হাসপাতালে ভর্তির নথিটি অনেকটাই বিবর্ণ হয়ে গেছে। ২০০৯ সালের ১৪ নভেম্বর পাবনার মানসিক হাসপাতালে নাইমা চৌধুরীকে স্বজনেরা ভর্তি করেছিলেন। তখন তাঁর বয়স ছিল ২৫ বছর। এর পর থেকে ১৭টি বছর এ হাসপাতালের চারদেয়ালের ভেতরেই কেটেছে তাঁর জীবন। স্বজনেরা কেউ তাঁকে নিতে আসেননি। অবশেষে গত সোমবার এ হাসপাতালেই মারা গেছেন তিনি। আইনি প্রক্রিয়া শেষ হয়নি বলে হাসপাতালের মর্গে বরফ দিয়ে তাঁর লাশটি রাখা আছে এখনো। স্বজন পাওয়া না গেলে নাইমা চৌধুরীকে ‘বেওয়ারিশ’ হিসেবে দাফন করা হবে।
বৃহস্পতিবার মোবাইলে কথা হলো হাসপাতালটির একাধিক চিকিৎসক ও নার্সের সঙ্গে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এর আগেও পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দিয়ে নাইমা চৌধুরীসহ অন্যদের স্বজনদের খোঁজে পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দিয়েছে। কারও কারও স্বজন পাওয়া গেলেও এই স্বজনেরা কেউ আসেননি। অনেককে ভর্তির সময় মিথ্যা তথ্য দিয়ে হাসপাতালটিতে ভর্তি করা হয়েছিল। ভর্তির সময় অভিভাবক বা স্বজনের দেওয়া মোবাইল নম্বরটিও আর সচল নেই অনেকের ক্ষেত্রে।
নাইমা দেখতে খুব সুন্দর ছিলেন। চুল ছোট করে কেটে দেওয়া হয়েছিল। নাইমা হাসপাতালটিতে ভর্তির পর প্রথমে কেবিনে ছিলেন। শুরুর দিকে স্বজনেরা কেবিন ভাড়া দেওয়াসহ খোঁজখবর নিতেন। এরপর আস্তে আস্তে স্বজনেরা খোঁজ নেওয়া বাদ দেন। নাইমাকে ওয়ার্ডে রাখা হয়। তাঁর গায়ের ফরসা রং আস্তে আস্তে কালো হয়ে যায়। একদমই খাবার খেতে চাইতেন না বহু বছর ধরে। হিমোগ্লোবিন কমে যেত।সিজোফ্রেনিয়া তো ছিলই।
জীবনের দীর্ঘ সময়ই হাসপাতালের চারদেয়ালের ভেতরে কাটিয়ে দিতে বাধ্য হয়েছেন এমন ব্যক্তির সংখ্যা কমতে কমতে সর্বশেষ দাঁড়িয়েছিল সাতজনে। এই সাতজনের একজন ছিলেন নাইমা। নাইমা চৌধুরীর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে এখন সংখ্যাটি কমে ছয়জন হলো। এর আগে ঢাকার নাজমা নিলুফার ২৮ বছর বয়সে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন, হাসপাতালে ৬৩ বছর বয়সে মারা যান তিনি।
প্রথম আলোর পক্ষ থেকে বিশেষ অনুমতি নিয়ে গত বছরের ২৯ ও ৩০ অক্টোবর হাসপাতালটির সার্বিক চিত্র দেখার সুযোগ হয়েছিল এ প্রতিবেদকের। তখন বাড়ি ফেরার অপেক্ষায় আছেন হাসপাতাল থেকে এমন যে তালিকা পাওয়া যায়, তাতে নাইমা চৌধুরীর নাম ছিল। নামের পাশে লেখা ছিল ‘শারীরিক ও মানসিকভাবে স্থিতিশীল’। অর্থাৎ নাইমা বাড়ি ফেরার জন্য প্রস্তুত ছিলেন। কিন্তু এরপরও হাসপাতালে অন্যান্য অসুস্থ রোগীর সঙ্গে বন্দী জীবন কাটাতে হয়েছে। হাসপাতালের নথি অনুযায়ী, মৃত্যুর সময় নাইমার বয়স হয়েছিল ৪২ বছর।
