রোটেকশন (সেলপ) কর্মসূচি ২০২৩ সালে ‘বর্ন টু বি আ ব্রাইড’ (কনে হওয়ার জন্যই যেন জন্ম) প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এতে অভিভাবকেরা মেয়ের বাল্যবিবাহ দেওয়ার কারণ হিসেবে উপযুক্ত পাত্র পাওয়া, দারিদ্র্য, কম বয়সে বিয়ে দিলে যৌতুকের দাবি কম থাকা বা না থাকা, নিরাপত্তার অভাব এবং মেয়ের পড়াশোনায় ভালো না করার কথা উল্লেখ করেছেন।
ব্র্যাকের সেলপ এবং জেন্ডার, জাস্টিস ও ডাইভারসিটি বিভাগের পরিচালক শাশ্বতী বিপ্লব প্রথম আলোকে বলেন, ক্ষতিকর প্রভাব জানার পরও অভিভাবকেরা মেয়েদের বাল্যবিবাহ দিচ্ছেন। কারণ, মেয়ের নিরাপত্তা, ধর্ষণ-অপহরণ থেকে সুরক্ষা কিংবা পড়াশোনা শেষে ভালো ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা তাঁরা পাচ্ছেন না। বাল্যবিবাহ ঠেকাতে এসব চ্যালেঞ্জ শনাক্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি বলে মনে করেন তিনি।
শাশ্বতী বিপ্লবের মতে, গত দুই বছরে ইউনিয়ন ও উপজেলা পর্যায়ে কাজ স্তিমিত ছিল; অনেক বাল্যবিবাহ নিরোধ কমিটিও অকার্যকর হয়ে পড়ে। তিনি আরও বলেন, গত বছর ইউএসএআইডির (যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা) কার্যক্রম বন্ধ হওয়ার পর তহবিলের সংকটে বাল্যবিবাহ নিয়ে কাজ করা অনেক বেসরকারি সংস্থা কার্যক্রম গুটিয়ে নেয়। এতে প্রতিরোধের কাজে আরও ঘাটতি তৈরি হয়েছে।