ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে প্রায় তিন দশক আগে সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা যুক্ত হয়েছিল। তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা সংবিধানের কোনো সাধারণ সংশোধনী ছিল না। এটি ছিল সামাজিক চুক্তির সমঝোতা। ত্রয়োদশ সংশোধনী প্রণয়ন নিজেই সার্বভৌম ইচ্ছার সরাসরি নির্দেশ দেয়। তাই তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে ‘অগণতান্ত্রিক’ বলে যুক্তি দেওয়া মানে গণতন্ত্রের ধারণাকে ভুলভাবে বোঝা।
ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিল (তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করা) করে দেওয়া রায়ের বিরুদ্ধে করা আবেদনের ওপর আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ রায়ে এমন পর্যবেক্ষণ এসেছে। এই রায়ে আরও বলা হয়েছে, মনে রাখতে হবে—এটি কোনো নিয়মিত আইন প্রণয়নই ছিল না; বরং একটি বিস্তৃত জাতীয় ঐকমত্যের ফসল ছিল, যা সংসদের সুনির্দিষ্ট নির্বাচনী ম্যান্ডেট অনুসরণ করে সর্বাধিক সংখ্যাগরিষ্ঠতার মাধ্যমে প্রণীত হয়েছিল।
ত্রয়োদশ সংশোধনীকে সংবিধান পরিপন্থী ও বাতিল ঘোষণা করে ১৫ বছর আগে ২০১১ সালে আপিল বিভাগ রায় দিয়েছিলেন। সেই রায়ের বিরুদ্ধে করা আপিল মঞ্জুর এবং এ-সংক্রান্ত রিভিউ (পুনর্বিবেচনা) আবেদন নিষ্পত্তি করে গত বছরের ২০ নভেম্বর তৎকালীন প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদের নেতৃত্বাধীন সাত সদস্যের আপিল বিভাগ সর্বসম্মতিতে রায় ঘোষণা করেন। ৭৪ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায় ১২ মার্চ সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়।
ঘোষিত রায়ে বলা হয়, নথি দেখে স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে আপিল বিভাগের রায়টি (২০১১ সালের রায়) একাধিক কারণে ক্রটিপূর্ণ। অতএব রায়টি (২০১১ সালের রায়) সম্পূর্ণরূপে বাতিল করা হলো।
নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থাসংবলিত বিধান অন্তর্ভুক্ত করে ১৯৯৬ সালের ২৮ মার্চ সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী আনা হয়েছিল। এ নিয়ে রিট হলে হাইকোর্ট ত্রয়োদশ সংশোধনী বৈধ ঘোষণা করে। হাইকোর্টের রায়ের পর আপিল করেন রিট আবেদনকারীপক্ষ। এই আপিল মঞ্জুর করে ২০১১ সালের ১০ মে তৎকালীন প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হকের নেতৃত্বাধীন সাত সদস্যের আপিল বিভাগ সংখ্যাগরিষ্ঠ মতামতের ভিত্তিতে (৪ : ৩) ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিল করে রায় দেন। এই রায়কে কেন্দ্র করে প্রথমে পুনর্বিবেচনার আবেদন ও পরে আপিল হয়। এই আপিল ও পুনর্বিবেচনার আবেদনের ওপর গত বছরের ২০ নভেম্বর আপিল বিভাগ রায় ঘোষণা করেন। পূর্ণাঙ্গ রায় ১২ মার্চ সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়।
২০১১ সালের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল বিভাগে আবেদন করেছিলেন জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার। তাঁর পক্ষে শুনানি করেছিলেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির। তিনি আজ রোববার রাতে মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার বিধান পুনর্বহাল করেছেন আপিল বিভাগ। বিধানটি ছিল ‘সর্বশেষ অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হবেন।’ তবে বর্তমান ত্রয়োদশ সংসদের মেয়াদ শেষে এটি কার্যকর হবে।
মোহাম্মদ শিশির মনির বলেন, পঞ্চদশ সংশোধনী মামলার রায়ের সঙ্গে তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা ওতপ্রোতভাবে সম্পর্কিত। এই মামলা এখন আপিল বিভাগে বিচারাধীন। এই মামলা নিষ্পত্তি না হলে তত্ত্বাধায়ক ব্যবস্থা পরিপূর্ণভাবে কার্যকর সম্ভব নয়। তবে এ বিষয়ে বর্তমান সংসদ সংবিধানে প্রয়োজনীয় সংশোধনী আনতে পারে।