নাইমার মতো হাসপাতালে থাকা এমন ব্যক্তিদের পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া ও পুনর্বাসনের জন্য ২০১৪ সালে হাইকোর্টে রিট করেছিলেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মেজবাহুল ইসলাম। তবে বাড়ি ফিরতে পারলেন না নাইমা। মারা যাওয়ার পরও স্বজনদের খুঁজে পায়নি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।
হাসপাতালটির আবাসিক মেডিকেল অফিসার চিকিৎসক মো. সেলিম মোরশেদ বৃহস্পতিবার প্রথম আলোকে বলেন, নাইমা চৌধুরী মারা যাওয়ার পর স্বজনদের খোঁজ করা হয়েছে। হাসপাতালের নথিতে তাঁর এক ভাইয়ের মোবাইল নম্বর ছিল, সেই নম্বরটি আর ব্যবহৃত হচ্ছে না। সংশ্লিষ্ট থানায় তাঁর মৃত্যুর তথ্য জানানো হয়েছে। থানা থেকে স্বজনদের খুঁজে বের করার চেষ্টা করা হবে। থানা থেকে যদি জানানো হয় যে নাইমার স্বজনদের পাওয়া যায়নি, তখন আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের মাধ্যমে স্থানীয় কবরস্থানে বেওয়ারিশ লাশ হিসেবে দাফন করা হবে নাইমাকে। এখনো থানা থেকে তথ্য জানানো হয়নি।
হাসপাতালের নথিতে নাইমার বাবার নাম উল্লেখ করা হয়েছে মজিবুল হক চৌধুরী। তাঁর এক ভাইয়ের নাম মো. হাবিব। প্রথম আলোর পক্ষ থেকেও এই ভাইয়ের মোবাইলে ফোন করা হলে নম্বরটি আর ব্যবহার করা হচ্ছে না বলে জানা গেল। ঢাকার কামরাঙ্গীরচরে আশ্রাফবাদের আহসানবাদ গ্রামের ঠিকানা দেওয়া।
পাবনা মানসিক হাসপাতালের স্টাফ নার্স মঞ্জুয়ারা খাতুন প্রায় ২২ বছর ধরে প্রতিষ্ঠানটিতে কর্মরত। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, নাইমা দেখতে খুব সুন্দর ছিলেন। চুল ছোট করে কেটে দেওয়া হয়েছিল। নাইমা হাসপাতালটিতে ভর্তির পর প্রথমে কেবিনে ছিলেন। শুরুর দিকে স্বজনেরা কেবিন ভাড়া দেওয়াসহ খোঁজখবর নিতেন। এরপর আস্তে আস্তে স্বজনেরা খোঁজ নেওয়া বাদ দেন। নাইমাকে ওয়ার্ডে রাখা হয়। তাঁর গায়ের ফরসা রং আস্তে আস্তে কালো হয়ে যায়। একদমই খাবার খেতে চাইতেন না বহু বছর ধরে। হিমোগ্লোবিন কমে যেত। সিজোফ্রেনিয়া তো ছিলই।
মঞ্জুয়ারা খাতুন বলেন, ‘যত দূর মনে পড়ছে, একবার তাঁকে বাড়িও পাঠানো হয়েছিল, তবে আবার এখানে রেখে যান স্বজনেরা। আমি অন্য ওয়ার্ডে দায়িত্ব পালন করলেও মাঝেমধ্যে নাইমা যে ওয়ার্ডে ছিলেন সেখানে যেতাম। খেতে না চাইলে বলতাম, না খেলে তো মরে যাবে। তখন নাইমা বলতেন, একদিন তো মরেই যাব। ওয়ার্ডের নার্সরা অনেক সময় মুখে তুলে খাইয়ে দিতেন।’
হাসপাতালের দেওয়া তথ্য বলছে, বাড়ি ফেরার অপেক্ষায় থাকা মো. সাইদ হোসেনের বয়স হয়েছে ৬৫ বছর। ১৯৯৬ সালের রোগী ভর্তির ফরমে সাইদের বয়স লেখা ছিল ৩৬ বছর। গত ৩০ অক্টোবর দুপুরে গিয়ে দেখা যায়, খালি গায়ে শুধু ডায়াপার পরা সাইদ ৪ নম্বর ওয়ার্ডের মেঝেতে ময়লা-জীর্ণ তোশকে শুয়ে আছেন। তোশক ও বালিশে কভার নেই। বাঁ হাতটি বাঁকা করে বুকের কাছে ধরে রেখেছেন। মাথার কাছে একটি প্লেটে কিছু ভাত লেগে শুকিয়ে আছে। কিছু ভাত মাথার কাছে তোশকে পড়ে আছে। সাইদ হোসেনের মাথার কাছে দাঁড়িয়ে জানতে চেয়েছিলাম, বাড়ি যেতে মন চায় কি না। শিশুর মতো কান্না শুরু করে অস্পষ্টভাবে বলছিলেন, ‘বাড়ি যাব, বাড়ি যাব।’ আবু সাইদকে এখন হাসপাতালে কর্মরতরা ডাকেন ‘সাইদ চাচা’।
১৯৯৯ সালে ভর্তির সময় ঢাকার সিপ্রা রানী রায়ের বয়স লেখা ছিল ৩২ বছর। ঢাকার গোলজার বিবির বয়স ছিল ২৩ বছর। পাবনার জাকিয়া সুলতানার বয়স ছিল ২১ বছর। ঢাকার শাহানারা আক্তারের ২৬ বছর এবং অনামিকার (বুবি) বয়স ছিল ২৫ বছর। হাসপাতালেই তাঁরা বৃদ্ধ হচ্ছেন। বাড়ি ফেরার অপেক্ষায় দিন গুনছেন। আর হাসপাতালেই মৃত্যু হলে স্বজন লাশ নিতে না হলে বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করা হবে তাঁদের। অথচ এঁদের কেউ বেওয়ারিশ নন। গত অক্টোবরে হাসপাতালটিতে সরেজমিনে গেলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এমন ১৫ জন ব্যক্তির তথ্য দিয়ে জানিয়েছিল, ১৫ জনের মধ্যে ৬ জনকে ছাড়পত্র দিয়ে অভিভাবকদের কাছে ফেরত পাঠানো সম্ভব হয়েছিল। দুজন হাসপাতালেই মারা যান। নাইমাসহ অবশিষ্ট ছিলেন ৭ জন।
বেসরকারি যমুনা টেলিভিশন হাসপাতালটি থেকে বাড়ি ফেরার অপেক্ষায় থাকা ব্যক্তিরা কেন বাড়ি ফিরতে পারছেন না তা নিয়ে অনুসন্ধানমূলক একটি ভিডিও প্রতিবেদন সম্প্রচার করে তিন মাস আগে। ভিডিও প্রতিবেদনটির তথ্য বলছে, নাইমা চৌধুরীর বাড়ির যে ঠিকানা দেওয়া সেখানে কাউকে পাওয়া যায়নি। কামরাঙ্গীরচরের পেশকার গলিতে গিয়ে জানা গিয়েছিল, সেখানে নাইমা চৌধুরীদের বাড়ি ছিল। আরও প্রায় ২০ বছর আগেই নাইমার ভাইবোনেরা কোটি টাকার বেশি মূল্যের বাড়ি ও জায়গা বিক্রি করে দিয়ে এলাকাটি ছেড়ে গেছেন। তাঁরা কোথায় গেছেন তা এলাকার কেউ জানাতে পারেননি।